কথা বলতেও বোধহয় কষ্ট হচ্ছে বৃদ্ধর। তিনি শুধু মাথা নাড়লেন। সে সমাধিস্থান আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাঁধানো তো নয়ই, বুনো গাছপাতার আড়ালে কোথায় লুকিয়ে আছে। এমনটাই তিনি চেয়েছিলেন।
এইটুকুই বলে বৃদ্ধ হাঁপাতে লাগলেন। তারপর নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হলে তিনি বললেন, তা ছাড়া সেখানে পাহারা দিচ্ছে বেশ কিছু ভয়ংকর অশরীরী প্রেতাত্মা। ওখানে কেউ গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। ছাগল-গোরুও ওখানে ঘাস খেতে যায় না।
সামভোতা বললেন, যে রাস্তা দিয়ে খানের শবদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই রাস্তাটা ঠিক কোথায় জানি না। তবু দেখবার সাধ ছিল।
বৃদ্ধ হাসবার চেষ্টা করে বললেন, কাল রাত্রে অজ্ঞাতে তোমরা ঐ পথ দিয়েই এসেছিলে।
কথা শেষ করেই তিনি সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে চলে গেলেন। বলে গেলেন, আজ রাতটা সাবধানে থেকো। ও এখানেই ঘুরছে। কারও ক্ষতি করবেই।
.
খুব ক্লান্ত ছিলাম। এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। একটা মোটামুটি ভালো হোটেল। বড়ো একটা ঘরেই তিনটে বেড পেয়েছিলাম। চৈনিক বৃদ্ধটি বারে বারে সাবধান করায় একটু যে ভয় করছিল না তা নয়। তবে যেহেতু ত্রিকালদর্শী বৃদ্ধটি এখানেই আছেন সেইজন্যে খুব ভয় পাইনি। তা ছাড়া অ্যাটাচড বাথরুম। বাইরে বেরোবার দরকার হবে না।
বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুম।
অকাতরেই ঘুমোচ্ছিলাম। তারপরে অনেক রাত্রে মাথার দিকের বন্ধ জানলার বাইরে কেমন একটা চাপা শব্দ। শব্দটা সাপের গর্জনের মতো। জানলায় দুবার ঠক্ঠক্ করে শব্দ হল। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, কে? উত্তর পাওয়া গেল না। শুধু হোটেলের কম্পাউন্ডের মধ্যে একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ। তার পরেই এমন কিছু ইঙ্গিত পেলাম যা বোঝাতে পারব না, কিন্তু নিজে বুঝলাম–যে এসেছিল সে কাজ শেষ করে চলে গেল।
কাল রাত্রেই ঠিক করা হয়েছিল আজই রওনা হব। হোটেলের বয় ট্রেতে করে চা আর টোস্ট আমাদের তিনজনকে দিয়ে গেল নিঃশব্দে।
এখানে দেখছি প্রায় সবাই কম কথা বলে।
ব্রেকফাস্ট শেষ হতেই একজন ইউনিফর্মপরা কর্মচারী এসে জানাল, আপনাদের লাদাখে পৌঁছে দেবার জন্যে গাড়ি এসে গেছে।
বাবাঃ! এ যে ঘড়ির কাঁটা ধরে কাজ!
গাড়ির ব্যবস্থা করতে কে বললেন?
থমথমে মুখে কর্মচারীটি চোখ বুজিয়ে হাত জোড় করে বলল, কাল রাত্তিরেই তিনি আদেশ দিয়েছিলেন।
ব্যস্! আর কিছু বলার নেই।
পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা বেরিয়ে এলাম।
কিন্তু আমাদের আর একজন? পেশেন্ট–
তিনি আগেই গাড়িতে উঠে পড়েছেন। বলল কর্মচারীটি। তাকে যেন খুব ব্যস্ত মনে হল। আমাদের জন্যে সময় নষ্ট করতে চাইছিল না। মানে মানে বিদেয় করে দিতে পারলেই যেন বাঁচে।
সামভোতা বললে, যাবার আগে একবার তার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
এ কথায় কর্মচারীটিকে বিব্রত লাগল। ইতস্তত করে বলল, দেখা করবেনই? তবে আসুন।
গত রাত্রে তাঁর সেই ঘর নয়। শোবার ঘর দেখলাম লোকে ভর্তি। সবাই মাটিতে বসে রয়েছে ধ্যানে বসার মতো। নিঃশব্দে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। বিছানায় শুয়ে যে মানুষটি, ফুলের মালার অন্তরালে তাঁর সর্বাঙ্গ ঢাকা পড়ে গেছে।
কী ব্যাপার?
কর্মচারীটি বিমর্ষ বেদনায় শুধু বলল–কাল রাত্রে হঠাৎই উনি দেহ রাখলেন। রাত তিনটের আগে আমরা কিছু বুঝতে পারিনি।
ওঁকে শেষ প্রণাম জানিয়ে আমরা গাড়িতে এসে উঠলাম। কাল রাত আটটার পর থেকেই তার শরীর খারাপ করছিল। কিন্তু এমন কী হল যে রাতটুকুও কাটল না?
.
[চেঙ্গিস খানের জীবনের অনেক ঘটনা জেনেছি ভাসিলি ইয়ান রচিত চেঙ্গিস খান উপন্যাস থেকে।]
[শারদীয়া ১৪১২]
কালো মুখ সাদা চামড়া
বগলাবাবুর আবির্ভাব
এখানে এসে পর্যন্ত গত কয়েক দিনের মধ্যে এমন দুটো জিনিস চোখে পড়ল যা খুব আশ্চর্যজনক বা ভয়ঙ্কর কিছু না হলেও অস্বাভাবিক।
যে জায়গাটায় আমরা দুজন রয়েছি সেটা যে নির্জন হবে এটা তো জানা কথাই। কারণ নির্জন জেনেই আমরা এখানে এসেছি।
পাঁচিলঘেরা অল্প খানিকটা জায়গায় দুখানা ঘর। কাঠের গেটের বাইরেই মাঠ। মাঠের দক্ষিণে কিছু গাছ-গাছালি।
বন্ধু বাসুদেবকে একটু চমকে দেবার জন্য বললাম, পরশু দিন বিকেল বেলা একটা বিরাট শেয়াল দেখলাম হে! ধীরে সুস্থে গেল।
শেয়াল!
হ্যাঁ।
কোন দিকে গেল?
উ গাছ-গাছালির দিকে।
কথাটা শুনে বাসুদেব অন্যমনস্ক হয়ে গেল। বললাম, অবাক হচ্ছ কেন?
বাসুদেব বলল, না, এখন তো শেয়াল বড় একটা দেখা যায় না। এখানে হঠাৎ এল কোথা থেকে? তাও আবার বলছ ‘বিরাট’ শেয়াল।
বললাম, শেয়াল এখন দেখা যায় না ঠিক। তা বলে একটিও শেয়াল দেখা যাবে না এমন কথা জোর করে কেউ বলতে পারে না।
বাসুদেব চুপ করে রইল। তারপর যেন গভীর চিন্তা করে বলল, তা হয় তো ঠিক। কিন্তু ঐ যে বলছ ‘বিরাট’ শেয়াল। খটকা ওখানেই।
বললাম, হ্যাঁ, তা বেশ বড়সড়। অত বড় শেয়াল আমি দেখিনি।
বাসুদেব বলল, ওটা শেয়াল বটে তো? ঠিক দেখেছ?
হাজার বার ঠিক দেখেছি। তখন সবে বিকেল। দিব্যি রোদ। কাজেই শেয়াল চিনতে আমার ভুল হয়নি।
বাসুদেব চুপ করে রইল।
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। তালগাছের মাথার উপর দিয়ে অন্ধকার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। মাঠের ওপর, উঠে গিয়ে আলো জ্বেলে দিলাম।
কী ব্যাপার বলো তো? একটা শেয়াল নিয়ে এত কী গবেষণা করছ?
