কীসের আলো? ভাবতে ভাবতেই আলোটা আর দেখা গেল না। তারপরেই দূরে কোথায় যেন একটা কুকুর কেঁদে উঠল। একবারই। আমি বাবু, রীতিমতো ভয় পেলাম। বুঝলাম এর পরই সেই ভয়ঙ্কর গর্জন শোনা যাবে। আর–বাবু, কুকুরের সেই হাঁকড়ানির পরেই দেবতার চলাফেরা শুরু হবে। মাঠ পার হয়ে বাড়ি পৌঁছোব কী করে ভেবে তখনই রামনাম করতে করতে বেরিয়ে গেলাম।
বাসুদেব জিগ্যেস করল, ডাকটা কি একটা কুকুরেরই?
তাই তো মনে হয়।
কুকুরটা দেখেছ কখনও?
না বাবু। কুকরটার ডাক এখানে অনেকেই শুনেছে। কিন্তু কেউ দেখেনি। ও দেখার জিনিস নয়।
কোন দিক থেকে শব্দটা আসে? জিগ্যেস করলাম।
বুঝতে পারা যায় না। কখনও মনে হয় পুব দিক থেকে, কখনও মনে হয় পশ্চিম দিক থেকে, কখনও উত্তর–এসব দোর মর্জি বাবু!
ঠিক আছে। তারপর?
তারপর হরিপদ যা বলল তা এইরকম–
আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে হরিপদ চোখ-কান বুজে হাঁটতে লাগল মাঠের ওপর দিয়ে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মনে হচ্ছিল চোখের সামনে যেন এক একটা অন্ধকারের পাঁচিল। এখুনি ধাক্কা লাগবে। নিতান্ত চেনা পথ বলে এগিয়ে যেতে পারছিল।
অল্প দূর যাবার পর চোখে পড়ল একটা ঘোলাটে আলো দুলতে দুলতে পাশ দিয়ে যাচ্ছে। ভালো করে ঠাওর করে দেখল একটা লোক আমাদের বাসার দিক থেকে এসে ‘ মাঠের ওপর দিয়ে খুব জোরে হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে একটা লণ্ঠন।
এই নির্জন মাঠে–যেখানে চারিদিক নিঝুম–গলা টিপে মেরে ফেললেও কেউ টের পাবে না।ভয়ে যখন কাঁটা তখন ঠাকুরের কৃপায় একজন মানুষকে দেখতে পেয়ে হরিপদ ভরসা পেল। সে ডেকে উঠল–একটু দাঁড়ান মশাই। আমিও যাব ঐ দিকে।….
কিন্তু হরিপদর ডাক শুনে উল্টো ফল হল। লণ্ঠন হাতে লোকটি যেন ভয় পেয়ে আরও জোরে হাঁটতে লাগল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল বাবু। আলোটাও আর দেখা গেল না। তাজ্জব ব্যাপার!
সঙ্গে সঙ্গেই হরিপদর আবার ভয় পেতে লাগল। নিজেকে কেমন অসহায় মনে হতে লাগল। পা দুটো কাঁপতে লাগল।
আর তখনই স্পষ্ট বুঝতে পারল পিছনে কেউ একজন আসছে। নির্জন মাঠে সঙ্গী পাওয়া যাবে মনে করে হরিপদ পেছন দিকে তাকাল। কিন্তু
কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। শুধু একটা ঠান্ডা বাতাস মাঠের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
মনের জোরে প্রাণপণে হাঁটতে লাগল হরিপদ। কিন্তু একী! এতক্ষণ হেঁটেও নিজের বাড়ি খুঁজে পাচ্ছে না কেন? সে কি পথ ভুল করল?
হঠাৎ মনে হল কেউ যেন আবার তার পিছু নিয়েছে। সে এগিয়ে আসছে….ক্রমেই এগিয়ে আসছে। পাওয়া যাচ্ছে নিঃশ্বাসের শব্দ। সে নিঃশ্বাস না কি মানুষের নয়…..।
কথা শেষ করে হরিপদ হাঁপাতে লাগল।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সহানুভূতি জানিয়ে বাসুদেব বলল, খুবই বিপদে পড়েছিলে দেখছি। কিন্তু আমাদের ওপরই দের রোষ বুঝলে কী করে?
হরিপদ হাতের কাছের ঘটি থেকে খানিকটা জল খেয়ে গামছায় মুখটা মুছে নিয়ে বলল, এ কি আর বোঝার অসুবিধে হয়, বাবু? আপনারা তো ক’দিন হল এসেছেন। তার আগে যদিও বেশ কয়টা অঘটন ঘটে গেছে তবু আপনারা আসার পর থেকে এই প্রথম আপনাদের বাসা থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে ভয় পেলাম। রান্নাঘরে বসে অন্ধকারে বিদ্যুতের ঝিলিক দেখলাম। সত্যি বিদ্যুৎ হলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু এ তো-ধরুন না কেন–বিদ্যুৎ কি মাত্র একবার চমকায়? খামোকা কুকুর অমন করে কেঁদে উঠবে কেন? তাও একবার। এ যেন শুধু আমাকে ভয় দেখাবার জন্য। অথচ আমি গরিব নিরীহ মানুষ। কোনো সাতে পাঁচে নেই। তাছাড়া–তাছাড়া দেখুন, ঐ যে লোকটি আপনাদের সঙ্গে ভয়ে ভয়ে কথা বলছিলেন তিনিও তো একটু পরেই ভয় পেয়েই চলে গেলেন তাড়াতাড়ি। তা হলে আপনাদের এই বাসায় এমন কিছু ব্যাপার আছে যার জন্যে ‘দেবতা’ কুপিত!!
নিতান্ত মজা করেই বাসুদেব হরিপদকে সমর্থন করতে গিয়ে গত রাত্রের কথা বলতে যাচ্ছিল, আমি ইশারায় থামিয়ে দিলাম। সে কথা শুনলে হরিপদ আর কখনও আমাদের বাসামুখো হবে না।
জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা হরিপদ, তোমার তো বেশ বয়েস হয়েছে। চুলে পাক ধরেছে। এখানেই তো আছ বরাবর?
হ্যাঁ বাবু। এখানেই জন্ম, এখানেই বড় হওয়া, এখানেই মরার ইচ্ছে।
তা এখন এই যে সব উৎপাত দেখছ–
হরিপদ জিব কেটে, দু’হাতে কান চাপা দিয়ে বলল, ‘উৎপাত’ বলবেন না! যা কিছু হচ্ছে তা তো দেবতার লীলা।
বললাম, আচ্ছা, তাই না হয় হল। তা এরকম লীলা এখানে ছোটোবেলায় দেখেছ?
আজ্ঞে না। কিন্তু পরে ক্রমশ নানা কথা ছড়াতে লাগল। তারপরেই দেৰ্তাদের লীলা শুরু হল। তারপর যখন আদিবাসীদের দুজন হঠাৎ মুখ দিয়ে রক্ত তুলে মল আর এই সেদিন জগা মণ্ডলের লাশ পাওয়া গেল বাঁওড়ের জলে, তখন থেকেই শুরু হল বুকের কাঁপুনি। আর এখন তো মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কোনো ক্ষতি হবে আমাদের।
বাসুদেব বললে, হরিপদ, তুমি একটু আগেই বললে নানা কথা ছড়াতে লাগল’–তা সেই নানা কথাগুলো কী? দু একটা বলো না।
এ কথায় হরিপদর মুখটা শুকিয়ে গেল। বোঝা গেল তার বলতে ইচ্ছে করছিল না। শুধু যে ইচ্ছে করছিল না তা নয়, ভয়ও করছিল।
কেন ভয় সেটাই জানতে চাই আমরা।
আমরা আবার বলতে বললাম। ও হাত জোড় করে বলল, ও সব কথা থাক না, বাবু। দেখছি তো দেদের নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করতে গিয়েছে–এমনকি কেন, কী বিত্তান্ত জানতে চেষ্টা করেছে হয় তারা মরেছে নয় প্রাণের ভয়ে পালিয়েছে।
