এদিকে রক্ত দেখে খুন চেপে গেল পাবলিকের। একজন নিরস্ত্র নির্দোষ মানুষকে চোখের সামনে গুলি করল একটা হিংস্র সাহেব! লোকে লাঠি, ডান্ডা যা হাতের কাছে পেল তাই নিয়ে তাড়া করল সাহেব আর তার সঙ্গী নিগ্রোটাকে। কুকরটা ইটের ঘায়ে আগেই মরেছে। সাহেব আর নিগ্রো ছুটছে তো ছুটছেই। পিছনে উন্মত্ত জনতা। সাহেব জানে না কোথায় যাচ্ছে। গলিখুঁজি, পুকুরপাড় দিয়ে সে ক্রমশ স্টেশন থেকে দূরে শহরের বাইরে এসে পড়ল। নিগ্রোটাও…
এই পর্যন্ত বলে তিনু ঘোষ থেমে গিয়েছিলেন।
তারপর? জিগ্যেস করেছিলাম।
তিনু ঘোষ বলেছিলেন, এই পর্যন্তই জানি। ঘটনার সময় আমি স্টেশনেই ছিলাম। ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। নিতান্তই অল্পবয়সি ছেলে তখন। মারামারি খুনোখুনি দেখে হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল।
বললাম, কিন্তু আপনি যে বললেন, সত্যি করে ভূত দেখেছিলেন একবারই। তাও অনেক পরে। অর্থাৎ আপনার জীবনের পরের দিকে।
তিনু ঘোষ একটু চুপ করে থেকে বললেন, হ্যাঁ, তা বটে। আচ্ছা বলছি।
তিনু ঘোষ ফতুয়ার পকেট থেকে মোষের শিল্পে ডিবে বের করে তা থেকে এক টিপ নস্যি নিয়ে নাকে খুঁজলেন। তারপর রুমাল দিয়ে সাধের গোঁফ জোড়াটা মুছে নিলেন। কী বলছিলাম যেন–হ্যাঁ, জমিজমা আমার প্রাণ। সারা জীবন এইসব জমি রক্ষা করার জন্য আমরা মামলা করেছি। বাড়িঘরও করেছি। আমার জন্ম, ক্রিয়াকলাপ সব বর্ধমান জেলায়। ইদানিং ইচ্ছে করত বেলেঘাটায় যেমন, বাড়িঘর আছে থাক। গ্রামের দিকে ফাঁকা জায়গায়। একটা সাদামাটা বাড়ি কিনব। যেখানে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচব। নিশ্চিন্তে ভগবানের নাম করতে পারব।
গ্রামে বাড়ি কেনার সঙ্গে সঙ্গে একটা গাড়ি কেনারও স্বপ্ন দেখলাম। গাড়ি থাকলে যখন তখন হুস্ করে গ্রামে যাওয়া যাবে।
কিন্তু এই বয়সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাড়ি খোঁজা, দরদাম করা পোষাবে না। তাই ইচ্ছেটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। তারপর হঠাৎ সেদিন কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম বর্ধমান থেকে অল্প দূরে কুচুট নামে একটা গ্রামে ফাঁকা জায়গার ওপর একটা দোতলা বাড়ি বিক্রি হবে।
কী নাম বললেন জায়গাটার? কুচুট?
হ্যাঁ। শুনতে খারাপ লাগছে তো ভায়া? কিন্তু খুব প্রাচীন গ্রাম। পুরনো মন্দির-টন্দির আছে। বর্ধমান থেকে কালনা পর্যন্ত যে বাসরাস্তাটা গেছে তারই ধারে গ্রামটা। আমি তখনই ঠিক করে ফেললাম যদি পছন্দ হয় আর দামে পোষায় তাহলে কিনে ফেলব।
তারপরই চাপা গলায় তিনু ঘোষ বললেন, আরও একটু ভেবে রেখেছিলাম কিনে ফেলতে পারলে লোকসান নেই। ভালো না লাগলে এক বছর দু’বছর পর বেশি দামে বেচে দেব। দিন দিন জায়গার দাম, বাড়ির দাম তো বেড়েই চলেছে। আখেরে আমারই লাভ।
আমি চুপ করে রইলাম। জমির দাম বাড়লে কার কতটা লাভ তা জানবার আগ্রহ মোটেই আমার ছিল না। আমি তো অন্য জিনিস জানতে এসেছি।
তারপর?
তিনু ঘোষ বললেন, বাড়িটা দেখলাম। দোতলা বাড়ি অনেকটা জায়গার ওপর। তবু রক্ষে বাড়িটা পুরনো হলেও ততটা জীর্ণ নয়। ছাদের পাঁচিলে ছোট ছোট গুল্ম লতা জন্মালেও অশথ বা বট গাছের শেকড় দেওয়াল ফুঁড়ে বের হয়নি। নীচে তিনটে ঘর। সবগুলোই অন্ধকার। দুটো ঘরের দরজায় তালা লাগানো। একটার দুটো কড়ায় দড়ি বাঁধা। তালাগুলো যে অনেকদিন খোলা হয়নি তা মরচে পড়া দেখলেই অনুমান করা যায়। একটা ঘরের পিছনে একটা ছোটোখাটো সিমেন্টের পাঁচিল তোলা, অনেকটা যুদ্ধের সময় বাফার ওয়ালের মতো।
এটা কী? বাড়ির মালিককে জিগ্যেস করলাম।
বললেন, ঠিকই ধরেছেন। বাফার ওয়াল করা হয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে যাতে জাপানিরা বোমা ফেললে বোমার টুকরোয় ঘরের কোনো ক্ষতি না হয়।
জিগ্যেস করলাম, তা হঠাৎ এই বাড়িটার গায়ে বাফার ওয়াল কেন? তাছাড়াও তো দেখছি ট্রেঞ্চ কাটার মতো এখনও লম্বা গর্ত কাটা আছে।
বাড়িওলা বললে, হা, ওটা ট্রেঞ্চই। আসলে সে সময়ে কলকাতা এবং চারপাশে বম্বিং এর ভয় থাকায় অনেক জায়গায় মিলিটারি রাখা হত। মিত্রপক্ষের মধ্যে আমেরিকান সোলজাররাই বেশি এসব জায়গায় থাকত। এ বাড়িটা ছিল ওদের? এ অঞ্চলের এক নম্বর শেলটার।
ও! তাহলে এ বাড়িতে সৈন্যরাও ছিল।
আজ্ঞে হ্যাঁ। চলুন এবারে দোতলাটা দেখবেন।
দোতলায় আলো বাতাস বেশ ভালোই। ওপরেও নিখানি ঘর। বাড়ির মালিক ঘরগুলো খুলে খুলে দেখালেন। পশ্চিম দিকের ঘরটা অপেক্ষাকৃত ছোটো। ভেতরে ঢুকতেই একটা ভ্যাপসা পচা গন্ধ নাকে এল। বাড়ির মালিক মন্মথবাবু একটি কথাও না বলে তাড়াতাড়ি জানলাগুলো খুলে দিলেন।
নাকে রুমাল চেপে বললাম, কিছু পচেছে। মন্মথবাবু সে কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, হতে পারে।
কিন্তু কী পচতে পারে, কেন পচতে পারে সে বিষয়ে কোনো কথাই বললেন না।
আমি পিছনের জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এ দিকটাও ফাঁকা। জিগ্যেস করে জানলাম এখান থেকে আধ মাইলটাক দূরে একটা বাঁওড় আছে। বাঁওড় কাকে বলে জিগ্যেস করলে বললেন, ও নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বাড়িটা কিনবেন কিনা বলুন।
বাবাঃ খুব ঘ্যাম!
সামান্য একটি কথার মানে জানতে চাওয়ায় এত বিরক্তি কেন বুঝলাম না! শুধু এইটুকু বুঝলাম কোনোরকমে বাড়িটা বেচে দিয়ে কিছু টাকা হাতাবার জন্যেই উনি ব্যস্ত।
আমি তবু জানলায় দাঁড়িয়ে রইলাম। বাড়িটার লাগোয়া যে বিরাট জমি সেটা তার দিয়ে ঘেরা। তারের বেড়ার শেষে পাথরের একটা ভাঙা ফলক দেখে জিগ্যেস করলাম, ওটা কী?
