এই পর্যন্ত বলে তিনু কাকা আমাকে বললেন, জান তো বাছা, সমস্ত দিনরাত্তির ১/৮ সময়কে যাম বা প্রহর বলে। এক প্রহর বা যাম হচ্ছে তিন ঘণ্টা। তিন ঘণ্টা অন্তর এক এক প্রহর বা যাম। এক-এক প্রহরে শেয়াল ডেকে যাম ঘোষণা করে। সেইজন্যে শেয়ালের একটা নাম যামঘোষক।
তিনু কাকা আবার একটু থেমে বললেন, কিন্তু সেদিন রাত্রে যে শেয়ালের ডাক শুনলাম তা একটু অন্যরকমের। যেন হাঁড়ির মধ্যে থেকে শেয়ালটা ডাকছিল। এমনি বিকট শব্দ! আমি অবাক হলাম। এ আবার কোন দেশি শেয়াল! আর শেয়াল তো কখনও একা ডাকে না?
মরুক গে! বলে আমি আবার চোখ বুজলাম।
তারপর হঠাৎই ঘুমের ঘোরে মনে হল কারও পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কেউ যেন পা ঘেঁষটে ঘেঁষটে হাঁটছে। আমি কান পেতে রইলাম। মনে হল শব্দটা আসছে নীচে থেকে। তার পরেই মনে হল বাড়ির পিছনে দেওয়াল ঘেঁষে আস্তে আস্তে হাঁটছে। এই নির্জন জায়গায় গভীর রাত্রে কে অমন করে হাঁটবে! কী চায়? ও কি চোর? এ বাড়িতে বহুদিন পর আমার অস্তিত্ব দেখে এখানে চুরি করতে এসেছে?
আমি কান পেতে রইলাম। শব্দটা আস্তে আস্তে কোথায় যেন চলে গেল।
যাক, যে এসেছিল সে চলে গেছে। কিন্তু কেনই বা এত রাত্রে এসেছিল, কেনই বা। দরজা খোলবার চেষ্টা মাত্র না করে চলে গেল?
তার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সমস্ত ঘরে চুরুটের গন্ধ। আমি চমকে উঠলাম। এত রাত্রে কে এসে চুরুট খাচ্ছে! আর যে খাচ্ছে সে যে খুব কাছেই আছে বুঝতে অসুবিধে হল না। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ঘরের মধ্যেই কেমন একটা চাপা শব্দ!
এইবার আমি খুব সাহসের কাজ করে ফেললাম। কী করে করতে পারলাম তা ভাবতে গেলে আজও অবাক হয়ে যাই। আমি মশারি থেকে বেরিয়ে মোমবাতিটা জ্বালোম। অন্ধকার ঘরে হঠাৎ মড়ার হাসির মতো মোমবাতিটা যেন ঘোলাটে হাসি হেসে উঠল। দেখলাম জানলার গরাদ দিয়ে একটা বিকট হাত দেওয়াল দিয়ে উঠে আসছে….মুখটা দেখে চমকে উঠলাম। ছোটোবেলায় দেখা ট্রেনের সেই খুনি সাহেবটা না…..তখনই নীচে থেকে ভেসে এল চাপা গর্জন। না কোনো ভুল নেই….
আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। তারপর….
তারপর আর কিছু মনে নেই।
.
এই হল তিনু ঘোষের বৃত্তান্ত। ঘটনাটা বলে উনি হাঁপাতে লাগলেন। বয়েস হয়েছে
বললাম, কাকাবাবু, তারপর বাড়িটা কী করলেন?
কলকাতায় ফিরে এসেই লিখে দিলাম, নানা কারণে এখনই বাড়িটা কেনা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
তারপরেও আমি অনেকক্ষণ তিনু কাকার সামনে চুপ করে বসে ছিলাম দেখে তিনু কাকা বললেন, কী ভাবছ?
আমি চুপ করে রইলাম। উনি হেসে বললেন, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না তো? এক কাজ করো, ঠিকানা দিচ্ছি। ওখানে একদিন চলে যাও। বাড়িটা যদি এখনও থাকে কিছু দেখতে পাবেই। তবে হয়তো গেলেই পাবে না। ওঁদের দেখা সহজে মেলে না। কয়েক দিন থাকতে হবে।
বললাম, যাব বলছেন?
হ্যাঁ, তোমরা আজকালকার ছেলে। নিজের চোখে না দেখলে অনেক কিছুই বিশ্বাস করতে পার না। কাজেই অবশ্য অবশ্য যাবে। তবে একা নয়। আর গোঁয়ার্তুমি করবে না।
বলেই ঘোষমশাই এক টিপ নস্যি নিলেন।
.
‘দেবতার রোষ’
ঠিক হয়েছিল সেদিনই দুপুরে দু’মুঠো ভাত খেয়েই দুজনে বগলা মজুমদারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। দেরি করা চলবে না। কারণ গত রাত্রে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটে গেল আর আজ সকালে বাড়ির পিছনের ঝোপ থেকে যে মড়া বাদুড়গুলো পাওয়া গেল তা রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। সত্যিই ভাবনার কারণ। কেননা বেশ কিছুকাল আগে বেলেঘাটার তিনু ঘোষ যা বলেছিলেন তা বিনা প্রতিবাদে শুনে গেলেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি। আর আমার মুখ থেকে সব শুনে বাসুদেবও প্রায় হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর এখানে হঠাৎ বগলাবাবুর আবির্ভাব। তিনি তো প্রায় হুবহু তিনু ঘোষের কথাই শুনিয়ে গেলেন। সেই সঙ্গে শোনালেন মাঝে মাঝে সন্ধের পর কোনো হিংস্র জন্তুর অদ্ভুত ডাকের কথা। আর সেই ভয়েই এককালের প্রবল প্রতাপ জমিদারবংশের উত্তরাধিকারীটি আটটা বাজতেই ভয় পেয়ে বাড়ির পথে দৌড়লেন। এই অদ্ভুত ডাকটি কীরকম বা জগা মণ্ডল যে শব্দ শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খামারবাড়িতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিল সেই শব্দটা কীরকম সে কথা বগলাবাবুকে জিগ্যেস করবার সেদিন আর সুযোগ পাওয়া যায়নি।
এসব অলৌকিক অবাস্তব ব্যাপার-স্যাপার আমরা মন-প্রাণ দিয়ে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু গত রাত থেকে ভাবনায় পড়তে হয়েছে। এ ভাবনার সুরাহা করতে পারেন একমাত্র ঐ প্রৌঢ় বগলা মজুমদারই। তাই আবার তেমন ঘটনা ঘটার আগেই বগলাবাবুর পরামর্শ নেওয়া উচিত। কাজেই উনি কবে আসবেন না আসবেন তার জন্য অপেক্ষা না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজেদেরই যাওয়া উচিত।
মনের সঙ্গে এইরকম বোঝাপড়া করে আমরা যখন বনঝোপ থেকে বাড়ি এলাম বেলা তা বে আটটা।
বাড়ি ঢুকেই দেখা গেল হরিপদ ঠাকুর রান্নাঘরের বাইরে গামছা কাঁধে রকে বসে আছে গুম হয়ে। এমনটা সে করে না। এসেই চা জলখাবার করতে লেগে পড়ে। তাই অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম–কী ব্যাপার, হরিপদ? সক্কালবেলায় অমন হাঁড়িমুখ কেন?
হরিপদ দুহাতে মুখ ঢেকে বলল, আর আমার এখানে কাজ করা হবে না, বাবু।
কেন?
হরিপদ প্রায় ডুকরে কেঁদে বলল, আপনাদের ওপর ‘দেবতার রোষ’।
দোর রোষ! কোন দেবতা?
হরিপদ দু’হাত তুলে ওপর দিকে তাকিয়ে বলল, তিনি হাওয়ায় ভেসে বেড়ান। শুনতে
