আমরা ফিরব কোন পথে?
তোমরা তো লাদাখের দিকে যাবে?
হ্যাঁ।
কাছেই। তার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
এর পর আমাদের কৌতূহল নিবৃত্তি করে চৈনিক বৃদ্ধটি চেঙ্গিস খানের জীবনের শেষ পর্বটি আমাদের জানালেন। আশ্চর্য, তার বলার ভঙ্গি, বক্তব্যের দৃঢ়তা দেখে মনে হল একশো বছরেরও ঢের বেশি বয়স্ক এই বৃদ্ধ যেন চেঙ্গিস খানের মৃত্যুসময়ে নিজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই বলে শুরু করলেন, এ কথাটা সবাই জানেন যে, সিন্ধুসভ্যতার যুগে নয়, তার ঢের পরে মাত্র আটশো বছর আগেও চেঙ্গিস খান নির্বোধের মতো জরা-মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার জন্যে নানা উপায় খুঁজছিলেন। পাননি।
তর তরুণী পত্নী কুলান খাতুনের মৃত্যুর তিন বছর পরেই চেঙ্গিস খান বুঝতে পেরেছিলেন তারও দিন ফুরিয়ে এসেছে।
মোঙ্গল খান বুঝতে পারছেন তার অন্তিম কাল আসন্ন। শ্বেত কম্বলের শয্যায় শায়িত। মাথার নীচে কৃষ্ণসার চর্মের নরম বালিশ। একটা কালো কম্বলে তার পা ঢাকা। তার দীর্ঘ শীর্ণ দেহটিকে অসম্ভব ভারী বলে মনে হচ্ছিল। নাড়াচাড়া করতে পারছিলেন না। তিনি তার মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত কাজের মানুষকে ডেকে পাঠালেন। তারপর নিচু গলায় কয়েকটি মূল্যবান পরামর্শ দিলেন। তার মধ্যে একটি এইরকম–
আমি মারা গেলে আমার মৃত্যুসংবাদ যেন কোনোভাবে প্রকাশ না পায়। কান্নাকাটি বা বিলাপের রোল তুলো না। শত্রুরা জানতে পারলে তারা শুধু খুশি আর উৎসাহী হবে তাই নয়, তোমাদের শোকপালনের সুযোগ নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে বসতে পারে। আমার চিরশত্রু তানগুতের রাজা আর রাজ্যের লোকজন যখন ভেট নিয়ে দুর্গের তোরণ থেকে বের হবে তক্ষুনি তাদের ওপর আক্রমণ করবে। দ্বিধা করবে না। তাদের ধ্বংস করবে….।
তিনি আরও বললেন, আমার নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে হুঁশিয়ার থেকে। আমার সেদিনের সেই জমজমাট ভোজসভার মাত্র তিন দিন পরেই হঠাৎ আমার সুস্থ প্রিয়তমা পত্নী কুলানের মৃত্যু হল। সে মৃত্যুর কারণ আর কেউ না জানলেও আমি অনুমান করতে পারি। তাকে হত্যা করেছিল আমারই নিকটতম আত্মীয়জন। প্রমাণ পাইনি। তাই তাদের প্রাণদণ্ড দিতে পারিনি।
তারপরই হঠাৎ সভয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করে বলে উঠলেন, সেই গলাকাটা বামনটা আমার চারদিকে ঘুরঘুর করছে কেন? ওকে তাড়িয়ে দাও। আমি সহ্য করতে পারছি না।
বলতে বলতে চেঙ্গিস খানের মুখ বিকৃত হল। ডান চোখ দীপ্তি হারিয়ে ঘোলাটে হয়ে গেছে। তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন। তারপর সব শেষ।
চেঙ্গিস খান অনেক দিন আগে থেকেই একখণ্ড ভারী কাঠের খোল বানিয়ে রেখেছিলেন। ভেতরে সোনার পাত মোড়া একটা শবাধার। সেটা গোপনে তার কাছেই থাকত যাতে হঠাৎ মৃত্যু হলে লোকজানাজানি হবার আগেই সেই শবাধারে তার মৃতদেহটি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।
আজ সেটা কাজে লাগল। গভীর রাত্রে সম্রাটের ছেলেরা শবাধারটি ঘরের মাঝখানে এনে রাখল। সামরিক বর্ম গায়ে পরিয়ে যোদ্ধার বেশে তাঁর মৃতদেহটি সযত্নে শবাধারে রাখা হল।
বুকের ওপর ভাঁজ করা দুটো হাত মুঠো করে ধরিয়ে দেওয়া হল তার কারুকার্য করা নিজস্ব তরোয়ালটি। মাথায় আটকানো ইস্পাতের কালো শিরস্ত্রাণ তার বোজানো চোখ আর মুখের ওপর একটা বিশ্রী ছায়া ফেলেছে। শবাধারে তার দুপাশে রাখা হল তীর-ধনুক, ছুরি, আগুন জ্বালাবার চকমকি পাথর আর সোনার পানপাত্র। চেঙ্গিস খানের আদেশমতো সেনা নায়করা তাঁর মৃত্যুর খবর গোপন রাখল। তানগুতরা যখন শহরের ফটক থেকে বেরিয়ে এসে চেঙ্গিস খানের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে সন্ধি প্রার্থনা করল তখন চেঙ্গিস খানের সেনা-নায়করা তারই নির্দেশমতো অতর্কিতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে সকলকে হত্যা করল। তারপর একটি শত্রুরও চিহ্ন না রেখে চেঙ্গিস খানের শবাধার কম্বলে জড়িয়ে বারোটি ষাঁড়েটানা দু চাকার গাড়িতে চাপিয়ে নির্দিষ্ট গোপন জায়গার দিকে এগিয়ে চলল। পাছে কেউ মোঙ্গল খানের শবদেহবাহী শকট যাচ্ছে বলে সন্দেহ করে তাই দুপাশের কী মানুষ কী জন্তু-জানোয়ার যে কেউ চোখে পড়েছিল তাদের সকলকেই তারা হত্যা করেছিল।
এক সময়ে তিনি বুরখান খালদুনের পাহাড়ে শিকার করতে গিয়েছিলেন। পাহাড়ের ঢালুতে নির্জন জায়গায় একটা আকাশে ছোঁওয়া উঁচু দেবদারু গাছের নীচে তিনি বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই শান্ত নির্জন বনভূমি আর দেবদারু গাছটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। সঙ্গের বিশ্বস্ত লোকদের তিনি বলেছিলেন, একান্তই যদি মরতে হয় তাহলে এই গাছটার নীচেই আমাকে চিরশান্তিতে থাকতে দিও। হ্যাঁ, গাছটা চিনে রেখো।
চেঙ্গিসের সেনানায়করা জঙ্গলের মধ্যে সেই দেবদারু গাছটি খুঁজে বের করে সেখানকার মাটির নীচে অনেক গভীরে তাদের প্রিয় খানের কফিনটা নামিয়ে দিল। তারপর মাটি চাপা দিয়ে তার ওপর এমনভাবে বুনো গাছ বসিয়ে দিল যে, কেউ যেন বুঝতে না পারে এখানে এক বিরাট পুরুষের দেহ রক্ষিত আছে।
বৃদ্ধ চৈনিক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটির মুখে সব কথা শুনে আমরা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম।
একটা জিনিস লক্ষ করছিলাম, রাত যতই বাড়ছিল, বৃদ্ধটি ততই বাসি ফুলের মতো ম্লান হয়ে পড়ছিলেন। অথচ তিনি নিয়মিত রাত জেগে বসে থাকতেন। ঘুম আসত না। আর আজ এখন তো সবে রাত আটটা।
বিনীতভাবে সামভোতা বললেন, সেই কবরস্থানে লোকে যায়? সেখানে নিশ্চয় নাম লেখার পাথর গাঁথা আছে বাঁধানো সমাধির ওপরে?
