এছাড়া সাহেবদের সঙ্গে অন্তত একজন ‘অ্যাটেনডেন্ট’ বা সাহায্যকারী থাকত ফাইফরমাশ খাটার জন্যে। তারা তো আর সাহেবের সঙ্গে ফার্স্ট ক্লাসে বা সেকেন্ড ক্লাসে যেতে পারে না। তাই ওদের জন্যে ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাসের লাগোয়া একটা সাধারণ কামরা থাকত। সেটা শুধু সাহেবদের সার্ভেন্টদের জন্যে। সেখানেও অন্য প্যাসেঞ্জাররা ঢুকতে পারত না।
তখন গার্ডও ছিল ফর্সা চামড়ার। ড্রাইভারদের মধ্যেও অনেক অ্যাংলোকে দেখা যেত। তারা ইংরিজিতেই কথা বলত। কখনও কখনও হিন্দিতে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেত কিন্তু বাংলা বলতে পারত না।
এই ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাসের মুষ্টিমেয় প্যাসেঞ্জারদের অহংকারের সীমা ছিল না। তারা বাঙালিদের সহ্য করতে পারত না। একবার এক নিতান্তই মধ্যবিত্ত বাঙালি তাড়াতাড়িতে ভুল করে ফার্স্ট ক্লাসে উঠতে যাচ্ছিল, ফার্স্ট ক্লাসের সাহেব প্যাসেঞ্জারটি তাকে লাথি মেরে নামিয়ে দিয়েছিল।
লাথি হজম করে মাথা নিচু করে বাঙালিটি অন্য গাড়িতে গিয়ে উঠেছিল। তখন সাহেবের বিরুদ্ধে নালিশ করার কোনো উপায় ছিল না। কে শুনবে নালিশ? ড্রাইভার, গার্ড, স্টেশন মাস্টার প্রায় সবাই তো ফর্সা চামড়ার সাহেব।
এইরকম সময়েই ঘটনাটা ঘটেছিল।
গাড়িতে সে সময়ে কুকুর বা হিংস্র কোনো পশু নিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। অনেক লেখালেখি করে বিশেষ অনুমতি নিতে হত। যে সাহেবের কথা বলা হচ্ছে সে ওসব অনুমতি-টনুমতির ধার ধারত না। চিতাবাঘের মতো বিরাট কালো ছুঁচলে মুখ কুকুরটা তার নিত্যসঙ্গী। তার ঐ কুকুরটাকে দূর থেকে দেখলেই লোকে পালাত।
দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা প্রথমে ঘটল আসানসোল স্টেশনে।
একজন মাড়োয়ারী সাহেবের কামরায় ঢুকতেই সাহেব তেড়ে গিয়েছিল।
-Get out!
মাড়োয়ারী ভয়ে কথা বলতে পারেনি। তবে টিকিটটা দেখিয়ে বলেছিল, Sir, here is my first class ticket. তাতে সাহেবের মাথা আরও গরম হয়ে গেল। শিস দিয়ে তার কুকুরটাকে লেলিয়ে দিল। কুকুরটা মূর্তিমান বিভীষিকার মতো গোঁ গোঁ শব্দ করে তেড়ে গেল। নির্দোষ প্যাসেঞ্জারটি ভয়ে চিৎকার করতে করতে নেমে গেল।
এবারে ঘটনা ঘটল বর্ধমানে। যে বাঙালি ভদ্রলোক ভুল করে সাহেবের কামরায় উঠেছিলেন, তাঁকে দেখেই সাহেব তার নিত্যসঙ্গী জ্বলন্ত চুরুটটা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে দাঁত কড়মড় করে হাঁকড়ে উঠেছিল, ‘You bloody get out! This is first class.’
এই বাঙালি ভদ্রলোকটি ইংরিজিতেই উত্তর দিলেন, সাহেব আমি জানি এটা ফার্স্ট ক্লাস। ভুল করে উঠেছিলাম। এখনি নেমে যাচ্ছি। তবে আবার আসব।
বলেই প্ল্যাটফর্মে নেমে গেলেন। একজন চেকারকে ডেকে তার সেকেন্ড ক্লাসের টিকিটটা বদলে ফার্স্ট ক্লাসের করে নিলেন। তারপর সদর্পে ঢুকলেন সাহেবেরই ফার্স্ট ক্লাস কামরায়। দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল সাহেব। হ্যাঁন্ডেল ঘুরিয়ে জোরে লাথি মেরে দরজাটা খুলে ফেললেন বাঙালি ভদ্রলোকটি।
সাহেব গদিতে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে চুরুট টানছিল। বাঙালিবাবুকে ফের ঢুকতে দেখে আবার তেড়ে এল, Get out-Get out! I say get out!
বাঙালি ভদ্রলোক নেমে তো গেলেনই না। ফার্স্ট ক্লাস টিকিটটা বের করে সাহেবের নাকের ডগায় ধরলেন
সাহেব বলল, শোনো বাবু, ভালো কথায় বলছি অন্য গাড়িতে যাও। আরও ফার্স্ট ক্লাস কামরা আছে।
বাঙালিবাবু বললেন, কেন যাব? এ কামরা কি তোমার রিজার্ভ করা?
কোনো কালা আদমি মুখের ওপর কথা বলে সাহেবরা তা সহ্য করতে পারত না। মুখ লাল করে বলল, হ্যাঁ, রিজার্ভ করা। তুমি যাও।
এও এক নাছোড়বান্দা বাঙালি। সাহেব-টাহেব কেয়ার করে না। বললেন, দেখি তোমার টিকিটে কেমন রিজার্ভেশন আছে।
সাহেব আর সহ্য করতে পারল না। বাঙালিবাবুকে লক্ষ করে ঘুষি মারতে লাগল। বাবুটির ব্যায়াম করা শরীর। খপ করে সাহেবের হাতটা ধরে ফেললেন। তারপর দাঁতে দাঁত টিপে বললেন, সাহেব, বিনা দোষে আমার গায়ে হাত তুলে ভালো করলে না। আমি দুর্বল নই।
সাহেব এবার বাবুটির নাক লক্ষ করে ঘুষি মারতে গেল। বাবুটি মাথা সরিয়ে নিয়ে জুজুৎসুর কায়দায় সাহেবের ঘাড়ে এমন রদ্দা মারলেন যে সাহেবের ঘাড় বেঁকে গেল। সাহেব আর্তনাদ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভুভক্ত কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঙালিবাবুর দিকে। বাবু চট করে সরে গিয়ে কুকুরটার পেটে পেল্লায় একটা লাথি মারলেন। খোলা দরজা দিয়ে কুকুরটা ছিটকে পড়ল প্ল্যাটফর্মে। সঙ্গে সঙ্গে সাহেব পকেট থেকে রিভলবার বের করল।
বিপদ বুঝে নিরস্ত্র বাঙালিবাবুটি স্টেশনে লাফিয়ে পড়লেন। বাঁকা ঘাড়ের যন্ত্রণায় গোঁ গোঁ করতে করতে সাহেবও রিভলবার হাতে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ে তাড়া করে গেল।
প্ল্যাটফর্মে হৈচৈ চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। গোলমাল শুনে পাশের ছোটো কম্পার্টমেন্ট থেকে সাহেবের অ্যাটেনডেন্টটি ভোজালি হাতে বেরিয়ে এল। লোকটা নিগ্রো। বেঁটেখাটো কুচকুচে কালো রঙ। মাথায় ছোটো ছোটো কেঁকড়ানো ঘন চুল। কুকুতে দুটো চোখ। যেন সাক্ষাৎ যমদূত। সেও বাঙালিবাবুটিকে তাড়া করল।
সাহেব গার্ড বুদ্ধিমান। সে ক্ষ্যাপা সাহেবকে চিনত। বিপদ বুঝে চেঁচিয়ে উঠল, মিস্টার জন, ডোন্ট ফায়ার!
কিন্তু কে কার কথা শোনে। জন যন্ত্রণায় ঘাড়টা বেঁকিয়ে গুলি ছুড়ল বাঙালিবাবুকে লক্ষ করে। এবার আর বাবুটি নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না। গুলিটি পাঁজর ঘেঁষে হাতের খানিকটা মাংস খাবলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রক্তাক্ত দেহে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন বাবুটি।
