কালো মুখ সাদা চামড়া পাই এই গেরামেই নাকি তেনার অধিষ্ঠান। কখন কার ওপর তেনার রোষ পড়বে কেউ জানে না। রোষ পড়লেই তার সব্বনাশ। মাঝে-মাঝেই তো দু-একজন যাচ্ছে। নইলে জগা মোড়লের মতো সোমত্ত জোয়ান বাড়ি থেকে বেরোল আর ফিরল না!
চা, জলখাবারের কথা ভুলে বাসুদেব একটা টুল টেনে নিয়ে বসে পড়ল।
তুমি জগা মোড়লকে চিনতে?
চিনতাম বৈকি বাবু। তাগড়াই জোয়ান ছিল। একবার জ্যাষ্ট মাসে মোষের গাড়ির একটা মোষ গরমে হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে রাস্তা থেকে নেমে পুকুরের দিকে ছুটছিল। গাড়ি লাট খায় আর কি। জগা ফিরছিল হাট থেকে। ছুটে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে দুহাত দিয়ে শিঙ চেপে ধরেছিল মোযটার। বারকতক মাথা আঁকাবার পর ঠান্ডা মেরে গিয়েছিল মোষটা। অথচ সেই ছেলেটাই–এই পর্যন্ত বলে থামল হরিপদ।
হরিপদ বলতে লাগল, এখানে রাতের বেলায় এক-একদিন একটা শব্দ ওঠে। যেন দেৰ্তা আড়াল থেকে গজরাচ্ছেন। তারপরেই তিনি নেমে আসেন মাটিতে। সঙ্গে থাকে একটা শাগরেদ। যার সব্বনাশ করবেন তার বাড়ি নিশানা করে ঘুরবেন চারিদিকে। তারপর ঘরে ঢুকে
বাধা দিয়ে বললাম, তা জগার কী হয়েছিল বলো।
জগার মরণ-পাখা গজিয়েছিল। সে বলত ঐ শব্দটা ঠিক কীসের খুঁজে বের করবই। শব্দ উঠলেই ও দলবল নিয়ে মশাল জ্বালিয়ে হৈচৈ করে ছুটত। কখনও বড় বড় হাউই ছুড়ত আকাশের দিকে। বোকা গোঁয়ার ছোঁড়াটা ভাবত অশরীরী কেউ বাতাসে ভেসে থাকলে হাউই-এর আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু কপাল মন্দ। তাই নিজেই মরল।
ব্যাপারটা কী হয়েছিল?
শুনলাম, সেদিন সারা দিনভর খাটাখাটনি করে সন্ধে রাতে ঘরে এসে শুয়েছিল। হঠাৎ কাছেই কোথাও যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল। কুকুর তো কতই ডাকে বাবু। কিন্তু এ ডাক আলাদা। মেঘ ডাকার মতো গর্জন।
বাড়ির কাছে ডাক শুনে ধড়মড় করে উঠে বসেছিল ছোঁড়াটা। দলবল কেউ ছিল না। দেওয়ালের কোণ থেকে সড়কিটা নিয়ে লণ্ঠন হাতে ছুটল খামারবাড়ির দিকে।
ব্যস্, সেই যে গেল আর জীবন্ত ফিরল না। পরের দিন লাশ পাওয়া গেল বাঁওড়ের জলে।
এই বলে হরিপদ মাথাটা হেলিয়ে দিল দেওয়ালে।
কীভাবে মরেছিল জিগ্যেস করলাম।
কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না হরিপদ। তারপর দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, আজ্ঞে ঘাড়টা মুচড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মুখ দিয়ে রক্ত উঠেছিল।
ওকে কে মারল ধারণা করতে পার? বাসুদেব জিগ্যেস করল।
হরিপদ ফের হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে শুধু বলল, দেবতার রোষ বাবু!
তোমাদের এই দেবতার উৎপাত এখানে কতদিন ধরে চলছে?
হরিপদ শিউরে উঠে জিব কাটল। বলল, ‘উৎপাত’ বলবেন না, বাবু। একেই তো আপনাদের ওপর রোষ বর্তেছে–বলুন দেবতার মর্জি।
যাই হোক, এটা চলছে কতদিন?
হরিপদ বলল, খুব বেশিদিন নয়। বাবা বলতেন, এমন চুপচাপ জায়গা এ অঞ্চলে আর ছিল না। কোনো হাঙ্গামা হুজ্জোৎ এখানে হত না। তারপর হঠাৎই একদিন দেবতার আবির্ভাব জানান দিয়ে গেল–পর পর তিনদিন বাজ পড়ল বাবু এক নাগাড়ে। তিন তিনটে বিরাট দেবদারু গাছ যা প্রহরীর মতো আমাদের গেরামকে রক্ষে করত–ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে! উঃ সে কী শব্দ!
তারপর?
তারপর থেকেই মাঝে মাঝে অনেক রাতে কুকুরের ডাক। প্রথমে কুকুরের কান্না। তারপর বুক-কাঁপানো গর্জন। তারপরেই রাত পোয়ালে দেখা যেত কোনো না কোনো প্রাণী মরে পড়ে আছে রাস্তায়।
প্রাণী? মানুষ নয়? জিগ্যেস করল বাসুদেব।
কত আর মানুষ খাবেন দো? গ্রাম তো উজাড় হয়ে যাবে। মানুষজন তো ভয়ে কাটা। জগা গেল, আরও দুজন আদিবাসী গেল। বেশ কয়েক বছর আগে কলকাতা থেকে নাকি একজন এসেছিলেন একটা বাড়ি কিনতে। এক রাত্তির থেকেই পালালেন প্রাণ হাতে করে। এই তো অবস্থা।
এ কি, উঠছ কোথায়?
আপনাদের চা-জলখাবারটা করে দিই।
সে হবেখন। আগে বলো আমাদের ওপর দোর রোষ কেন? কী করে বুঝলে?
বলব। আপনাদের ভালোর জন্যেই বলব। তার আগে চা-টা করে দিই।
বেশ, চায়ের জল চড়াতে চড়াতেই বলো বাঁওড়ের জলে যে জগার দেহ পাওয়া গিয়েছিল তার কারণ কী? বাঁওড়টা কোথায়? জগা মশাল হাতে দলবল নিয়ে ছুটত কোন্ দিকে? বাঁওড়ের দিকেই কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু। বাঁওড় হচ্ছে মজে যাওয়া খাল বা জলা। ওর জল পচা। আমাদের গ্রামের দক্ষিণ দিকে। বহুকালের পুরনো। ওখানেই শ্মশান, ওখানেই ভাগাড়। আবার ওখানেই যত ভয়। খুব দরকার না পড়লে ওদিকে কেউ যায় না।
কবরখানা নেই? জিগ্যেস করলাম।
হরিপদ বললে, আছে বইকি। ঐ বাঁওড়ের ধারেই। কোনো মড়া জ্বলে চিতার আগুনে। কোনো মড়া যায় মাটির নীচে। দুটোরই ব্যবস্থা পাশাপাশি। বিশেষ ভেদ নেই। বলেই হরিপদ চায়ের জল চড়িয়ে দিল।
চা-জলখাবার খাবার পর হরিপদ তার গতকাল রাত্রে অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করল।
আপনারা বোধহয় নজর করেছিলেন কাল ঘড়িতে আটটা বাজার আগেই আমি তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম।
বাধা দিয়ে বললাম, না হরিপদ, আমরা কেউই নজর করিনি। কোনোদিনই দেখি না কখন চলে গেলে। আমরা জানি তুমি আমাদের রাতের খাবার বানিয়ে দিয়েই চলে যাও। তাছাড়া তুমি একটু তাড়াতাড়ি যাবে তা তো বলাই ছিল।
হরিপদ কৃতজ্ঞ হয়ে বলল, তা তো জানি। তবু কাল হঠাৎ এভাবে কেন গেলাম সেটা আপনাদের জানানো দরকার। বলছি শুনুন।
আমি রান্না করছিলাম, এই সময়ে দেখি লোকটি বাইরের ঘরে এসে ঢুকল। আপনারা কথা বলতে লাগলেন। রান্নাঘরের দক্ষিণ দিকের জানলাটা ভোলা ছিল-রোজই থাকে। বাইরে থেকে সাপখোপ যাতে ঢুকতে না পারে তাই জাল দেওয়া। এমনিই তাকালাম। বাইরে জমাট অন্ধকার। মনে হল অন্ধকারটা যেন বড্ড বেশি চাপচাপ। কেমন ভয় করল। মনে হল যেন কোনো বিপদ ঘটবে। হঠাৎ দূরে জঙ্গলের মধ্যে একফালি চোখ-ঝলসানি আলো জ্বলে উঠল। ঠিক যেমন হয় বিদ্যুৎ চমকালে। কিন্তু বিদ্যুৎ তো চমকাবে আকাশে। এটা অনেক নীচে জঙ্গলের মধ্যে।
