কোন্টা? ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন মন্মথ কুণ্ডু।
বললাম, ঐ যে ভাঙা পাথরের ফলক? মনে হচ্ছে, এখানে এক সময় খ্রিস্টানদের বেরিয়াল গ্রাউন্ড-ট্রাউন্ড কিছু ছিল।
তিনি গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, তা হতে পারে। পুরনো জায়গা তো! নিন, নীচে চলুন।
বুঝলাম, বড্ড তাড়া!
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনের ভাব বোধহয় তিনি বুঝে নিতে পেরেছিলেন। একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনাকে আবার কলকাতায় ফিরতে হবে তো। সেইজন্যেই তাড়া দিচ্ছি। নইলে আমার কী? থাকুন না। যে সম্পত্তি কিনবেন সেটা ভালো করে দেখে শুনে নিন।
কথাটা লুফে নিয়ে তৎক্ষণাৎ বললাম, সেই ভালো। এখনই তো বেলা পড়ে এসেছে। রাতটা থেকেই যাই।
সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোকের মুখটা এমন কালো হয়ে গেল যে আমার বুঝতে বাকি রইল না, আমার রাত্রিবাস করাটা উনি চাইছেন না। কিন্তু কেন?
আমতা আমতা করে উনি বললেন, আপনি থাকলে সে তো আমার অনেক সৌভাগ্য। কিন্তু মুশকিল হয়েছে আমার বাড়িতে আজ আত্মীয় স্বজন এসে পড়ছে। ছোটো বাড়ি তো
বললাম, ওর জন্যে ভাববেন না, আমি এই বাড়িতেই থাকব।
এই বাড়িতে!
বললাম, হ্যাঁ। দোতলার ঘরগুলো তো দেখলাম ভালো অবস্থাতেই আছে।
উনি বললেন, তবু–অনেকদিন এ বাড়িতে কেউ শোয়নি। একটু ঝটপাট দেওয়া ধোওয়া-মোছা!
বললাম, এক রাত্তিরের তত মামলা। একটা মাদুর, একটা বালিশ, সম্ভব হলে একটা মশারি আর এক ঘটি জলের যদি ব্যবস্থা করে দিতে পারেন তাহলেই যথেষ্ট হবে।
দেখি। বলে আমাকে এ বাড়িতে একা বসিয়ে রেখেই উনি যেন চিন্তিতভাবে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
উনি তো চলে গেলেন। আমি একা চুপচাপ বসে রইলাম বাড়ির নীচে একটা ভাঙা বেদির ওপর। সত্যি কথা বলতে কি এই সময়টা আমার বেশ ভয় ভয় করছিল। বুঝলে, বিকাশ বাবা।
জিগ্যেস করলাম, কীসের ভয়?
তা ঠিক বোঝাতে পারব না। খোলামেলা জায়গার মধ্যে একটা শূন্য বাড়ি। যে বাড়িতে বহুদিন কেউ বাস করেনি। কেন করেনি কে জানে! ওদিকে মাঠের প্রান্তে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পাখিগুলো বাসায় ফিরছে। ফিরছে যেন খুব তাড়াতাড়ি। বোধহয় এখনি অন্ধকার নেমে আসবে বলে। আজ এই মুহূর্তে প্রথম বুঝলাম অন্ধকারকে শুধু মানুষই নয়, ঐ উড়ন্ত পাখিগুলোও ভয় পায়। তাই তারা অন্ধকার নামার আগেই নিরাপদ আস্তানায় পৌঁছতে চায়। অন্ধকার নামবার আগে এই নির্জন অজানা জায়গা ছেড়ে আমারও কলকাতায় ফিরে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কেন যে দুঃসাহস দেখিয়ে বসলাম কে জানে!
জিগ্যেস করলাম, আর কোনো কারণে আপনার ভয় হচ্ছিল?
তিনু ঘোষ আর একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আরও দুটো কারণে। প্রথম বেরিয়াল গ্রাউন্ডের পোঁতা ভাঙা সেই পাথরের ফলকটা আর দোতলার ছোটো ঘরটায় যে পচা গন্ধ পেয়েছিলাম সেটা। মরা কোনো কিছু এমনকি বেড়াল বা ইঁদুর বা টিকটিকি পর্যন্ত ছিল না। তাহলে কীসের ঐ উৎকট গন্ধ? জানো ভায়া, বাড়ির মালিক পর্যন্ত কোনো কথা বললেন না। এই প্রশ্ন দুটোই তখন মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল। মনে হচ্ছিল আজ রাত্রে এই বাড়িতে কিছু ঘটবেই–আর তা মোটেই শুভ নয়। অথচ কিছুতেই গিয়ে বাড়ির মালিককে বলতে পারলাম না–আমি থাকব না। বধৰ্মান যাবার লাস্ট বাস এখনও পাওয়া যাবে। কোনোরকমে বর্ধমান যেতে পারলে হাওড়া যাবার ট্রেনের অভাব হবে না।
অগত্যা থাকতে হবেই বলে মনকে প্রস্তুত করে নিলাম।
তার পরের ঘটনা তিনু ঘোষ যা বলেছিলেন তা এইরকম–
সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতেই মন্মথ কুণ্ডু আর তার বাড়ির কাজের লোকটি এসে মাদুর, বালিশ, মশারি, দড়ি, একটা কুঁজো-ভর্তি জল আর একটা গেলাস রেখে দিয়ে গেল। ওরা যখন চলে যাচ্ছিল তখন বাধ্য হয়ে আমাকে বলতে হল, একটু আলোর ব্যবস্থা তাহলে
বিলক্ষণ! এই যে তারও ব্যবস্থা করেছি। বলে মন্মথবাবু একটি মাত্র সরু মোমবাতি ব্যাগ থেকে বের করে রাখলেন।
দেশলাই আছে তো?
মাথা নেড়ে না জানাতে উনি যে কীরকম অপ্রসন্ন হলেন তা ওঁর গলার স্বরেই বুঝলাম। বললেন, সঙ্গে একটা দেশলাইও রাখেন না? কতই বা দাম! বলে পকেট থেকে নিজের দেশলাইটা বের করে আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন।
হায়রে আমার কপাল! বুঝলে ভায়া, লোকের পকেটে পকেটে দেশলাই না থাকলে মনে করে নিতে হবে পয়সার অভাবেই দেশলাই রাখেনি। এই নইলে বাড়ির মালিক!
যাক গে, এবার আসল কথায় আসি। সরু অল্পপ্রাণ মোমবাতিটা জ্বেলে প্রথমে মাদুর আর চাদর বিছিয়ে বিছানা পেতে নিলাম। তারপর মশারিটা কোনোরকমে টাঙালাম। তারপর একটা তোবড়ানো টিনের গামলায় যে খাবার আনা হয়েছিল তা খেয়ে নিলাম। এত তাড়াতাড়ি খাওয়া আমার অভ্যেস নয় কিন্তু বসে বসে মশার কামড় খেয়ে লাভ নেই। তাই ডান হাতের ব্যাপারটা সেরে নিয়ে দরজায় ভালো করে খিল এঁটে মশারির ভেতর ঢুকে পড়লাম।
ভাগ্যি বুদ্ধি করে টর্চটা এনেছিলাম। ওটা রাখলাম বালিশের পাশে যাতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।
শুয়ে শুয়ে ঘুম আসছিল না। মোমবাতিটা অর্ধেক জ্বলার পর নিভিয়ে রেখেছিলাম যদি গভীর রাতে দরকার হয়।
নানারকম চিন্তা করতে করতে কখন একসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, হঠাৎ দূরে শেয়ালের ডাক শুনে ঘুমটা ছুটে গেল। শহরে এখন শেয়াল দেখা যায় না, কতকাল শহরের লোক যে শেয়ালের ডাক শোনেনি তা ঠিক নেই। তবে আমি ছোটোবেলায় শুনেছি। এমন কিছু ভয়ঙ্কর ডাক নয়। আর শেয়াল একটা ডেকে উঠলেই একপাল শেয়াল একসঙ্গে ডাকা শুরু করে দেয়। কিছুক্ষণ ডেকেই থেমে যায়। তারপর আবার তিন ঘণ্টা পরে পরে ডাকে।
