বাসুদেব চেয়ারে গা ছড়িয়ে বলল, তা গবেষণারই ব্যাপার বটে। দ্যাখো বিকাশ, শেয়ালটার কথা শুনে পর্যন্ত আমার মনে নানা প্রশ্ন উঠছে।
যেমন?
যেমন ধরো, অত বড় শেয়ালের কথা কখনও শুনিনি। দ্বিতীয়ত, শেয়াল সাধারণত সন্ধেবেলায় বেরোয়। আর শেষ প্রশ্ন হচ্ছে–শেয়াল কখনও ধীরে সুস্থে, হেলতে দুলতে যায় না। যায় দৌড়ে।
বললাম, বেশ তাই না হয় হল–তাতে কী? তোমার সন্দেহ হচ্ছে আমি সত্যিই শেয়াল দেখেছি কিনা?
বাসুদেব বলল, প্রথমে সেরকম সন্দেহ হয়নি। তারপর তুমি যখন জোর দিয়ে বললে, ওটা শেয়ালই, অন্য কিছু নয়, তখন মেনে নিলাম ওটা শেয়ালই। কিন্তু শেয়ালটা কোথা থেকে এসে কোথায় গেল তা তো বলতে পারছ না।
বললাম, ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনি। হঠাৎ দেখলাম একটা শেয়াল যাচ্ছে। সেটা গিয়ে ঢুকল ঐ ঝোপ-জঙ্গলে। ব্যস্। আমার কৌতূহলেরও শেষ।
ঠিক আছে বাবা। এখন বলো তো দ্বিতীয় অস্বাভাবিক জিনিসটা কী?
সেটা শুনে তুমি হাসবে। তবু বলছি গতকাল ঠিক ঐ সময়েই অর্থাৎ নির্জন দুপুরে দেখলাম একটা লোককে
কী হল? থামলে কেন?
ইশারায় চুপ করতে বলে দরজার দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে কেউ আসছে।
এই সন্ধেবেলায় অচেনা অজানা জায়গায় কে আবার আসবে?
চাপা গলায় বললাম, চুপ। ঐ যে–এসে গেছে।
কেন যে অমন ভয়ে ভয়ে চুপ করতে বললাম তা নিজেও জানি না। কেউ না কেউ তো আসতেই পারে! তখনই দরজার বাইরে অপরিচিত গলা পাওয়া গেল, এই যে বাবুমশাইরা, খুব ব্যস্ত নাকি?
কে? একটু রাগ-রাগ গলায় জিগ্যেস করল বাসুদেব।
যদি অনুমতি করেন তো ভেতরে ঢুকি।
এবার আমিই তাড়াতাড়ি দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানালাম, অনুগ্রহ করে ভেতরে এসে বসুন।
বাঁ হাতে লণ্ঠন, ডান হাতে মোটা লাঠি, হাঁটু পর্যন্ত ভোলা ধুতি, গায়ে চাদর জড়িয়ে যে লোকটি ঢুকলেন তার বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। গায়ের চাদরটা দিয়ে এমন ভাবে মাথা-মুখ ঢেকে রেখেছেন যেন ভদ্রলোক নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।
উনি হাসলেন একটু। গোল কালোমুখে সাদা দাঁতগুলো এমনভাবে প্রকট হল যে রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দিল। মনে হল, কোনো অশুভ ঘটনার আগাম জানান দিতেই তিনি এসেছেন।
আমার নাম বগলা মজুমদার। এ অধমকে আপনারা চিনবেন না। তবে কাছাকাছি তিন চারটে গ্রামের লোক আমাকে মান্যি করে। যদি জিগ্যেস করেন কী এমন তালেবর মানুষ আপনি যে এত লোকে মান্যি করে, তাহলে তার সঠিক কারণ বলতে পারব না। এইটুকু বলতে পারি আমাদের তিন পুরুষের বাস এই গ্রামে। পাশাপাশি পাঁচখানা গ্রামের জমিদারি স্বত্ব কিনেছিলেন আমার পিতামহ করালিচরণ মজুমদার। দুর্ধর্ষ জমিদার ছিলেন মশাই। তার দাপটে বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। তারপর ইংরেজ আমলে আমার পিতাঠাকুর নীলকর সাহেবদের যে সাহায্য করেছিলেন তাতে ইংরেজরা খুশি হয়ে–ঐ দেখুন ভাই, আমিই বকে যাচ্ছি। এলাম আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করতে আমার ঠিক করে দেওয়া বাসাটা কেমন লাগছে?
বললাম, ভালোই।
কোনো অসুবিধে নেই তো?
নাঃ, দুজন তো ঝাড়া হাত-পা মানুষ। তা ছাড়া সপ্তাহ দু-একের তো মামলা।
বগলাবাবু সে কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, তা আপনারা তো কলকাতা থেকেই আসছেন?
বললাম, হ্যাঁ।
বাঃ, খুব ভালো। বসিরহাটের গগন কুণ্ডু যখন এখানে একটা ছোটো বাসা ভাড়ার জন্যে বললে তখন খুব অবাক হয়েছিলাম। কলকাতা থেকে এখানে কেউ বাসা ভাড়া করে থাকতে আসে নাকি? তাও মাত্র দিন পনেরোর জন্যে। গগনের সঙ্গে একসময়ে বারাসতের ইস্কুলে পড়তাম। ইস্কুল ছাড়ার পরও যোগাযযাগটা আছে। কী করে আছে? আসলে কি জানেন, বাবুমশাই, অন্তরের টান। ইস্কুলে এই যাদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে ওঠাবসা–তাতে কোন স্বার্থের ভেজাল থাকে না। সে সম্পর্কটা একেবারে খাঁটি সোনা। তাই
বুঝলাম বগলাবাবু মানুষটি কথা শুরু করলে থামতে চান না। আর সেইজন্যে বাসুদেবও বেশ রেগে উঠছিল। তাই তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, গগনদা আমাদেরও অনেক দিনের চেনা। ওঁকে যখন কথায় কথায় এখানে ক’দিনের জন্যে বেড়াতে আসার প্ল্যানের কথা বললাম তখন উনিই বোধহয় আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করে দিলেন।
এইটুকু বলতেই বগলাবাবু তৎক্ষণাৎ অল্প জলে ল্যাটা মাছ চেপে ধরার মতো আমার ওপর একরকম ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, ঠিক ঐ কথাটাই জানার জন্যে আমার আসা। বলে হেঁ হেঁ করে হাসতে লাগলেন।
কোন কথাটা বলুন তো।
ঐ যে বললেন এখানে আসার প্ল্যান। এইরকম গোভাগাড়ে জায়গায় আপনাদের মতো শিক্ষিত, অবস্থাপন্ন যুবকদের আসার আসল উদ্দেশ্যটা কী?
বগলাবাবুর একথায় বাসুদেব রেগে যাচ্ছিল, তাকে কোনরকমে সামলে-সুমলে হেসে বললাম, এই সামান্য কথাটা জানবার জন্যে রাত্তিরেই চলে এলেন! আশ্চর্য!
বগলাবাবুর মুখটা যেন ঝুলে গেল। খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বললেন, ওটা বন্ধ করে দিলেই তো হয়। বাসুদেব বলল, কেন অসুবিধে কী, বেশ ফুরফুরে হাওয়া আসছে
ফুরফুরে হাওয়া বেরিয়ে যাবে। হঠাৎ যেন ভদ্রলোকটির ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়ল। খেঁকিয়ে উঠলেন, জানেন না তো কোথায় এসেছেন।
অবাক হবার ভান করে বললাম, জায়গাটা খারাপ নাকি?
আমি কিছু বলব না। দুদিন থাকুন। তাহলেই বুঝবেন।
দিনে না এসে সন্ধেরাতে আসার কারণটা বগলাবাবু যেন এড়িয়ে যেতে চাইলেন। উল্টে চাপ দিলেন, এবার বলুন তো হঠাৎ এখানে আসার আসল কারণটা কী? বলে, যেন কিছুই নয় এমনি ভাব করে হাসি-হাসি মুখে আমাদের দিকে তাকালেন।
