অবাক হয়ে বললাম, সে কী! উনি তো আমাদের কাছেই গিয়েছিলেন। তারপর রাত আটটা বাজাবার আগেই চলে আসেন খুব ব্যস্ত হয়ে।
ওরা অবাক হয়ে বলল, কাল রাত্তিরেই চলে এসেছিল? সে কী! তাহলে কত্তা গেল কোথায়? সারা রাত থাকল কোথায়? ওর তো থাকার কোথাও তেমন জায়গা নেই।
আর একজন বলল, খুব ব্যস্ত হয়ে চলে এসেছিল বলছেন?
হ্যাঁ, বাসুদেব বলল, যেন ভয় পেয়ে।
কীসের ভয়?
বাসুদেব বলল, তা তো জানি না। তবে কথা বলতে বলতেই উনি হঠাৎ উঠে পড়লেন। বললেন, এখুনি হয়তো শুনতে হবে জন্তুটার হাড়-হিম-করা ডাক! তাই
তারপর?
তারপর উনি লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে পড়লেন।
একা?
হ্যাঁ, সঙ্গে আর কেউ ছিল না।
তারপর?
ওঁর আরো কিছু বলার ছিল–মানে আমাদের সাবধান করে দেবার জন্যে। সেটা বলার জন্যে ওঁর আবার আসার কথা ছিল। তা আমরা ভাবলাম, উনি আবার কষ্ট করে আসবেন কেন, আমরাই যাই। তাই
হরিপদও যে অন্ধকার মাঠ দিয়ে তাকে যেতে দেখেছিল সে কথা বললাম না।
কীর্তনিয়াদের আখড়া থেকে আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। খেয়ালই করিনি এরই মধ্যে বেলা শেষ হয়ে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু
কিন্তু বগলা মজুমদার কোথায় গেলেন?
সে চিন্তা আপাতত শিকেয় তুলে আমরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আন্দাজে অচেনা পথ ধরে হাঁটা–ভাবলেও শিউরে উঠছিলাম। এরকম ভয় আগে পাইনি। কিন্তু এখন যা সব ঘটছে–যা সব শুনছি তাতে মনের জোর হারিয়ে ফেলছি। মনে হচ্ছে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা কোলকাতা থেকে এসেছিলাম তা মাঝপথেই বন্ধ করে দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই।
অন্ধকারেই বাসুদেবের দিকে তাকালাম। সেও নির্বাক। কথা বলে এনার্জি নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি বাসায় পৌঁছতে পারাই দরকার। তবু ভাগ্যি টর্চটা এনেছিলাম। দুজনে হেঁটে চলেছি। নিস্তব্ধ মাঠ। মাঝে মধ্যে গাছপালা, ঝোপঝাপ। ঝোপের মধ্যে ঝিঁঝি ডাকছে। কিন্তু সেসব শোনবার মতো মন নেই। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছিই। শুধু দুজনের জুতোর শব্দ।
এক-এক সময়ে ভয় হচ্ছে ঠিক পথ ধরে যাচ্ছি তো? শেষ পর্যন্ত ভুল করে বাঁওড়ের ধারে গিয়ে পড়ব না তো?
হঠাৎ বাসু আমার হাত ধরে টেনে একপাশে সরিয়ে নিল। কী একটা ছোটোখাটো প্রাণী… জ্বলজ্বল করছে চোখ–একেবারে আমাদের গা ঘেঁষে গড়াতে গড়াতে চলে গেল।
কী ওটা? অমন ভরে যাচ্ছে কেন? জিগ্যেস করলাম বাসুকে।
বাসুদেব উত্তর দিল না।
শুধু আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগল।
একটু পরে কোথায় যেন কুকুরের কান্না শোনা গেল। খুব অস্পষ্ট। কে যেন কুকুরটাকে পিটিয়ে মারছে।
জিগ্যেস করলাম, বাসু, শুনতে পাচ্ছ?
বাসুদেব বলল, ওদিকে কান দিও না। চুপচাপ চলো।
বাসুদেবের গলায় যেন কেমন অন্যরকম সুর।
ক্রমে কুকুরের কান্না মিলিয়ে গেল। তারপরই হঠাৎ একটা ভীষণ হুংকারে চারদিক যেন কেঁপে উঠল। প্রথমে হুংকার। তারপর টানা গর্জন। যেন প্রচণ্ড রাগে কোনো জন্তু গর্জন করছে–করেই যাচ্ছে। জন্তুটার ডাকটা যে বিকটাকৃতি কোনো হিংস্র কুকুরের তা বুঝতে অসুবিধা হল না। কিন্তু কোন দিকে থেকে ডাকটা আসছে, কেমন করে আমরা সাবধান হব তা বোঝা গেল না। সেই ভয়ঙ্কর ডাকে নিস্তব্ধ মাঠখানা যেন কেঁপে উঠছিল। বাতাস চমকে উঠছিল।
সভয়ে বললাম, এই কি তাহলে সেই অশরীরী ডাক?
বাসুদেব বলল, এ যেন সেই কোনান ডোয়েলের লেখা ‘হাউন্ড অফ বাস্কারভিলের হাউন্ডের ডাক! মনে পড়ছে তো? জোরে, আরো জোরে হাঁটো। নইলে হয় তো আরও বড় বিপদে পড়তে হবে।
ভয়ে ভয়ে বললাম, কিন্তু সামনে যদি কুকুরটা—
তাহলে মরতে হবে। তা বলে তো অন্ধকার মাঠে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।
তারপর কী করে যে আমরা মাঠ পার হয়ে বাসায় এসে ঢুকলাম তা সঠিক বলতে পারব না।
অথচ নিরাপদে পৌঁছনোর কথা ছিল না। বিশেষ যখন হরিপদর মুখে শুনেছিলাম দের রোষ আমাদের মাথার ওপরে খাঁড়ার মতো ঝুলছে। নিষ্কৃতি নেই। আর কী কারণে তার রোষ তা আমরা মানি বা না মানি যুক্তির অভাব ছিল না। প্রধান কারণটা বোধহয় এই যে, আমরাই বেশি উৎসাহ করে ওদের রহস্যের জাল ছিঁড়ে প্রকাশ্যে টেনে আনার জন্যে একেবারে কলকাতা থেকে এখানে ছুটে এসেছি। এত সাহস!
এটাই আমাদের অপরাধ–গুরুতর অপরাধ!
যাই হোক মাঠের মধ্যে ঐ ভয়ঙ্কর গর্জন শুনেও আমরা যে নিরাপদে বাসায় পৌঁছতে পেরেছি তার জন্যে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলাম। কিন্তু ভাগ্য যে পুরোপুরি প্রসন্ন ছিল না তা একটু পরেই বুঝতে পারলাম। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজার কাছে এসে কোনোরকমে তালা খোলা হল। কিন্তু দরজা খুলে আলো জ্বালতে গিয়ে দেখি আলো জ্বলছে না। ….বুঝি লোডশেডিং। টর্চের আলোয় কোনোরকমে শোবার ঘরে এসে ঢুকলাম। তারপর মোমবাতি খোঁজবার জন্যে টেবিলের কাছে যেতেই কালোমতো কী একটা জন্তু টেবিলের নীচে গরর গরর করে উঠল। আমি চিৎকার করে উঠলাম। বাসুদেব ছুটে এল। টর্চের আলো ফেলা হল টেবিলের নীচে। কিন্তু আশ্চর্য! কিছুই নেই। অথচ জন্তুটাকে অন্ধকারেও আমি দেখেছি। কালো রঙের কুকুর জাতীয়। বেশ বড়। বাসুদেবও গরর গরর শব্দ পাশের ঘর থেকে শুনেছে।
তাহলে?
তাজ্জব ব্যাপার। দরজা বন্ধ, জানলা বন্ধ। অতবড় কুকুরটা এলই বা কোথা দিয়ে, গেলই বা কোথায়? নিশ্চয়ই দুটো ঘরের মধ্যেই কোথাও ঘাপটি মেরে রয়েছে।
