কিন্তু সুষমা বলে উঠল–না, ছোটো কাকাকেই ডাকা হোক। তিনি মরে গিয়ে থাকলে নিশ্চয় আসবেন।
–বেশ, তাই ডাকো।
ওরা ভাই-বোনে তখন মুখোমুখি বসল।
–ও হো! দেবব্রত বাধা দিলেন–তোমরা তো ওঁকে দেখইনি তা হলে স্মরণ করবে কি করে? একটু হেসে বললেন–ওঁর একটা ছবি আছে?
এ ওর মুখ চেয়ে সবাই মাথা নাড়ল। না, খুব পুরনো একটা ছবি বোধহয় আছে অ্যালবামে। তাও সেটা ট্রাঙ্কের মধ্যে।
–তবে তোমরা ওঠো। তোমাদের বাবা মাকে বসতে দাও।
বিমর্ষ মনে ওরা উঠে পড়ল। বসলেন বিনয়বাবু আর তার স্ত্রী।
ঘরে হালকা নীল আলো জ্বলছে, ধূপের গন্ধে ঘর ভরপুর। ওঁরা দুজনে কাপের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বুজিয়ে একমনে এ বাড়ির ছোটো ছেলেটির কথা ভাবতে লাগলেন।
গোটা ঘর স্তব্ধ। কারও নিশ্বাস ফেলার শব্দটুকুও যেন শোনা যাচ্ছে না। শুধু কড়িকাঠের আড়ালে একটা টিকটিকি টিটি করে ডেকে উঠল।
দু মিনিট–তিন মিনিট করে দশ মিনিট কেটে গেল। কিন্তু কাপ একটুও নড়ল না। সবাই চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু দেবব্রতর কোনও চাঞ্চল্য নেই। বরঞ্চ কেমন খুশি খুশি ভাব।
খুশির ভাব তো হবেই–ছেলেটা নিশ্চয় তাহলে বেঁচে আছে।
–যাক নিশ্চিন্ত। উনি মৃত নন। এবার ইচ্ছে করলে আপনারা অন্য কাউকে
কথা শেষ হলো না। সবাইকে চমকে দিয়ে কাপটা হঠাৎ নড়ে উঠল। সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কাপটা প্রথমে ছোটো বৃত্তের মধ্যে ঘুরল। তারপর হঠাৎ ছিটকে ছোটো বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক করতে লাগল।
দেবব্রত ফিসফিস্ করে বললেন–জিজ্ঞেস করুন কে এসেছেন?
ওঁরা কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
এসব ক্ষেত্রে কাপটা ইংরিজি এক একটি অক্ষরের কাছে গিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকম কিছু ঘটল না। কাপটা শুধু বৃত্তের মধ্যেই ঘুরতে লাগল। এত দ্রুত ঘুরতে লাগল যে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে রাখা দায় হলো।
এমন অদ্ভুত ব্যাপার দেব্রত নিজেও কখনো দেখেননি। তিনিও যেন কেমন ভয় পেলেন। বলে উঠলেন–আপনারা আঙুল সরিয়ে নিন।
ওঁরা তাই করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাপটাও একেবারে নিশ্চল হয়ে গেল।
–এ কোনো অশুভ আত্মার কাজ। ক্ষতি করার জন্যে হঠাৎ এসে পড়েছিল। একটু থেমে বললেন–অনেক রাত হয়েছে। আর কাউকে ডেকে কাজ নেই।
সকলেরই গা ছমছ করছিল। দ্বিরুক্তি না করে সবাই উঠে পড়ল।
.
দরজায় কি কেউ কড়া নাড়ছে?
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দেবব্রতর। অন্ধকার ঘর। প্রথমটা বুঝতেই পারলেন না কোথায় আছেন। কিন্তু ভেবে ওঠার আগেই দরজায় এবার জোরে কড়া নাড়া।
–শুনছেন! শীগগির একবার আসুন।
ধড়মড় করে উঠে দেবব্রত আলো জ্বেলে দরজা খুলে দিলেন। দেখলেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বিনয়বাবু আর তার স্ত্রী। ভয়ে তাদের মুখ সাদা।
–একবার এ ঘরে আসুন।
দেবব্রত তখনই তাদের সঙ্গে চললেন। এটা সেই ঘর যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগে প্ল্যানচেট করা হয়েছিল। বিনয়বাবু সভয়ে বললেন–আমরা পাশের ঘরে শুই। অনেকক্ষণ থেকেই এ ঘরে কিরকম একটা ঠুক্ ঠুক্ করে শব্দ হচ্ছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম ইঁদুর-টিদুর। কিন্তু শব্দটা অন্যরকম। উঠে এসে দেখি–সেই কাপটা মিটসেফের ওপর নড়ছে। কিন্তু এখন
দেবব্রত বললেনকই নড়ছে? হেসেই বললেন–ঘুমের ঘোরে নিশ্চয়ই ভুল দেখেছিলেন। একটা কাপ কখনো এমনি নড়তে পারে না।
তবু একটু অপেক্ষা করে ওঁরা ফিরে যাচ্ছিলেন–এমনি সময়ে শব্দ-খুট খুট খুট।
সবাই চমকে উঠে দেখল কাপটা যে শুধু নড়ছে তা নয়, সেটা এগিয়ে এসেছে মিটসেফের ধার পর্যন্ত।
ভয়ে দেব্রতর মাথার চুল পর্যন্ত খাড়া হয়ে গেল। জীবনে তিনি অনেকবার প্ল্যানচেট করেছেন, কিন্তু এমন দৃশ্য কখনো দেখেননি।
–কি হবে দেবব্রতবাবু?
দেবব্রতবাবু বললেন–স্পিরিট দেখছি এখনও যায়নি। বোধহয় কিছু বলতে চায়। ঠিক আছে, আবার বসুন আপনারা।
কিন্তু বিনয়বাবুর স্ত্রী এবার আর কিছুতেই বসতে চাইলেন না। দেবব্রতবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, ঠিক আছে আমিই বসছি। আপনার বসতে তো ভয় করছে না?
ভয় করলেও বিনয়বাবুকে বসতে হলো। যথারীতি খড়ি দিয়ে গণ্ডি কেটে তার মধ্যে কাপটা বসিয়ে দেবব্রতবাবু বললেন–নিন রেডি?
বিনয়বাবু কিন্তু দেবব্রতবাবুর দিকে তাকিয়ে কিছু যেন ভাবছিলেন। এবার ইতস্তত করে বললেন–আপনি বসবেন, কিন্তু আপনি তো আমার ভাইকে দেখেননি।
দেবব্রতবাবু একটু যেন থমকে গেলেন। বিরক্ত হলেন। বললেন–সে আমি বুঝব। বলেই কাপের ওপর আঙুল ছোঁয়ালেন। সঙ্গে সঙ্গেই কাপটা ছোটো গণ্ডি থেকে তীব্র গতিতে বেরিয়ে এসে বড়ো গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
দেবব্রতবাবুর ইঙ্গিতে বিনয়বাবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন–আপনি কে এসেছেন দয়া করে জানাবেন?
মুহূর্তমাত্র দেরি না করে কাপটা প্রথমে এগিয়ে গেল R অক্ষরটির কাছে, তারপর তরতর করে উঠে এল A অক্ষরের কাছে, তারপর নেমে ঘুরে গেল M-এর কাছে–সেখান থেকে E তারপর N-এর কাছে গিয়ে থেমে গেল। সকলে ফিসফিস করে উঠল–র-মেন!
রমেন কে? ভুরু কুঁচকে দেবব্রত জিজ্ঞেস করলেন।
–আমার ছোটো ভাই। বলে ফুঁপিয়ে উঠলেন বিনয়বাবু।
কাপটা ততক্ষণে আবার ঘুরতে শুরু করেছে। যেন কিছু বলার জন্যে ছটফট করছে।
–রমেন ভাই আমার! কেমন আছিস? কি করে তোর এই সব্বনাশ হলো? কে করল?
এত সব প্রশ্নের উত্তর কোনো স্পিরিটই একসঙ্গে দিতে পারে না। রমেনের আত্মাও দিল না। কাপটা শুধু এবার ধীরগতিতে এগিয়ে গেল M-এর কাছে। তারপর U-র কাছে–তারপর R, তারপর D, তারপর E, ফের R…
