হঠাৎ নজরে পড়ল ছাদের কার্নিশ থেকে কিছুটা রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে। ছাদে রক্ত এল কোথা থেকে? কুকুরটা কি রাত্তির বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে গিয়েছিল? ছাদে গেলই বা কী করে? সিঁড়ি তো নেই!
বাসুদেব বলল, দ্যাখো দ্যাখো রক্তের ফোঁটা–ঐ যে ঐ দিকে চলে গেছে।
তাই তো!
চলো দেখা যাক। কোথায় শেষ হয়েছে।
দুজনে মাটির দিকে লক্ষ রেখে এগিয়ে চললাম। ফোঁটাগুলো সোজাসুজি যায়নি। গেছে এঁকেবেঁকে। বোঝা যায় কুকুরটা আঘাতের যন্ত্রণায় মাথা দোলাতে দোলাতে গেছে।
প্রায় আধঘণ্টা যাবার পর আমরা যে জলাশয়ের কাছে এসে পৌঁছলাম সে দিকে তাকিয়েই বাসুদেব বলে উঠল–নিশ্চয় এই সেই বাঁওড়!
কাদাগোলা জল কোথাও গোড়ালি ডোবা কোথাও এক হাঁটু। কেমন একটা আঁশটে গন্ধ। কোথাও কচুরিপানা আঁক বেঁধে আছে। কোথাও শুকনো ডাঙা। অল্প জলে ছোটো ছোটো মাছ কিলবিল করছে। জলের ধারে গুগলি-শামুকের খোল। রক্তের ফোঁটা জলের ধারে এসে মিলিয়ে গেছে।
বাসুদেব বলল, যার গা থেকে রক্ত পড়ছিল সে সম্ভবত জলে নেমে গেছে।
জলে না হয় নেমে গেল। কিন্তু তারপর? কোথায়?
এর জবাব কে দেবে? কেই বা জানে?
তখন বেলা দশটা হবে। বাঁওড়ের ধারটা নির্জন নিঝুম। ডাঙা বরাবর শুধু বাবলা আর বড় বড় ঘাস। এত যে ঘাস অথচ একটা গরুও চরছে না। কাছেই একটা বহুকালের পুরনো বটগাছ। কিন্তু গাছে একটা পাখিও নেই।
বাঁওড়টা বেশি চওড়া নয়। সিকি কিলোমিটারের মতো। ওপারে একটা ডোঙা বাঁধা। কিন্তু মাঝি নেই।
ওপারে কী আছে কে জানে! আমরা দুজনেই তাকালাম। আশ্চর্য! শুধু বনঝোপ, লতাপাতা আর বুনো ফুল। পিছনে মাথা তুলে আছে পরপর কতকগুলো ঝলসানো দেবদারু গাছ আর একেবারে সামনে বর্শা হাতে প্রহরীর মতো সার সার দাঁড়িয়ে আছে কাঁটাভরা ফণীমনসার গাছ।
সবকিছুই যেন অতি সাবধানে ওপারের অস্তিত্বটাই আড়াল করে রেখেছে লোকের চোখের সামনে থেকে। এ তো ভারী অদ্ভুত ব্যাপার!
তবু এপার থেকে দুজনেই এদিক-ওদিক মাথা হেলিয়ে, কখনও পায়ের চেটোর ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে খুঁজতে লাগলাম, যদি কিছু দেখা যায়।
দেখা গেল দুটো দেবদারু গাছের ফাঁক দিয়ে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি। কেন জানি না আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চাপা উত্তেজনায় বাসুদেবকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলাম, দ্যাখো, দ্যাখো, ওপারে একটা দোতলা বাড়ি।
বাসুদেব গম্ভীর ভাবে বলল, দেখেছি। তুমি কি আরও কিছু দেখতে পেয়েছ?
না তো!
তাহলে আমার এদিকে সরে এসো। এবার তাকাও বাড়িটার ন্যাড়া ছাদের দিকে।
তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গে যা দেখলাম তাতে শিউরে উঠলাম। বিরাট একটা কালো কুকুর ছাদ থেকে যেন আমাদেরই লক্ষ করছে। যেন অনেক চেষ্টার পর আমাদের ও এইমাত্র খুঁজে পেয়েছে। মনে হল লাফাবার জন্যে শরীরটা পাঁচিলের বাইরে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাসুদেব আমার হাত ধরে টান দিল, চলো শিগগির। না-না, ওদিক দিয়ে নয়, অন্য দিক দিয়ে–
অন্য পথ দিয়ে বাঁওড়েরই কিনারা ধরে আমরা হাঁটতে লাগলাম। এক জায়গায় ধোঁয়া উড়ছে দেখা গেল।
এখানে ধোঁয়া কেন?
বাসুদেব বলল, বোধহয় শ্মশান। হরিপদ বলেছিল শ্মশানের পাশেই কবরখানা। যেখানে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল সেই সাহেব আর দুই সঙ্গী নিগ্রো অনুচর আর কুকুরটাকে।
একটু এগোতেই শ্মশানে এসে পড়লাম। একটা মড়া পোড়ানো হবে। আর একটা মাটিতে চালির ওপর। দুজন পুলিশও রয়েছে। আর কেউ কী নেই! এমন কি বাড়ির লোকজন কেউ! কী ব্যাপার? পুলিশরা জানাল একজন লোককে দু’দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কাল বিকেলে পাওয়া গেছে বাঁওড়ের ধারে। ক্ষতবিক্ষত। লোকটি কোথাকার?
চেনেন নাকি? একজন পুলিশ রসিকতা করে মুখ থেকে কাপড়টা সরিয়ে নিল। আঁতকে উঠলাম। ইস্! এ যে বগলা মজুমদার।
[শারদীয়া ১৪১৩]
খুনী
দেবব্রত চৌধুরী মানুষটি এতই নিরীহ ভালোমানুষ যে বাইরের লোক আড়ালে আর তার ছেলেমেয়েরা মুখের সামনেই ভীতু বলে হাসাহাসি করে। দেব্রতবাবুর অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না। নিজের কাজটুকু নিয়মমতো মুখ বুজে করেই তার শান্তি। নিজের কাজ মানে অফিস ছাড়া জপ-তপ, সন্ধ্যা-আহ্নিক ইত্যাদি। আর ছোট্ট বাগানটির দিকে সকাল-সন্ধ্যা নজর রাখা।
বীরভূম জেলায় বোলপুরের কাছে এঁর আদি বাড়ি। সেখানকার ইস্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করে সেই যে কলকাতায় এসে পড়াশোনা আরম্ভ করেন সেই থেকেই তিনি একেবারে কলকাতার মানুষ হয়ে গেছেন। সায়েন্স নিয়ে তিনি কলেজে পড়েন। উঠতি বয়েসে–বোধহয় সায়েন্স পড়ার গুণেই খুব বিজ্ঞানভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। ফলে কোনো সংস্কার, অলৌকিক ঘটনা, তাগা-তাবিজ-মাদুলির গুণাবলী নস্যাৎ করে দিতেন। এই নিয়ে হোস্টেলের ছেলেদের সঙ্গে তার প্রায় রোজই তর্ক বাধত।
মানুষের জীবনে কত আশ্চর্য পরিবর্তনই না ঘটে। সেই তার্কিক মানুষই এখন রিটায়ার করার মুখে ঠাকুর-দেবতা, জপ-তপ, সন্ধ্যা-আহ্নিক সবই করেন। আর এতে পরম শান্তি পান। মাঝখানে তো তার এক অদ্ভুত খেয়াল হয়েছিল-পরলোকচর্চা। মৃত্যুর পর মানুষ–অর্থাৎ মানুষের আত্মা কোথায় যায়–কি বা তার পরিণতি–এসব তত্ত্ব জানার জন্যে তিনি দেশী বিদেশী অনেক বইও পড়ে ফেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্ল্যানচেট পর্যন্ত করতেন। প্ল্যানচেটে আত্মাকে ডেকে কিছু কিছু প্রশ্নও করতেন। পরে অবশ্য স্ত্রী অপছন্দ করায় বাধ্য হয়ে প্ল্যানচেট করা ছেড়ে দেন।
