ধমকে উঠল বাসুদেব। বলল, শেয়াল নয় তো কী?
ভালো করে দেখুন, বাবুরা–ভালো করে দেখুন। ঐ যে মুখটা বদলে যাচ্ছে…এবার ছুটছে জঙ্গলের দিকে বাঁওড়-বাঁওড়
তাই তো! ভালো করে চোখ রগড়ে নিলাম। শেয়ালটা হয়ে গেছে বিরাট একটা কালো কুকুর।
এসবের মানে কী? তাকালাম বাসুদেবের দিকে। বাসুদেব চুপ! একটু পরে বলল, ও কিছু না, চোখের ভ্রম।
তারপর হরিপদকে বলল, তোমার কী মনে হচ্ছে?
ভালো না বাবু, ভালো না। খুব খারাপ। ও তো রাস্তার কুকুর নয়। দেখেননি গলায় বকলস বাঁধা ছিল। ঐ লোকটা যিনি কাল সন্ধেবেলা এসেছিলেন তার খোঁজ করতে যাবেন বলেছিলেন, যাবেন তো? গেলে বলে দেবেন ওঁরও বিপদ।
হ্যাঁ যাব।
তা হলে তাড়াতাড়ি দুবেলারই রান্না করে দিয়ে আমিও চলে যাব। আর ওবেলা আসব না। আপনারাও যত তাড়াতাড়ি পারেন কলকাতায় ফিরে যান।
.
বগলার অন্তর্ধান
হরিপদ আমাদের খাইয়ে দিয়ে ওবেলার রান্না সেরে বেলা তিনটের মধ্যেই চলে গেল। যা, রাতের বেলার জন্যে নিশ্চিন্ত। কাল আর ও আসবে কিনা কে জানে।
হরিপদ চলে যাবার পর আমরা কিছুক্ষণ হরিপদর কথা নিয়ে আলোচনা করলাম। ও যা বলে গেল তা সব বিশ্বাস করা না গেলেও এটুকু বোঝা গেল এখানকার রহস্যময় ব্যাপারগুলোর অনেক কিছুই ও জানে। জানাটাই স্বাভাবিক। কারণ, ও তো এখানেই আছে জন্ম থেকে। ওর কথা থেকেই এখন অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল তিনু ঘোষ যা বলেছিল তা অনেকটা ঠিক। ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কামরার সেই উদ্ধত অহংকারী সাহেব আর তার দুই সঙ্গী কুকুরটা আর নিগ্রোটা নিরীহ একজন প্যাসেঞ্জারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যে অপরাধ করেছিল তার প্রতিফল পেয়েছিল। পাবলিকের তাড়া খেয়ে বর্ধমান স্টেশন থেকে এতদূর পর্যন্ত ছুটে আসতে পেরেছিল। তারপর মৃত্যু ঘটেছিল এখানেই। এখানেই তাকে আর দুই সঙ্গীকে কবর দেওয়া হয়েছিল বাঁওড়ের ধারে। সাহেব মরার আগেও এতটুকু অনুতাপ করেনি। তাই তার ক্রুদ্ধ আত্মা শান্তি পায়নি। এই অঞ্চলের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই অঞ্চলেই কোনো একটা বাড়িতে তার আস্তানা। এখনও পর্যন্ত সেই বাড়িটার সন্ধান আমরা পাইনি। সে চায় না তাকে কেউ বিরক্ত করুক। তাকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করুক। তাই যে কেউ যে কোনো ভাবে তার খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করছে তাকেই শেষ করে দিচ্ছে।
আর ঐ যে হরিপদ বলল, ‘আপনাদের ওপর দোর রোষ’ তার কারণ আমরা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি তা সাহেবের পছন্দ নয়। ভালো মানুষের মতো নিজেরা চলে না গেলে আমাদের সরিয়ে দেবে। প্রথম রাত্তিরে ভয় দেখিয়েছিল। এবার ভয়টা কাজে পরিণত করবে।
কিন্তু শেয়ালটার কী ব্যাপার হল?
বাসুদেব নিজেও তো শেয়াল বলেই চিনেছিল। তারপর বলল, চোখের ভ্রম। এটা মনকে চোখ ঠারা। প্রথম অভিজ্ঞতায় যা অস্বাভাবিক যা অলৌকিক বলে মনে হবে, পরে জোর করে তা মন থেকে সরিয়ে দেবে। এ কেমন কথা? অলৌকিক বলে যে কিছু থাকতে পারে তা সে মানতেই চায় না।
এই যে একটু আগে শেয়ালটাকে স্পষ্ট দেখা গেল (আগের দিনও আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম, আজও বাসুদেবও দেখল)। তবু ও ওটাকে শেয়াল বলে মানবে না। না মানাটাই স্বাভাবিক। কারণ, চোখের সামনে দিনের বেলাতেই অতবড় শেয়ালটা আস্তে আস্তে বড় একটা কুকুর হয়ে গেল। এটা সম্ভব কী করে? তবু সম্ভব। কারণ, এখানে এসে পর্যন্ত আমরা একরকম অলৌকিক জগতে রয়েছি। বিশেষ করে, হরিপদ কুকুরটার গলার বকলস পর্যন্ত দেখতে পেল। অর্থাৎ শেয়াল থেকে কুকুরে যেটা রূপান্তরিত হল সেটা রাস্তায় একটা কুকুর নয়, সেটা যে সেই সাহেবেরই কুকুর তা প্রমাণিত হল। অথচ হরিপদ তো সে কুকুরটা দেখেনি, যেটা দেখেছিল তিনু ঘোষ নিতান্ত অল্প বয়সে। তাহলে সেই বাঙালি ভদ্রলোকের লাথি খেয়ে প্ল্যাটফর্মে ছিটকে পড়েও কুকুরটা মরেনি?
ঘণ্টাখানেক পর আমরা দুজনে বগলা মজুমদারের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। যদিও হরিপদর কাছ থেকে অনেক কিছুই জানা গেল তবু বগলাকে আর একবার পাওয়া দরকার। দুজনের কথা শুনতে পেলে বিষয়টা অনেকটা পরিষ্কার হবে। আর তখনই ঠিক করতে পারা যাবে হরিপদর দোটির সঙ্গে দেখা করা সম্ভব কিনা।
কিন্তু আশ্চর্য, সারা দুপুর জায়গাটা এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত খুঁজেও বগলার খোঁজ পাওয়া গেল না। শেষে প্রায় পড়ন্ত বেলায় একটা হরিসংকীর্তনের আখড়ায় গিয়ে জানা গেল এখানেই তিনি থাকেন। খোল বাজান। একসময়ে নাকি এখানে ওঁর পূর্বপুরুষের কীর্তনিয়া হিসাবে নামডাক ছিল। এখন কিছুই নেই। নিজেরও কোনো সম্বল নেই। মড়া নিয়ে যাবার সময় বা শ্রাদ্ধে কিংবা হরিনামের আসরে বায়না পেলে দুটো পয়সা রোজগার। তা ছাড়া অবশ্য জমি, বাড়ির সামান্য দালালি করেন। লোকটি এক ধরনের পাগল। নিজেকে খুব বড়ো করে প্রচার করেন। হামবড়াই ভাব। জমিদার বংশের ছেলে। অথচ জানে না লোকে হাসে।
বগলার পরিচয় পেয়ে অবাক হলাম।
কীর্তনীয়াদের একজনকে জিগ্যেস করলাম, তার সঙ্গে একবার দেখা করা যায়?
লোকটি বলল, সে তো এখন নেই।
কোথায় গেছে জিগ্যেস করলে লোকটি বলল, এখানে কোথায় কলকাতা থেকে দুটি ছোকরাবাবু এসেছেন। তাঁদের সম্বন্ধে নানা জনে নানা কথা বলছে। মজুমদারকে সবাই ঠাট্টা করে কত্তা বলে ডাকে। তাই কী উদ্দেশ্যে হঠাৎ কলকাতা থেকে ওঁরা এসেছেন জানবার জন্যে কেউ না বলতেই নিজে থেকে কাল সন্ধেবেলা সেখানে গেছে। কিন্তু আজও ফেরেনি।
