বাসু!
দূর থেকে সাড়া পেলাম, এই যে এখানে। চলে এসো।
যাক, বাসুর তাহলে কিছু হয়নি। ইট বের করা সরু পথ ধরে ওদিকের ঝোপের দিকে গেলাম। দেখি বাসুদেব মাটির ওপর ঝুঁকে পড়ে খুব মন দিয়ে কিছু পরীক্ষা করছে।
এখানে কী করছ?
কাল রাত্তিরে যিনি এখানে পায়চারি করেছিলেন তিনি কোনো চিহ্ন রেখে গেছেন কিনা দেখছি।
তাই বলে এই সক্কালবেলায়?
দেরি করলে তো চিহ্ন হারিয়ে যেতে পারে।
কিছু পেলে?
বাসুদেব মাথা নেড়ে বলল, নাঃ।
অথচ কেউ এসেছিলই, অনেকক্ষণ ছিলও। আর তার শ্রীচরণে কোনো ‘শু’ ছিল না।
তাই তো ভাবছি। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছি যিনি এসেছিলেন তার নিশ্চয় কোনো পা ছিল না। অথচ
অথচ কী?
হাত ছিল। আর সেই হাত দিয়ে কয়েকটি প্রাণীর জীবন সংহার করেছিলেন।
চমকে উঠলাম। মানে?
ঐ ঝোপের মধ্যে দেখো।
দেখলাম। কতগুলো গলা-ছেঁড়া বাদুড় পড়ে আছে।
আরে সর্বনাশ! তাহলে রাতের আগন্তুকটি তো রীতিমতো হিংস্র জন্তু।
বাসুদেব গম্ভীরভাবে বলল, জন্তু কিনা বলতে পারি না। তবে আগন্তুকটি হিংস্র।
বললাম, তাহলে তো বগলা মজুমদারের আরও একটা কথা সত্য বলে মনে হচ্ছে।
বাসুদেব বলল, তুমি কি জগা মোড়লের কথা ভেবে বলছ?
হ্যাঁ। বাড়ির কাছে পাঁচ মিনিটের পথ খামারবাড়ি। রাত আটটার সময়ে কোনো শব্দ শুনে দেখতে গেল। আর ফিরল না। পরের দিন তার ক্ষতবিক্ষত দেহ পাওয়া গেল বাঁওড়ের জলে। বগলা যদি গুল মেরে না থাকেন তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কে মারল তাকে?
বাসুদেব শান্ত গলায় বলল, বগলা মজুমদার সম্বন্ধে আমাদের আগে যাই ধারণা থাক, এখন দেখা যাচ্ছে তিনি বাজে কথা বলেননি। কিন্তু আমি অন্য কথা ভাবছি।
কী?
ধরেই নিলাম বগলা যা বলেছিল, ব্যাপারটা তাই-ই। প্রশ্ন এই, যে শব্দটা শুনে জগা মোড়ল রাত্তির বেলাতেই খামারবাড়ি ছুটেছিল সে শব্দটা কেমন? নিশ্চয়ই পা ঘষটানোর শব্দ নয়। তার চেয়ে জোরে কোনো শব্দ যা বাড়ি থেকে শোনা গিয়েছিল।
বললাম, তা তো বটেই।
শব্দটা কীসের? সে কথাটাই আমায় ভাবিয়ে তুলেছে।
বললাম, অত ভাবাভাবিতে কাজ কী? বগলাবাবু তো আবার আসবেন বলে গেছেন।
বাসুদেব হতাশার হাসি হেসে বলল, তুমি কি সেই আশায় বসে থাকবে?
বললাম, আসবেন না কেন?
আসবেন না এমন কথা বলছি না। তবে অতখানি পথ হেঁটে, বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কেন বারবার আসবেন বলো তো?
বললাম, তা বটে। তাহলে?
ওঁর কাছেই আমাদের যেতে হবে।
কিন্তু–ঠিকানা?
বাসুদেব একটু হাসল। বলল, জানই তো মজুমদার মশাইরা এককালের ডাকসাইটে জমিদার পরিবার। আর এই জায়গাটা মুঠোর মধ্যে ধরা যায়। কাজেই তার ঠিকানা খুঁজতে খুব অসুবিধে হবে না।
.
তিনু ঘোষের কথা
বেলেঘাটার তিনু ঘোষ যদিও একজন মামলাবাজ লোক তবু তাকে আমার ভালো লাগত। আমার দাদামশায় নামজাদা উকিল ছিলেন। তিনু ঘোষ ছিলেন আমার দাদুর বাঁধা মক্কেল। বিরাট সম্পত্তি তাঁর। শরিকও অনেক। ফলে মামলা-মোকদ্দমা লেগেই থাকত। তবে ঘোষ মশাই-এর অঢেল টাকা। মোটা ফি দিয়ে দাদুকে কেস দিতে তার অসুবিধে ছিল না।
তিনু ঘোষ রোগা হলে কি হবে যেটা সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করত সেটা তার বিরাট একজোড়া গোঁফ। কোনো মানুষের অতবড় গোঁফ থাকে তা ভাবতে পারতাম না। তিনি চিরুনি দিয়ে গোঁফ আঁচড়াতেন দিনে চার-পাঁচ বার। তাই আলাদা একটা চিরুনি ঘুরত পকেটে পকেটে। মোমও দিতেন। তিনি জোরে হাসতেন না। হাসতেন নিঃশব্দে। হাসলে তার চোখ দুটো কুঁচকে যেত।
তিনু ঘোষ দাদুর চেম্বারে এসেছেন জানতে পারলেই আমি দোতলা থেকে নেমে আসতাম। আমায় দেখলেই তিনি চোখ ছোটো করে গোঁফের ফাঁকে হাসতেন। আমার লক্ষ ছিল তার পাকানো গোঁফ জোড়াটার দিকে। একবার হাত দিতে চাইতাম। উনি মুখটা বাড়িয়ে দিতেন। আমি ঠিক গুনে দুবার তার গোঁফে হাত বোলাতাম।
দাদু বলতেন, তিনু ঘোষ নাকি অনেক ভূতের গল্প জানেন। কয়েকবার নিজেই ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন।
এ খবর জানার পরই একদিন তাকে চেপে ধরলাম, একটা সত্যি ভূতের গল্প বলতেই হবে।
উনি হেসেছিলেন। বলেছিলেন, সত্যি ভূতের গল্প কীরকম?
বলেছিলাম, মানে আপনি নিজের চোখে যা দেখেছেন সেই রকম।
অ, আচ্ছা। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে নিয়েছিলেন। তারপর শুরু করেছিলেন তাঁর নিজের চোখে দেখা সত্যিকারের ভূতের গল্প।
বলেছিলেন, ভূত অনেকবার দেখেছি। মোকাবিলাও করেছি। কিন্তু এখন যার কথা বলব তাকে ভূত হিসাবে দেখেছি একটি বারই। তাও অনেক পরে। প্রথম তাকে দেখেছিলাম মানুষ হিসাবেই।
অবাক হয়েছিলাম। একই মানুষ আবার পরে সেই মানুষকেই ভূত হিসাবে দেখা। এমন তো বড় একটা ঘটে না।
নড়েচড়ে বসে বলেছিলাম, কাকু, বেশ জাঁকিয়ে ঘটনাটা বলুন না।
এরপর তিনি যা বললেন, তা এইরকম–
তখন ইংরেজ আমল। ইংরেজদের দাপট খুব। তারা আবার নেটিভদের অর্থাৎ কালা আদমি ভারতীয়দের সহ্য করতে পারত না। এক সাহেব ট্রেনে করে মুঙ্গের থেকে কলকাতা আসছিল। সঙ্গে একটা বিরাট কুকুর গ্ৰেহাউন্ড গোছের। সাহেব আর ওর কুকুর দুজনেরই চোখে হিংস্র দৃষ্টি।
সে সময়ে ট্রেনে চারটে ক্লাস ছিল। ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, ইন্টার ক্লাস, আর থার্ড ক্লাস।
ফার্স্ট ক্লাসে যেত সাহেবসুবোরা, সেকেন্ড ক্লাসের যাত্রী ছিল মোটামুটি বড় অফিসাররা, ইন্টার ক্লাসে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা। রুগি নিয়ে যাবার দরকার হলে এই ইন্টার ক্লাসটাই সুবিধের ছিল। আর থার্ড ক্লাস ছিল সাধারণ প্যাসেঞ্জারদের জন্য। ইন্টার ক্লাসের ভাড়া থার্ড ক্লাসের দেড়গুণ। তাই ইন্টার ক্লাসকে চলতি ভাষায় বলা ‘দেড়া গাড়ি। সেকেন্ড ক্লাসের ভাড়া ছিল থার্ড ক্লাসের ডবল, ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া থার্ড ক্লাসের চারগুণ। তখন ট্রেনে এত ভিড় হত না। এখনকার মতো তখন থার্ড ক্লাসে ফ্যান ছিল না। ফ্যান থাকত শুধু ফার্স্ট আর সেকেন্ড ক্লাসে। আপাদমস্তক পুরু গদি আঁটা সেকেন্ড ক্লাস, ফার্স্ট ক্লাস। সাধারণ প্যাসেঞ্জার ঐ সব কমপার্টমেন্টে ওঠা তো দূরের কথা, ফুটবোর্ডে পা রাখতেও সাহস পেত না। প্ল্যাটফর্ম থেকেই কোনোরকমে ভেতরের গদি, ফ্যানগুলো দেখত।
