হরিপদর দু’চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। যাক, গোটা এক মাসের জন্যে খাবার ভাবনা তাকে ভাবতে হবে না।
হরিপদর কাজ অল্প সময়ের জন্যে। সকালে এসে জলখাবার করে দিয়ে দুপুরের রান্না সেরে ফেলে। তারপর ও এক মালসা ভাত নিয়ে দু’মাইল দূরে বাড়ি চলে যায়। বিকেলে আসতে চাইছিল না। বলেছিল যে, না হয় টাকা কম দেবেন। কেন আসতে চায়নি তা অবশ্য স্পষ্ট করে বলেনি। আমরাও চাপ দিইনি। শেষ পর্যন্ত রফা হয় তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে চলে যাবে। তাতেও সন্ধে উৎরে যায়।
আজ ঢের আগেই অর্থাৎ বগলাবাবু থাকতেই ও চলে গিয়েছিল। যাবার জন্যে যেন তর সয় না। সোজা কথা নয়, পাক্কা দু’মাইল রাস্তা হাঁটতে হবে মাঠ, পুকুর পার হয়ে।
খাওয়া-দাওয়া করে মশারি টাঙিয়ে ভালো করে চারিদিক গুঁজে, মাথার কাছে দুজনে দুটো জোরালো টর্চ নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু তখনই ঘুম এল না।
লোকটা যেন কীরকম কীরকম।
কার কথা বলছ? বগলাবাবুর?
বললাম, ঠিক তাই। কী মতলবে এসেছিলেন তা বোঝা গেল না।
বাসুদেব মশা মারতে গিয়ে নিজের গালেই একটা চড় মেরে বলল, কিন্তু ভয়টা যে কীসের সেটাই বুঝলাম না। উনি তো দিনের বেলায় এদিকে আসতে ভয় পান পাছে কোন এক মুখপোড়া সাহেব দেখে ফেলে। আর, একটু রাত হলে কোন এক অজানা পশুর ভয়ঙ্কর নাকটা যেনয়ে শুয়ে পর ভালো করে চতে হবে ডাক!
তার ওপর আবার জগা মোড়লের ক্ষতবিক্ষত দেহ!
হ্যাঁ, আরও আছে। জিগ্যেস করেছিলেন, আমরা এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছি কিনা বা বাড়ির ঠিক বাইরে কারও পায়ের শব্দ ইত্যাদি শুনেছি কিনা।
বললাম, ভদ্রলোক সম্ভবত অলৌকিক কিছু ব্যাপার দাঁড় করাতে চাইছেন।
বাসুদেব চুপ করে রইল। তারপর বলল, আচ্ছা, তুমি বলছিলে দুটো অস্বাভাবিক জিনিস দেখেছিলে। তার মধ্যে একটা অতিকায় শেয়াল। অন্যটা এখনও বলনি।
বললাম, হ্যাঁ, সেটা একটা লোক।
লোক!
কীরকম?
বললাম, দু’ তিন দিন আগে। বেলা তখন আড়াইটে। দুপুরে ঘুমোবার অভ্যেস নেই। তাই ওদিকের রকে চেয়ারে বসে নিস্তব্ধ পল্লী-প্রকৃতি উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ দেখি একটা মোটাসোটা লোক। খুব ফর্সা রঙ। সে যে কোথা থেকে এল বুঝতে পারলাম না। মাঠটার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে গুটিগুটি।
গুটিগুটি হাঁটছিল কেন?
তা কী করে বলব ভাই! কোমরে ব্যথাট্যথা হলে ওরকম হাঁটে। কিন্তু কেন যে বারে বারে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের বাড়িটা লক্ষ করছিল তা বুঝতে পারছিলাম না। তা ঘাড় ঘোরানোটাও অস্বাভাবিক। কোনো মানুষ তার ঘাড়টা এত দূর পর্যন্ত ঘোরাতে পারে না।
আচ্ছা! বাসুদেব অবাক হল। তারপর? কোন দিকে গেল?
বললাম, ঐ জঙ্গলের মধ্যে। যেখানে শেয়ালটা ঢুকে গিয়েছিল।
বাসুদেব একটু ভেবে বলল, লোকটার অতখানি ঘাড় ঘোরানোটা সত্যি একটু অস্বাভাবিক।
না বন্ধু, আরও আশ্চর্যের ব্যাপার আছে। লোকটার পরনে একটা আন্ডারপ্যান্ট ছাড়া গায়ে আর কিছু ছিল না। একদম খালি গা। গায়ে অস্বাভাবিক লোম। অথচ ধবধবে ফর্সা রঙ। ঘাড় পর্যন্ত কঁকড়া কটা চুল। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে ওর মুখটা। যতবার এদিকে ঘাড় ফিরিয়েছে ততবারই দেখেছি মুখটা কালো। যেন পুড়ে গিয়েছে। অমন ফর্সা মানুষটার এমন পোড়া মুখ!
হঠাৎ বাসুদেব উৎসাহে উত্তেজনায় উঠে বসল বিকাশ–বিকাশ, বুঝতে পেরেছ কি?
আমি অবাক হয়ে তাকালাম, কী?
বগলা মজুমদার খুব মিথ্যে বলেননি। তাঁর সেই মুখপোড়া সাহেবকেই তোমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বললাম, তা হলে তো লোকটার ওপর নজর রাখতে হবে।
বাসুদেব বলল, কিন্তু লোকটাকে পাবে কোথায়? মাত্র তো কয়েক মিনিটের জন্যে দেখতে পেয়েছিলে। কোথা থেকে বা কোন দিক থেকে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল তাও তো বোঝা যাচ্ছে না। আর এখনও পর্যন্ত এমন কিছু ভয় পাওয়ার ঘটনা ঘটেনি যার জন্যে আমাদের নড়েচড়ে বসতে হবে।
বললাম, তা ঠিকই, বগলাবাবুর মুখ থেকেই যেটুকু শোনা। আর ওঁর কথা সত্য হলে আশা করা যায় খুব শিগগির কিছু একটা ঘটবে।
একটু থেমে বললাম, মনে হচ্ছে বেলেঘাটার তিনু ঘোষ যা বলেছিল তার কিছুটা সত্য।
বাসুদেব বলল, তিনু ঘোষের কথা কতটা সত্য তা যাচাই করার জন্যেই তো আমাদের এখানে আসা। শতকরা পঞ্চাশভাগ সত্য হলেও আমাদের অর্থব্যয়, আমাদের পরিশ্রম সার্থক মনে করব।
আমি হেসে ফেললাম।
হাসছ যে?
বগলাবাবু বেশ বলেছেন আমরা ছদ্মবেশী পুলিশ!
বাসুদেবও হেসে বললে, হাঁ, পুলিশ হলে আগে পাকড়াও করতাম বগলাকেই। লোকটাকে বোঝা গেল না। ঠিক কী উদ্দেশ্যে ভয়ে ভয়ে এখানে এসেছিলেন। শুধু কি কতকগুলো ভয়ের কথা শোনাতে?
বললাম, না। আরও কিছু ছিল। ওঁর ধারণা ঐ সাহেবটাই এখানে অশান্তি সৃষ্টি করছে। কিছু একটা ঘটাতে চাচ্ছে। অথচ তাকে নাকি ধরা কঠিন।
তাহলে জন্তুর ডাকটা কী?
সে ডাক শোনার সৌভাগ্য এখনও আমাদের হয়নি। কে জানে জগা মণ্ডলকে হয়তো সেই জন্তুটাই খতম করেছিল।
আমি একটু থমকে গেলাম। মনে পড়ল বেলেঘাটার তিনু ঘোষও সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবার আগে সন্ধ্যার পর একটা জন্তুর ডাক শুনেছিলেন। তবে সেটা অনেকটা শেয়ালের ডাকের মতো।
বাসুদেব হালকা সুরে বলল, বগলাবাবু মনে করেন পুলিশের ছদ্মবেশে আমরা কলকাতা থেকে এখানে এসেছি ঐ পোড়ারমুখো সাহেবটার ওপর নজর রাখতে। ওকে ধরে জেলে পুরতে পারলেই এখানকার অশান্তির শেষ হবে। বাসুদেব মস্ত বড় হাই তুলে বলল, যাই হোক, লোকটা আমার কাছে রহস্যময় হয়ে উঠেছেন। কোথা থেকে এসেছেন, কত দূরে বাড়ি, কী করেন, কিছুই জানা গেল না। এতই যদি ভয় তাহলে সন্ধের পর একা একা এলেন কেন? কথা বলতে বলতে উঠে পালালেনই বা কেন?
