হঠাৎ বাসুদেব চুপ করে গেল। কেমন যেন সতর্ক হল।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, আমার মুখ চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, চুপ! কিছু শুনতে পেলে?
কই না তো।
ভালো করে কান পেতে থাকো।
এতক্ষণ বেশ হালকাভাবে কথা হচ্ছিল, এখন হঠাৎ এ আবার কী? নিশ্চয় বাসুদেবের কিছু ভুল হচ্ছে। তবু কান পেতে রইলাম।
এখানে কোনদিন এত রাত পর্যন্ত জাগা হয়নি। কাজ তো নেই, তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ি। তাই গভীর রাতে জায়গাটার চেহারা কীরকম হয় আজ পর্যন্ত তা দেখা হয়নি। দুজনে পাশাপাশি উৎকর্ণ হয়ে শুয়ে আছি কোনো কিছু শোনার প্রতীক্ষায়। চৌকি থেকে হাত দশেক দূরে খোলা জানলা দিয়ে বাড়ির সামনের মাঠটা দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। এটা শুক্লপক্ষ কি কৃষ্ণপক্ষ জানি না। মুমূর্ষ মানুষের ফিকে হাসির মতো ম্লান চাঁদের আলো এসে পড়েছে মাঠের ওপর। কেমন যেন রহস্যঘন ছায়া-ছায়া ভাব। দিকভ্রম হয়ে যায়। কোন দিকে সেই অতিকায় শেয়ালটা বা রহস্যময় সাহেবটা ঘাড় ঘোরাতে ঘোরাতে গিয়েছিল, বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে এই মুহূর্তে তা মালুম হচ্ছে না।
কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি নিস্তব্ধ নিশুতি রাতেরও নাকি ভাষা আছে। এটা যে কতখানি সত্য তার প্রমাণ আজ পেলাম। দূরে বনঝোপে একটানা ঝিঁঝি ডেকেই চলেছে। কোথা থেকে মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে শোঁ শোঁ শব্দ। অনেকটা ঝাউবনে বাতাস খেলা করার মতো। এ ছাড়া দূরে বাঁওড়ের ধারের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে ভয়-পাওয়া কুকুরের ডাক। আচ্ছা, কুকুর তো গৃহপালিত পশু। রাস্তাতেও দেখা যায়। তা বনে-জঙ্গলে? কী জানি।
এইসব ভাবছিলাম হঠাৎ বাসুদেব আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। চাপা গলায় বলল, ঐ শোনো।
শুনলাম।
তেমন কিছু নয়। শুধু বাড়ির ওদিকের বাইরের দেওয়াল ঘেঁষে একটা চাপা শব্দ– খস্ স্ খস্….
কেউ যেন ভারী ভারী পা দুটো ঘাসটাতে ঘাসটাতে খুব সাবধানে বাড়ির চারিদিকে ঘোরবার চেষ্টা করছে।
কে? আমাকেও চমকে দিয়ে বাসুদেব চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে শব্দটা থেমে গেল। একটু পরে মনে হল যে এসেছিল সে যেন দ্রুত চলে গেল।
শিগগির টর্চটা বলেই টর্চ নিয়ে বাসুদেব দরজার খিল খুলতে যাচ্ছিল, আমি আটকে দিলাম।
অজানা অচেনা জায়গায় দুঃসাহস দেখিয়ে লাভ নেই। কেউ যে এসেছিল এটা যেমন সত্যি তেমনি সত্যি সে আর যাই হোক সামান্য চোর-ডাকাত নয়। কারণ, কোনো মানুষের পায়ের শব্দ অমন হতে পারে না।
বাসুদেব সুবোধ বালকের মতো না বেরিয়ে বিছানায় এসে বসল। বসেই রইল থমথমে মুখে।
কী ভাবছ?
ভাবছি ব্যাপারটা কী ঘটল। কেউ যে বাড়ির কাছে ঘুরছিল তা তুমিও বুঝতে পেরেছ, আমিও। আর সে যে চোর-ডাকাত নয় তাও বোঝা গেছে। আরও প্রমাণিত হল বগলা মজুমদারও এই কথাটা বলেছিলেন। মনে আছে তো?
খুব আছে।
তাহলে কে এই গভীর রাতে এখানে বেড়াতে এসেছিল? কেনই বা এসেছিল?
পরিবেশটা হাল্কা করার জন্যে হেসে বললাম, দ্যাখো, হয়তো ঘাড়-বাঁকানো সাহেবই আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিল।
বাসুদেব একরকম ধমক দিয়ে বলল, তুমি হাসছ? দ্যাখো, কলকাতায় তিনু ঘোষ যা বলেছিল তা তেমন বিশ্বাস করিনি। ওর কথায় কৌতূহলী হয়ে নিছক বেড়াতে এসেছিলাম। তারপর আবির্ভাব হল বগলা মজুমদারের। তিনি যে কী বলতে এসেছিলেন বোঝা যায়নি। শুধু খানিকটা ভয় দেখিয়ে গেলেন। আমরা তেমন গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু আজ রাত্তিরে যা শোনা গেল সেটা তো ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝাড়ার মতো উড়িয়ে দিতে পারছি না। পারছ কি?
মাথা নেড়ে বললাম, না।
এটাই এখন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আচ্ছা, পায়ের শব্দ শুনে আগন্তুকটির উচ্চতা, ওজন আন্দাজ করতে পার?
বললাম, না ভাই, অত এক্সপার্ট নই। তবে একথা বলতে পারি সাধারণ মানুষের চেয়ে ঢের ভারী চেহারা।
যেমন শেয়ালটাকে দেখেছিলে। তাই তো?
হ্যাঁ, তাই।
বাসুদেব বলল, আর দেরি নয়। কাল থেকেই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে।
কিন্তু এ তো গোয়েন্দাগিরি নয় যে, হত্যার সূত্র ধরে হত্যাকারীকে খুঁজবে। কীসের ওপর নির্ভর করে কাজ শুরু করবে?
বাসুদেব আমার পিঠ চাপড়ে বলল, রাত্তিরে যিনি এখানে হানা দিয়েছিলেন, যে কোন কারণেই হোক, তিনি আমাদের টার্গেট করেছেন। অতএব চিন্তা নেই, তিনি আবার আসবেন। অল্প সূত্র রেখে যাবেন। অতএব এসো বন্ধু, বাকি রাতটুকু নিশ্চিন্তে গড়িয়ে নিই।
.
পায়ের ছাপ নেই, হাতের কারসাজি
ভেবেছিলাম এরপর বাকি রাতটুকু একটা লম্বা ঘুম দিয়ে কাটিয়ে দেব। একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমোব। কিন্তু তা হল না। ঘুম ভাঙল অন্য দিনের মতোই ভোরবেলা।
ঘুম ভাঙ্গল, কিন্তু তখনই উঠতে পারলাম না। বড্ড দুর্বল লাগল। প্রথমে মনে হয়েছিল দেরিতে শোওয়ার জন্যেই বোধহয় ক্লান্তি লাগছে। কিন্তু বোঝা গেল তা নয়। মাথাটা অসম্ভব ভার হয়ে আছে। সেই সঙ্গে বুকে কেমন চাপ ধরছে। মনে হল, বাড়িটা আর আশেপাশের বাতাস যেন খুব ভারী হয়ে উঠেছে। অথচ অন্য দিন তো এমন হয় না। তাহলে?
বাসু!
বিছানায় বাসুদেবকে দেখতে না পেয়ে ডাকলাম। সাড়া নেই। আবার ডাকলাম। সাড়া নেই। আবার ডাকলাম। এবারও সাড়া নেই। গেল কোথায়?
শরীরের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে বিছানা থেকে উঠে পাশের ঘরে গেলাম। না, সেখানেও নেই।
আশ্চর্য! গেল কোথায়? অন্য দিন তো এত সকালে ওঠে না। ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
