দেবব্রত গোঁফের ফাঁকে একটু হাসলেন। বললেন–একটা কাপ আর একটা চকখড়ি নিয়ে এসো। দেখিয়ে দিচ্ছি।
সুষমা মহা উৎসাহে বলে উঠল–কিরকম কাপ?
–অতি সাধারণ চা খাবার কাপ। তবে ভালো করে ধুয়ে মুছে এনো৷
সুষমা তখনই এরকম ছুটে গেল আর একটু পরেই একটা পরিষ্কার সাদা কাপ আর চকখড়ি নিয়ে এল। তারপর দেবব্রতর নির্দেশে মসৃণ জায়গা দেখে (পুরনো বাড়ি তো) ভালো করে গঙ্গাজল দিয়ে মুছে ফেলা হলো। জায়গাটা শুকোলে এবার দেবব্রত বেশ গম্ভীরভাবে এগিয়ে এসে খড়ি দিয়ে বেশ বড়ো করে একটা গোল গণ্ডি টানলেন। তারপর সেই গণ্ডির ডান দিকের মাথা থেকে A, তার নীচে B তার নিচে C, এমনি করে Z পর্যন্ত লিখলেন। দেখে মনে হলো গণ্ডিটা যেন কতকগুলো ইংরিজি অক্ষরের মালা গলায় পরে রয়েছে। তারপর সেই বড় গণ্ডির ঠিক মাঝখানে ছোটো একটা গোল গন্ডিও টানলেন। তারপর সেই ছোটো গণ্ডির মধ্যে কাপটি উপুড় করে রাখলেন।
ব্যাস্! এবার বড় আলোটা নিভিয়ে দিয়ে ডিম আলোটা জ্বালো।
ব্রত তখনই উঠে গিয়ে বড়ো আলোটা নিভিয়ে নীল আলোটা জ্বেলে দিল।
-বেশ। ধূপ আছে?
–আছে। নিয়ে আসব?
–হ্যাঁ। মানে জায়গাটা যতদূর সম্ভব পবিত্র করা আর কি!
করে গঙ্গাজল খড়ি দিয়ে কে তার নীচে
ধূপদানীতে দুটো ধূপও জ্বেলে দেওয়া হলো। মুহূর্তে ঘরের হাওয়াটাই বদলে গেল।
এবার তোমাদের দু-একটা কথা আগে বলে নিই। দুজনকে বসতে হবে কাপের দুদিকে একটা করে আঙুল শুধু ছুঁইয়ে। যে দুজন বসবে তারা এমন কাউকে স্মরণ করবে যিনি দুজনেরই চেনা। একাগ্র চিত্তে ভক্তিভরে স্মরণ করবে। তারপর যখন দেখবে কাপটা নড়ছে তখন তাকে জিজ্ঞেস করবে–কে এসেছেন? তারপর তোমাদের যা প্রশ্ন থাকবে, আত্মা ঐ কাপ দিয়েই ইংরিজি লেটারগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে ইংরিজিতেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেবেন। এবার তাহলে তোমরা ঠিক করো কাকে ডাকবে আর কে দুজন বসবে।
কৌতূহল যেমন আছে তেমনি ভয় ভয়ও করছে। শেষ পর্যন্ত সুষমা আর ব্রত দুরু দুরু বক্ষে এসে বসল।
কাকে ডাকবে ঠিক করেছ?
এ আর কঠিন কি! কত চেনা-জানা লোকই তো এর মধ্যে মারা গেছেন।
–ধীরু গাঙ্গুলিকে ডাকলেই তো হয়।
–ধীরু গাঙ্গুলি! ঐ সুদখোর-বদমাশ! নানা, ওকে ডেকে কাজ নেই।
ব্ৰত একটু ভেবে বলল–তবে ঘোষেদের হরেন দাদু?
ও রে ফাদার! ঐ রাগী লোককে?
না না, কক্ষনো না। উনি তো ঝগড়া করতে করতেই হার্ট ফেল করেছিলেন।
–তাহলে?
–মা, তোমার সই গঙ্গাজলকে–
বাপু, সে ছিল বেজায় শুচিবাইয়ে। দেখতে না আমাদের ঘরে এসে বসতে চাইত না। আজ মরে গিয়ে তো আরও
–মহা মুশকিল। তা হলে ডাকা যায় কাকে? বেশ একজন ধীর, স্থির, ভদ্র, নম্র মানুষ হলেই ভালো হয়।
–হ্যাঁ, সেইরকমই কারো কথা তোমরা ভাব। নইলে তেমন স্পিরিট হলে বড্ড বিরক্ত হয়। দেবব্রত গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন।
হঠাৎ সুষমা বলে উঠল–ছোটো কাকাকে ডাকলে হয় না?
ছোটো কাকার কথা উঠতেই এক মুহূর্তে সবার মুখে দুঃখের ছায়া নেমে এল। এতক্ষণে বিনয়বাবু কথা বললেন–কিন্তু সে যে মারাই গেছে–তা তো আজ পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়নি। বলে তিনি দেবব্রতর দিকে তাকালেন।
–ঐ একটা আমাদের ফ্যামিলি ট্র্যাজেডি। সে আজ প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। আমাদের ছোটো ভাই। কলকাতায় কলেজে পড়ত হস্টেলে থেকে। একদিন ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মধুপুর, গিরিডি বেড়াতে গেল। তিন-চারদিন পর ফিরল সবাই। ফিরল না শুধু আমার ছোটো ভাই আর ওর এক বন্ধু। জানা গেল ওরা দুজনে গিরিডি থেকে দূরে উশ্রী ফলস্ দেখতে গেছে। দুদিন পরে বন্ধুটি ফিরল একা। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে তো অবাক। বলল, ও তো শেষ পর্যন্ত উশ্রী দেখতে যায়নি। কলকাতায় ফিরে এসেছিল। বন্ধুটি জোর দিয়ে বলল, সে নিজে ওকে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু ভাই আর ফেরেনি।
এই পর্যন্ত বলে বিনয়বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
দেবব্রত কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে বললেন–যদি তিনি মারা গিয়েও থাকেন তা হলে কিভাবে সম্ভব মনে করেন?
বিনয়বাবু সহজ সুরেই বললেন–অ্যাকসিডেন্ট। ট্রেন থেকে পড়ে কিংবা ঐ ধরনের কিছু–এ ছাড়া আর কি হতে পারে?
-খুনও হতে পারে। সবইকে চমকে দিয়ে কথাটা বলে উঠলেন বিনয়বাবুর স্ত্রী।
দেবব্রত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন–খুন! কে খুন করবে? তার মোটিভ–মানে উদ্দেশ্যই বা কি?
–আমার ধারণা খুনের উদ্দেশ্য একটা ছিল। ওর হাতে একটা বিশেষ আংটি ছিল। আমরা একবার নেপাল বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন লামার সঙ্গে আমার দেওরের আলাপ হয়। লামা তাকে একটা আংটি দিয়ে বলেছিল–এটা পরে থাকলে নাকি কোনোদিন কোনো বিপদ ঘটবে না। সেইসঙ্গে সাবধানও করে দিয়েছিল–যেন সে কথা কাউকে না বলে। বোকা ছেলেটা আংটিটা সব সময়েই পরে থাকত আর সবাইকে বলে বেড়াত।
–তা থেকে কী প্রমাণ হয়? একজন ঝানু গোয়েন্দার মতো প্রশ্ন করলেন দেবব্রত।
–প্রমাণ কিছুই হয় না, তবে মনে হয় ঐ আংটির লোভেই ওর সঙ্গে যে ছেলেটা ছিল সে-ই খুন করেছে।
দেবব্রত একটু গম্ভীর হয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন পুলিশ কিছু করতে পারল না?
বিনয়বাবু সংক্ষেপে মাথা নাড়লেন।
না। কে একটা ছেলে হারিয়ে গেল বা মরল তা নিয়ে বিহার পুলিশের বা কলকাতা পুলিশের তেমন মাথাব্যথা ছিল না।
দেবব্রত আবার কিছুক্ষণ ভাবতে লাগলেন। তারপর বললেন–মৃত্যু হয়েছেই এমন যখন সিদ্ধান্ত নয় তখন অন্য কাউকে ডাকলেই হয়।
