এখন তাই বড়ো বড়ো ছেলেমেয়েরা যখন হাসতে হাসতে তাঁকে বলে, বাবা, তুমি এক নম্বর ভীতু তখন তিনি গম্ভীর হয়ে যান।
তাঁকে ভীতু বলার যেটা সবচেয়ে বড়ো কারণ সেটা হচ্ছে–তিনি বাড়ি করলেন কলকাতার একপ্রান্তে এমন জায়গায় যেখানে ট্রামবাসের শব্দটুকুও শোনা যায় না।
এমন জায়গায় বাড়ি করলেন কেন? প্রপার কলকাতায় ভালো জায়গা পাননি? তা নয়, আসলে সেই উনিশ শ ছেচল্লিশ সাল থেকে মধ্য কলকাতায় থাকার সময়ে এত দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ট্রাম-বাস পোড়ানো, পুলিশের নির্মম গুলি চালানো, খুন-খারাপি, অ্যাক্সিডেন্ট দেখেছেন যে এখন তিনি আর সেসব সহ্য করতে পারেন না। আর ওসব ব্যাপার তো থেমে যায়নি। বরঞ্চ এখন যেন বেড়েই চলেছে। কাজেই এই নিরিবিলি জায়গা বেছে নিয়েছেন।
–অথচ এই তুমিই নাকি প্ল্যানচেট করতে? প্রশ্ন করে এম. এ পাস বড়ো মেয়ে।
–হ্যাঁ, তা করতাম।
—তখন ভয় করত না?
না, ভয় বলে জিনিসটা আমার কোনোদিন ছিল না। আজও নেই। তবে ঐ সব দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-খারাপি দেখলে মনের ওপর কেমন চাপ পড়ে।
–এখনও তুমি প্ল্যানচেট করতে পার? মেজো ছেলে কানু জিজ্ঞেস করে।
–পারি বৈকি। তবে আগে যেমন প্ল্যানচেটে কাঠের ছোট টেবিল ছিল–এখন তো আর সেসব পাওয়া যায় না। তবু একটা কাপ আর একটা চকখড়ি পেলেই কাজ হয়ে যায়।
–একটা কাপ আর চকখড়ি!
–হ্যাঁ, হা, সাধারণ চায়ের কাপ।
ছেলেমেয়ে দুজনেই বলে উঠল–একবার প্ল্যানচেট কর না।
দেবব্রত স্ত্রীর ভয়ে অনেক দিন প্ল্যানচেটে বসতে পারেননি। আজ একবার ইচ্ছে হলো, কিন্তু কানুর মা শোনামাত্র একেবারে অগ্নিমূর্তি হয়ে এসে সবাইকে ধমক দিয়ে বললেন না, এ বাড়িতে ওসব আত্মাটাত্মা নিয়ে ছেলেখেলা চলবে না।
ব্যাস! হয়ে গেল। প্ল্যানচেট পর্ব ঐখানেই শেষ।
কিন্তু
দেবব্রত জানতেন না এই বয়েসে খুব শীগগিরই তাকে অন্তত একদিন প্ল্যানচেট নিয়ে আবার বসতে হবে। অফিসের একটা কাজে হঠাৎ তাকে একদিনের জন্যে যেতে হলো বর্ধমান জেলার এক মহকুমা শহরে। সেখান থেকে আবার রিকশা নিয়ে মাইল তিনেক দূরে এক গ্রামে।
এ এমন জায়গা যেখানে হোটেল-টোটেলের বালাই নেই। রাতে থাকবেন কোথায়? অফিসেরই এক ভদ্রলোক সেই গ্রামের তার পরিচিত এক ভদ্রলোককে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন, যেন এক রাত্তিরের জন্যে তার এই অফিসের সহকর্মটিকে থাকতে দেওয়া হয়। দেবব্রতবাবুকে অবশ্য একটা কথা বলে দেওয়া হয়েছিল, ওখানে গিয়ে যেন বাড়ির কর্তার কথা না জিজ্ঞেস করেন। কেননা বৃদ্ধ ভদ্রলোকের একটি ছেলে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর থেকে তিনি শোকে একেবারে পাগল হয়ে গেছেন। তাকে একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। সেই হতভাগ্য ছেলেটির কথা উঠলে সবাই নতুন করে দুঃখ পাবে, তাই।
দেবব্রত ভাবলেন, ওসব ফ্যামিলি ম্যাটারে যাওয়ার তার কি দরকার? চুপচাপ কোনোরকমে একটা রাত কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো।
.
পরিবারটি সত্যিই ভদ্র। শুধু ভদ্রই নয়, যথেষ্ট আধুনিক। বাড়ির যিনি বড়ো ছেলে তার নাম বিনয়বাবু। ষাট ছাপিয়ে গেছে। তার বড় ছেলেটি রাউরকেল্লায় কাজ করে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে। মেয়ে সুষমাও কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে রয়েছে। সেও এম. এ. পাস। বড়ো ছেলের ভালো নাম জানা গেল না, তবে ডাকনাম ব্রত। এ বাড়ির যিনি বড়ো বৌ অর্থাৎ বিনয়বাবুর স্ত্রী–তিনিও খুব প্রগতিশীল মহিলা। একজন বাইরের ভদ্রলোকের সামনে বেরিয়ে তিনি স্বচ্ছন্দে আলাপ করলেন। বলাই বাহুল্য, আদর অভ্যর্থনার কোনো ত্রুটি এঁরা করেননি।
বাড়িটা টিপিক্যাল যেমন গ্রামের পুরনো বাড়ি হয়। একতলা বাড়ি। পলস্তরা খসে পড়েছে। মোটা মোটা কড়ি। জানলাগুলো ছোটো। ফলে প্রায় সব ঘরগুলোই কেমন অন্ধকার। আর সঁতসেঁতে গন্ধ। ঘরের বাইরে মস্ত উঠোন। সেখানে ধানের মরাই, ধানভানার চেঁকি থেকে গোয়ালঘর পর্যন্ত সবই আছে। তবু কোথায় যেন ওঁদের সবার মনে একটা চাপা দুঃখের ভাব। সেটা হয়তো পুত্রশোকে পাগল ঐ বন্দী বৃদ্ধের জন্যেই।
রাত্রে খাওয়ার পর গল্পের আসর বসল। সবার সঙ্গে বিনয়বাবুর স্ত্রীও বসলেন পানের ডিবে নিয়ে।
নানা পরিচয়পর্বের পর গল্প জমে উঠল। গ্রামের সুখ-সুবিধে, পুজো-পার্বণ থেকে শুরু করে গ্রাম্য পলিটিক্স পর্যন্ত। শেষে ভূতও এসে পড়ল। কথায় কথায় সুষমা বলল কাকাবাবু, আপনি কখনো ভূত দেখেছেন?
দেবব্রত হেসে বললেন কলকাতায় আর ভূত কোথায় পাব মা? এত লোডশেডিং এর সুবিধে তবু তেনারা এখন আর দেখা দেন না।
সুষমা বললে কিন্তু আমাদের এখানে ভূত আছে। আর এই বাড়িতেই। বলে হেসে মায়ের দিকে তাকাল।
–জানেন, মা এ বাড়িতে প্রায়ই ভূত দেখে।
বিনয়বাবুর স্ত্রী কিছুমাত্র লজ্জিত না হয়ে মুখে আর একটা পান গুঁজে বললেন–ভূত কিনা জানি না, তবে অন্ধকারে এ-ঘর ও-ঘর করার সময়ে মাঝে মাঝে কি যেন ছায়ার মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎই মিলিয়ে যায়।
দেবব্রত ভয় পাওয়া তো দূরের কথা বেশ পুলকিত হলেন। বললেন–তা একবার প্ল্যানচেট করে দেখতে পারেন।
–প্ল্যানচেট! নাম শুনেছি বটে, কিন্তু কখনো দেখিনি। ব্রত বলল।
দেবব্রত বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন–ও আর এমন কী ব্যাপার! আমিই এক সময়ে প্ল্যানচেট করে কত আত্মা নামিয়েছি।
–আপনি প্ল্যানচেট করতে পারেন?
