বললাম, এটা জানা কি আপনার একান্ত দরকার?
বগলাবাবু চোখ বড় বড় করে বললেন, দরকারটা ঠিক আমার একার নয়। এ অঞ্চলে কাছেপিঠে আরও যারা আছে তারাও জানতে চায়। তারাও আপনাদের দেখে অবাক হয়েছে। কৌতূহলী হয়েছে। বুঝতেই পারছেন একসময়ে আমার পূর্বপুরুষেরা জমিদার ছিলেন। প্রজাদের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ তাদেরই দেখতে হত। এখন জমিদারও নেই, জমিদারিও নেই। তবু তাঁদের বংশধর হিসেবে আমি রয়েছি যখন
হ্যাঁ, তখন সব দায়িত্ব আপনার।
একটু থেমে বাসুদেব বললে, আচ্ছা, আমাদের দেখলে কি হিমালয় আর বঙ্গোপসাগরের মধ্যিখানের পশ্চিমবঙ্গ নামক একটি জায়গার মানুষ ছাড়া ভিন্ন গ্রহের কোনো জীব বলে মনে হয়?
বগলাবাবু জিব কেটে বললেন, আরে, নানা। ওসব কিছু নয়। আসলে আপনাদের মতো মানুষজন তো বড় একটা এ পোড়া দেশে পা দেয় না। তাই মনে হওয়া স্বাভাবিক কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই আপনারা এখানে এসেছেন। সেই উদ্দেশ্যটা সম্বন্ধে আমাদের যৎকিঞ্চিৎ কৌতূহল আর কি।
উদ্দেশ্য খুব সাদা সরল। আমরা দুই বন্ধুতে পশ্চিম বাংলার ছোটো ছোটো অখ্যাত গ্রামগুলো সমীক্ষা করতে এসেছি।
শুনে বগলাবাবু কয়েক মুহূর্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ টিপে হেসে মাথাটা এদিক থেকে ওদিকে বাড়িয়ে বললেন, উ-হুঁ। ওসব সমীক্ষা-টমীক্ষা করতে এলে খাতা পত্তর, ম্যাপ, স্কেল, কম্পাস থাকে। আমি মুখ হলেও খুব বোকা নই।
মিথ্যে ধরা পড়ার জ্বালায় বাসুদেব একটু তেতে উঠে বলল, এতই যদি বুদ্ধিমান তাহলে আপনিই আন্দাজ করুন কোন মহৎ কার্যসিদ্ধির জন্যে কলকাতা থেকে এতদূরে মাত্র পনেরো দিনের জন্য ঘর ভাড়া করে রয়েছি!
বগলাবাবুর কুচকুচে কালো গোল মুখখানি আলোকিত করে শ্বেতশুভ্র দাঁতের মধ্যে দিয়ে একটুখানি হাসি দেখা দিল। মাথা দুলিয়ে বললেন, তাহলে আমিই বলব?
হ্যাঁ, বলুন।
আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবেন না মহাশয়রা। বলব?
হ্যাঁ, চটপট বলে ফেলুন।
আপনারা পুলিশের লোক।
বটে-বটে-বটে! দারুণ বলেছেন তো! কদিন এখানে রয়েছি কেউ আমাদের চিনতে পারেনি। আর আপনি কিন্তু কী উদ্দেশ্যে পুলিশযুগল এখানে এলেন বলতে পারেন কি? বাসুদেব যেন রুখে উঠল।
নিশ্চয় পারি–নিশ্চয় পারি। আর সে বিষয়ে আপনাদের সাহায্য করতেই আসা।
তা হলে বলুন। আমরা শুনি।
বলছি। তবে আপনাদের আরও আগে আসা উচিত ছিল। কেননা ও তো এরই মধ্যে কাজ আরম্ভ করে দিয়েছে। দু-দুটো আদিবাসী, তারপর
এবার আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলাম না। বললাম, কী বলতে চাইছেন একটু স্পষ্ট করে বলুন।
বগলাবাবু বললেন, ঐ দেখুন, আপনারাও আবার লুকোচুরি খেলা শুরু করলেন। আচ্ছা, আপনারা যে ক’দিন এখানে রয়েছেন তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাননি?
অস্বাভাবিক। যেমন–?
যেমন রাত্তির বেলা ঘরের ঠিক বাইরে কারও নিঃশব্দে চলাফেরার শব্দ, কিংবা কোনো অজানা পশুর ডাক–
হঠাৎ বগলাবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, ক’টা বাজল, স্যার?
পৌনে সাতটা।
ওরে বাবা! এবার আমাকে উঠতেই হবে। আমার হয়েছে সব দিক দিয়ে জ্বালা। দিনের বেলা এলে সাহেব ব্যাটা কিংবা ওর শাগরেদ হয়তো দেখে ফেলবে। আর রাত হলে কী একটা জানোয়ারের হাড়-হিম-করা ডাক।
হাড়-হিম করা ডাক! জন্তুটাকে আপনি দেখেছেন?
রক্ষে করুন, মশাইরা। আপনাদের বাবা-মায়ের আশীর্বাদে যেন কোনোদিন তেনার দর্শন পেতে না হয়।
পেলে কী হবে? বাসুদেব জিগ্যেস করল।
কী হবে? ঐ জগা মোড়লের দশা হবে। যে কেসের তদন্ত করতে আপনারা এসেছেন– বেচারি সন্ধেরাতের একটু পরে বাড়ির কাছেই খামার ঘরে কিছু একটা শব্দ শুনে লণ্ঠন হাতে দেখতে গিয়েছিল। পাঁচ মিনিটের পথ মশাই, কিন্তু সারা রাত্রেও ফিরল না।..আচ্ছা, চলি।
দাঁড়ান-দাঁড়ান। তারপর তার কী হল বলে যান।
সবই তো জানেন। তবে না জানার ভান করছেন কেন? পরের দিন বাঁওড়ের জলে তার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেল।
কে খুন করল তাকে?
সে তো আপনারাই খুঁজে বের করবেন। তবে মানুষ নয়। আমি চলি মশাই।
মানুষ নয়! তবে? আর পাঁচ মিনিট। ঐ যে বাঁওড় না কী বললেন ওটা কী? কোথায়?
বাঁওড় জানেন না? তা জানবেন কী করে? আপনারা যে কলকাত্তাই মানুষ। বাঁওড় হচ্ছে বড় দীঘির মতো। তবে অল্প জল, নোংরা। ছিরিছাঁদ নেই।
বলেই বগলাবাবু লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে উঠে পড়লেন।
আর একটা কথা। সাহেব’ না কী বলছিলেন?
ঐ দেখুন, আবার লুকোচুরি! ঐ মুখপোড়া সাহেবটার ওপর লক্ষ রাখার জন্যেই যে এসেছেন তা কি আমি জানিনে? অথচ দেখাচ্ছেন যেন কিচ্ছুটি জানেন না। তবে ওকে ধরতে পারবেন কি? দেখুন চেষ্টা করে।
বলতে বলতে মজুমদার মশাই লণ্ঠন হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে একবার এদিক-ওদিক দেখে নিয়েই অন্ধকারে ঝাঁপ দিলেন।
আসবেন আবার।
বগলাবাবু কথা বললেন না। হাতের ইশারায় শুধু জানিয়ে দিলেন আসবেন।
দরজা বন্ধ করে আমরা জানলা দিয়ে দেখতে লাগলাম। মাঠের মধ্যে দিয়ে একটা আলো দুলতে দুলতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বড় অদ্ভুত লোক।
বাসুদেব বলল, হ্যাঁ।
.
মুখপোড়া সাহেব
এখানে এসেই একটি কাজের লোক পেয়ে গিয়েছিলাম। বড় গরিব। এ অঞ্চলের মানুষ। তাই মাইনে নিয়ে দরকষাকষি করেনি। দু’ বেলা পেট ভরে খেতে পাবে এতেই খুশি। শুধু বলেছিল, মাত্র পনেরো দিন?
হ্যাঁ, হরিপদ। আমাদের এখানে পনেরো দিনের জন্যেই আসা। তুমি অবশ্য পুরো মাসেরই মাইনে পাবে।
