টর্চের মিটমিটে আলোর ওপর ভরসা করে মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বোকামি। অপেক্ষা করতেই হবে। পাশের ঘরে যেতেও সাহস হয় না। অগত্যা এ ঘরের চৌকির ওপরই দুজনে বসলাম। পা গুটিয়ে একেবারে মাঝখানে। যাতে চট করে নাগাল না পায়। কী বোকা। এ কি সাপ বা বিছে যে পা তুলে বসলেই নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে? এ যে পেল্লায় একটা কুকুর! ছোট্ট একটা লাফ দিলেই একেবারে ঘাড়ের ওপর। তবু উপায়ই বা কী?
আমরা কলকাতার ছেলে। চট করে ভূতুড়ে কাণ্ড কিংবা অলৌকিক ব্যাপার মানতে পারি না। তাই কুকুরটাকে ঘরের মধ্যে দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল রাস্তার কুকুর-টুকুর হবে। বাসুদেব তো ওর স্বভাবমতো বলেই বসল, কুকুরটা কখন ঘরে ঢুকে বসেছিল না দেখেই দরজা বন্ধ করে গিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন দুজনেই অন্ধকারে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। সত্যিই তো অত বড় কুকুরটা দিন দুপুরে ঢুকল অথচ আমরা কেউ টেরই পেলাম না। এ কি সম্ভব! তখনই মনে পড়ল এইরকম একটা জন্তুকে সেদিন আমরা দেখেছিলাম মাঠ দিয়ে যেতে। প্রথমে মনে হয়েছিল শেয়াল, তারপর ধীরে ধীরে মুখটা বদলে হয়ে গেল কুকুর। সাংঘাতিক কিছু ঘটবার আগে ঐ কুকুরটাই কি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ডেকে ওঠে? এই কুকুরটার ভয়েই কি বগলা মজুমদার কথা বলতে বলতে উঠে চলে গিয়েছিলেন? সন্ধের মুখে মাঠ দিয়ে বাসার ফেরার সময় ঐ কুকুরটারই হাঁকড়ানি আমরা শুনেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সেই কুকরটাই কি একেবারে ঘরের মধ্যে?
খুব নিচু গলায় আমরা এই সব কথা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। কী বুদ্ধি বিভ্রম! নিচু গলায় কথা বলছিলাম কেন? না, পাছে কুকুরটা যদি (ঘরের কোথাও থাকে) শুনতে পায়।
আরে মুখ্যু! শুনতে পেলেও কুকুর কি মানুষের ভাষা বোঝে, আসলে ভয়ে সব কিছু ঘুলিয়ে যাচ্ছিল।
অন্ধকারে বসে আছি তো বসেই আছি। বিকেলে চা খাওয়া হয়নি। রান্নাঘরে গিয়ে যে চা করব তার উপায় নেই। কে জানে হয়তো এখানেই কোথাও কুকুরটা বসে আছে।
ক’টা বাজল? টর্চ জ্বালতেও ভয় করে। না জানি কী দেখব! তবু জ্বালোম। সবে সাতটা। ঘড়িটা চলছে তো? ঘড়ি-বাঁধা কবজিটা কানে লাগালাম। টিক, টিক, টিক টিক–হ্যাঁ, ঘড়ি চলছে। কে জানে এমনিভাবে সারা রাত বসে থাকতে হবে কিনা!
হয়তো তাই হবে। উপায় কী?
একবার বাসুদেব বলল, দেশলাইটা খোঁজার দরকার। আলো জ্বালতেই হবে।
কিন্তু কী করে আলো জ্বালব? দুজনেরই কেউই তো চৌকি থেকে নেমে দেশলাই খুঁজতে যেতে পারছি না।
বাসুদেব বলল, তোমার হাতে টর্চ আছে তো?
তা আছে। নেবে? বলে ও কিছু বলার আগেই টর্চটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।
হুঁ! বলে যেন চাপা একটু ধিক্কার দিয়ে বাসুদেবই আমার ওপর রাগ করে টর্চ জ্বেলে মাটিতে লাফিয়ে পড়ল। যেন মরণ ঝাঁপ দিল। তারপর এক ছুটে গিয়ে দেশলাইটা নিয়ে এসে চৌকিতে উঠে বসল।
আমার লজ্জা করল। কিন্তু উপায় কী? সাহস বলে বস্তুটা তো সবার সমান থাকে না।
অবশেষে আরও ঘণ্টা তিনেক পরে আপনা থেকেই আলো জ্বলে উঠল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বোঝার উপায় নেই। কারণ, বাইরের মাঠঘাট সবই অন্ধকারে ডুবে আছে।
তবু নামতে ভরসা নেই। অথচ নামতেই হবে। খাওয়ার দরকার। কোনোরকমে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম। বাসুদেব বাইরে দাঁড়িয়ে রইল সতর্ক হয়ে। মুশকিল এমন একটা লোহার রড বা ভাঙা ডালও নেই যে আত্মরক্ষা করা যাবে।
তাড়াতাড়ি দুজনে খেয়ে নিয়ে ভালো করে দরজায় খিল এঁটে শুয়ে পড়লাম। শোবার আগে চৌকির তলা, ঘরের কোনা, কুয়োতলা, জানলা বাইরের দিক দেখে নিলাম। দু’ঘরেই দুটো আলো জ্বালা থাকল।
কিন্তু দু’চোখ বন্ধ করেও চট করে ঘুম এল না। ঘরের মধ্যে ইঁদুর দৌড়নোর শব্দটুকুতেও চমকে উঠি–ওই বুঝি! জানলার বাইরে তো বারে বারেই কতরকমের শব্দ! একবার ঝুপ করে কী যেন লাফিয়ে পড়ল। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
কী হল? ঘুম জড়ানো স্বরে বাসুদেব জিগ্যেস করল।
বাইরে কী যেন লাফিয়ে পড়ল।
পড়ুক। বলে পাশ ফিরে শুল।
ভাবি, এক-এক জন মানুষ আছে কত সহজেই তারা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারে।
ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের রাতও শেষ হয়। ঘুম এমনি জিনিস। খুব ভয় পাচ্ছে–ঘুমিয়ে পড়ো। ব্যস্ এক ঘুমে রাত কাবার করে উঠে দেখবে ভোর হয়ে গেছে। আলো ফুটছে মানেই ভয় পালিয়েছে।
কিন্তু আমাদের দুর্ভোগ তখনও কাটেনি। ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে চা খেয়ে ভেতরের ঘরে এসে টেবিলের নীচে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম।
রক্ত! এতটা রক্ত কোথা থেকে এল! আমরা দুজনেই ঝুঁকে পড়লাম। মনে হল যেন তাজা রক্ত। কুকুরটা যেখানে ছিল সেখানেই। তাহলে কি কুকুরেরই রক্ত? মনে হল কিছু দিয়ে জোর করে আঘাত করার ফলেই রক্তপাত হয়েছে। কিন্তু কুকুরকে মারল কে? কখনই বা মারল? আর এত বড় শক্তিশালী কুকুরটাকে আঘাত করা কি দু একজনের কাজ? কিন্তু কুকুরটা কই?
তাহলে?
এসব এমনই রহস্য যা এখনই দুজনে বসে আলোচনা করে মীমাংসা করা যাবে না। তার দরকারও নেই। গতকাল থেকেই ঠিক করে ফেলেছি। যথেষ্ট হয়েছে। আর এখানে নয়। অনেক কিছুই তো দেখা হল। বাকি থাকল শুধু সেই পোড়ামুখ সাহেবের বাড়িটা অন্তত দেখা যেখানে তিনু ঘোষ এক রাত্রি ছিলেন। যাক গে। এখন কলকাতা ফিরতে পারলে বাঁচি। বাসুদেব প্রথমে রাজি হয়নি। ও সেই বাড়িটা খুঁজে বের করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এখন রাত্রে সেই কুকুরের ছায়া-শরীর দেখে ঠিক করেছে আজকালের মধ্যেই কলকাতা ফিরে যাবে। নিজেরাই রক্তটা পরিষ্কার করে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালাম। অত বড় কুকুরটা কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? রক্ত ছাড়া আর কোনো চিহ্নই রেখে যাবে না?
