বুঝলাম এখানেই কোথাও বাড়ি কিনতে এসে এক রাত্তির কাটাতে গিয়ে বেলেঘাটার তিন ঘোষও ভয় পেয়ে পালিয়েছিলেন।
আসলে লোকটা ছিল তো সাহেবের জাত। আবার বলতে শুরু করল হরিপদ। সাদা চামড়া, আর অনেক টাকার মালিক বলে অন্য মানুষকে ঘেন্না করত। আর তারই ফলে প্রাণ হারাল কোথাও নয় এই গ্রামের পথে।
এইটুকু শুনেই আমরা দুজনে কান খাড়া করে রইলাম।–এই সাহেবের কথা আমরা জেনেছিলাম তিনু ঘোষের মুখে। কিন্তু পাবলিকের তাড়া খেয়ে বর্ধমান স্টেশন থেকে বেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তার কী দশা হল তা জানা যায়নি। কারণ, তিনু ঘোষ নিজেও তা সঠিক জানতেন না। এখন সেই অজানা তথ্য জানাচ্ছে আমাদের রাঁধুনি হরিপদ। এটা ভাবাই যায়নি।
তারপর? লোকটা তাহলে সাহেব ছিল?
হ্যাঁ বাবু, তবে তার একটা চাকর ছিল। সে আরও হিংস্র। আর ছিল সাহেবের পোষা কুকুর। এই তিনজনে একসঙ্গেই চলাফেরা করত বলে শুনেছি। সাহেবের কোনো বিপদ হলে তার চাকর আর ঐ কুকুরটা এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত তাদের প্রভুকে বাঁচাতে।
কিন্তু এবার সাহেবকে বাঁচাতে পারা গেল না, কী বলে?
কী করে যাবে! মারমুখি কাতারে কাতারে লোক। কুকুরও মল, চাকরটাও মল-সাহেবটাও।
কোথায় মানে কোন জায়গাটায় মরল সাহেবটা?
তা বলতে পারি না। তবে সাহেবের মড়া বলে বিভ্রাট হয়েছিল বলে শুনেছি। প্রথমে ওর চাকরটার সঙ্গে চিতায় তোলা হয়েছিল, সেই সময় গির্জার পাদ্রি গিয়ে পড়ায় ভুলটা শুধরে জ্বলন্ত চিতা থেকে সাহেবের মড়াটা তাড়াতাড়ি করে তুলে পাশেই গোর দেওয়া হল। সাহেবের মুখটা পুড়ে গিয়েছিল। আর তার পাশেই মাটি দেওয়া হয় কুকুরটাকে।
এর পর থেকেই কি এখানে যত খুন-খারাপি? কোনো কারণে প্রাণভয়ে পালাতে গিয়ে গ্রামবাসীদের হাতে মার খেয়ে অপঘাতে মরল ওরা তিনজন–তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে এখন ঐ সাহেব দো?
হরিপদ হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আর আমায় জিগ্যেস করবেন না, বাবু। জানে মেরে দেবে।
আর দু-একটা কথা জানতে চাইব। তুমি বুঝতে পারছ না হরিপদ, এসব কথা জানিয়ে তুমি আমাদের কত উপকার করলে। আচ্ছা, তুমি কি তোমাদের ঐ দেকে না ওর শাগরেদটিকে কখনও দেখেছ?
না, দেখিনি। রক্ষে করুন যেন দেখতে না হয়। গতকাল রাত্রেই তো মাঠের মধ্যে তেনার পায়ের শব্দ শুনেই ভিরমি খেয়েছিলাম।
এখানকার কেউ আজ পর্যন্ত তাকে দেখেননি?
হরিপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, দু-একজন দেখেছিল।
কোথায়? কোথায় তোমাদের ঐ দেবতার আস্তানা?
হরিপদ বলল, শুনেছি বাঁওড়ের ওপারে ফণিমনসার ঝোপের পেছনে একটা মাঠে। দোতলা বাড়ি।নাঃ বাবু, আমার আর বাঁচার পথ রাখলেন না। সব জেনে নিলেন।
অভয় দিয়ে বাসুদেব বলল, তুমি যতক্ষণ আমাদের কাছে আছ, তোমার কোনো ভয় নেই।
হরিপদ ব্যাকুলভাবে বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে রইল।
আচ্ছা, যারা দেখেছে তাদের জিগ্যেস করলে ওঁর সঙ্গীদের সম্বন্ধে আরও কিছু জানা যায় না?
হরিপদ তেমনি ভাবেই তাকিয়ে রইল।
আমরা তাহলে তোমার সঙ্গে তাদের দু-একজনের কাছে যাব?
হরিপদ হতাশ সুরে বলল, গিয়ে কী হবে? তাদের একজন নিরুদ্দেশ, একজন বিছানায় পড়ে আছে। কথা বলতে পারে না। আর একজন পাগল হয়ে গেছে।
ইস্! অসতর্কভাবেই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে শব্দটা বেরিয়ে এল। একটু চুপ করে থেকে বললাম, আর একটা কথা জিগ্যেস করব।
বাসুদেব কানে কানে বলল, এখন আর জিগ্যেস করো না। ও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
চাপা গলায় বললাম, এর পর হয় তো সুযোগ পাওয়া যাবে না। ও বেলা থেকে ও আর নাও আসতে পারে।
তাহলে জিগ্যেস করো।
হরিপদকে জিগ্যেস করলাম, যিনি কাল সন্ধেবেলা আমাদের এখানে এসেছিলেন তাঁকে নিশ্চয় চেন?
হরিপদ মাথা নাড়ল।
অবাক হয়ে বললাম, সে কী! উনি তো খুব বড় ঘরের মানুষ। জমিদারবাড়ির বংশধর নাকি?
হরিপদ মোটেই আগ্রহ দেখাল না। শুধু মাথাটা নেড়ে গেল।
আশ্চর্য! এইটুকু জায়গা–সারা জীবন এখানেই কেটেছে। অথচ
ওঁর নাম বগলা মজুমদার।
হরিপদ ফের মাথা নাড়ল।
এ নামটাও তোমার জানা নয়?
না।
তারপর ওর ভুরু দুটো একটু কুঁচকে উঠল। কী যেন ভাবতে চেষ্টা করল।–কী নাম বললেন?
বগলা মজুমদার।
উনি কি জমির দালালি করেন? বাড়ি-টাড়ি
বললাম, তা জানি না। তবে আমাদের এ বাড়িটা তিনিই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
এ কথায় হরিপদ কেন যে চমকে উঠল বুঝতে পারলাম না। কারও জন্যে বাড়ি দেখে দেওয়া কি কিছু দোষের? তা হলে?
হরিপদ মুখ গম্ভীর করে বলল, সব্বনাশ বাবু। আর দেরি করবেন না। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারেন ফিরে যান।
বাসুদেব রাগতভাবে বলল, ফিরে তো যাবই। তবে আগে তোমাদের ‘দো’র স্বরূপটা নিজে চোখে দেখি। তারপরে।
হরিপদ চোখ বড় বড় করে বলল, এইজন্যেই কি আপনারা কলকাতা থেকে এখানে এসেছেন?
বাসুদেব বলল, ধরো তাই।
হরিপদ গুম হয়ে গেল।
হঠাৎ দেখলাম মাঠের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে চলেছে বিরাট একটা শেয়াল। ঠিক যেমন প্রথম দিন দেখেছিলাম। আর যা সেদিন বাসুদেব বিশ্বাস করতে পারেনি।
তাড়াতাড়ি বাসুদেবকে ঠেলা দিয়ে বললাম, দ্যাখো দ্যাখো সেদিনের শেয়ালটা।
বাসুদেব আর হরিপদ দুজনেই মুখ বাড়িয়ে দেখল।
বাসুদেব অবাক হয়ে বলল, তাই তো। শেয়াল এত বড় হয়? আর অমন হেলেদুলে যায়? তাও দিন দুপুরে!
কিন্তু হরিপদ তখনই কিছু বলল না। সে আরও কিছুক্ষণ লক্ষ করল শেয়ালটাকে। তারপর ভয়ে উত্তেজনায় কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ওটা কি শেয়াল?
