চৈনিক বৃদ্ধটি বললেন, আপনি যথার্থই ইতিহাসপ্রেমী।
সামভোতা বিনয়ে প্রণাম করে বললেন, আমার আর একটি কৌতূহল আছে। মমির অনুসন্ধান করা। মমিগুলি সম্বন্ধে ভালো করে জানা। তিন হাজার-চার হাজার বছরের পুরনো মমি–আমাকে বিহ্বল করে দেয়।
চৈনিক বৃদ্ধটি বললেন, আজ পর্যন্ত মিশরে প্রায় একশোটি মমি আবিষ্কৃত হয়েছে—
মার্জনা করবেন, সামভোতা বললেন, সংখ্যাটি বোধহয় আশির বেশি নয়।
তাই না হয় হল। কিন্তু ঐ আশিটি মমি পরীক্ষা করা কি সম্ভব? আর কী বা জানবেন?
সামভোতা বিনীতভাবে বললেন, সম্প্রতি মাত্র আঠারো বছর বয়স্ক রাজা তুতেনখামেনের মমি পরীক্ষা করে তার মৃত্যুরহস্য জানা গেছে। তার গায়ের একটা ক্ষতচিহ্ন থেকে শল্যবিা জানিয়েছেন তিনি নাকি ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন। তখন ক্যানসার নাম ছিল না। হয় তো অন্য নাম ছিল। এই থেকেই আমার এখন ইচ্ছে করে কলকাতার মিউজিয়ামে রক্ষিত মমি দুটোর মৃত্যুর কারণ সন্ধান করি।
সে কাজ কি সম্ভব হবে? কে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে?
এখনও পর্যন্ত কোনো আশা দেখছি না। তবে কলকাতায় এলেই একবার করে যাই যদি কোনো ক্লু পাই।
চৈনিক বৃদ্ধটি বললেন, চেঙ্গিস খান সম্বন্ধে আপনার আগ্রহ শুনলাম। কিন্তু কতটা জানেন?
কিছুই না। টুকরো-টাকরা ইতিহাস পড়ে যেটুকু জানা যায় আর কি।
চৈনিক বৃদ্ধটি এই সময় যেন একটু অন্যমনস্ক হলেন। যেন কারও নিঃশব্দ উপস্থিতি টের পেলেন। তারপর থেমে থেমে বলতে লাগলেন, চেঙ্গিস খান দুবার বড়ো আঘাত পেয়েছিলেন। না, অস্ত্রাঘাত নয়, হৃদয়ে শোকের আঘাত। তাঁর পিতা ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান। তাতারদের হাতে তার মৃত্যু হয়। প্রতিশোধ নেবার জন্যে তিনি তার সহ মোঙ্গলদের সব শত্রুদের নির্মমভাবে নিধন করে মোঙ্গোলিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি হন। রক্ত নিয়ে খেলার এই হল শুরু। দ্বিতীয় আঘাত পান–
হ্যাঁ, আগে বলে নিই চেঙ্গিস খানের চার পুত্র। জুচি, জানাতাই, উগেদেই আর তুলি খান। জাগাতাই-এর পুত্র, মোঙ্গল খানের বড়ো আদরের নাতি মুতুগান বালতান দুর্গের লড়াইয়ে নিহত হন। সেই খবর পেয়ে মোঙ্গল খান যাঁকে তোমরা চেঙ্গিস খান বল, ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বালতান ধ্বংস করে দেন।
সামভোতা বিনয় সহকারে বললেন, এটা আমার জানা।
খুব ভালো। একটা কথা জানো তো, যত দেশ জয় করা হবে, যত অত্যাচার করা হবে ততই শত্রু বাড়বে। মোঙ্গল খানের শত্রুদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে তার আত্মীয়-স্বজন, উত্তরাধিকারীরা যারা তার রক্তমাখা বিপুল সম্পত্তি গ্রাস করার জন্যে ওৎ পেতে ছিল।
তারপরই ছিল তার পুরনো শত্রু তানগুতে সম্রাট বুখান। যাকে তিনি কিছুতেই হটাতে পারেননি। উল্টে বুখানের একটি বিকলাঙ্গ ছেলে মোঙ্গল খানকে খুন করার জন্যে বারেবারে চেষ্টা করেছিল। তার একটা সুবিধে ছিল সে ছিল বেঁটে বামন। খুব সহজেই গাছের ডাল থেকে ঝুলে, কিংবা গুঁড়ি মেরে বাগিচার মধ্যে দিয়ে গিয়ে চেঙ্গিস খানের প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারত। কিন্তু তবু মোঙ্গল খানের সতর্ক সশস্ত্র প্রহরীদের জন্যে খুন করবার সুযোগ পায়নি।
চেঙ্গিস খান বুর্খানের এই বামন ছেলেটাকে ধরবার অনেকরকম ফাঁদ পেতেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই সে তার ছোটখাটো দেহ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। তার নাম ছিল থিবস্–
থিবস! চমকে উঠলাম আমরা। নামটা যেন জিগমের মুখে শোনা!
চেঙ্গিস খানকে হত্যা করার জন্যে থিস্ গোপনে ষড়যন্ত্রীদের নিয়ে একটি দল করেছিল। তারা তাকে পালাবার সময়ে সাহায্য করত। একবার থিবস্ পালাতে গিয়ে পাবলিকের হাতে ধরা পড়ল। যে পাবলিকের হয়ে থিবস্ অত্যাচারী সম্রাটকে খুন করার ব্রত নিয়েছিল, তারা মোটা পুরস্কারের লোভে বিশ্বাসঘাতকতা করে থিবসকে সোজা তুলে দিল চেঙ্গিস খানের হাতে। পাবলিকের এই বিশ্বাসঘাতকতায় সে রাগে দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিল। চেঙ্গিস খান নিজে হাতে তাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেন।
তারপর থেকে…..সব মানুষই থিবসের ক্রুদ্ধ আত্মার শিকার হয়ে পড়ল।
হঠাৎ এই সময়ে একটা দমকা হাওয়া ঘরের দরজা-জানলা কাঁপিয়ে দিল। বাতিগুলো নিভে গেল। হোটেলে আর যারা ছিল ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল। শুধু শান্ত হয়ে বসে রইলেন চৈনিক বৃদ্ধটি।
একটু পরেই সব শান্ত হল। আলো জ্বালা হল।
সামভোতা জিগ্যেস করলেন, এটা কী হল?
চৈনিক বৃদ্ধটি এবার হাসলেন না। শুধু বললেন, ও যে এখানেও এসে পড়েছে, তা জানান দিল।
কে?
থিবস্।
থিবস!
হ্যাঁ।
এখানেও!
মানুষমাত্রই ওর শত্রু। সবাইকে নিধন করতে চায়। বিশেষ করে কোনো ক্ষতি না করেও আমি তার শত্রু।
কেন?
এই যে ওর কথা আমি তোমাদের কাছে বলে দিলাম। যাই হোক, আজ রাতটা সাবধানে থাকতে হবে।
বিভাস বলল, আপনার আশ্রয়ে আমরা নিশ্চয় নিরাপদ।
বৃদ্ধ বললেন, আমরা সকলেই কিন্তু মানুষ। অতএব মৃত্যুর অধীন।
এরপর অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেল। বৃদ্ধটি আগের মতোই রাত্রের অভিজ্ঞতার কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর গড়গড়ার সট্রা ঠোঁটে চেপে নিঃশব্দে ধূমপান করতে লাগলেন। তারপর একসময়ে বললেন, তোমাদের সৌভাগ্য সব বিপদ কাটিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছ।
আমি বললাম, সবই তো হল। কিন্তু আমাদের গাড়িটা আর ড্রাইভারের দশা কী হল কে জানে।
বৃদ্ধ বললেন, ড্রাইভারকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। গাড়ি সারানো হয়ে গেলে নিশ্চয় প্রচণ্ড ঠান্ডায় সারা রাত তোমাদের অপেক্ষায় পাহাড়-জঙ্গলের নীচে গাড়ির মধ্যে বসে থাকবে না। সে ফিরে গেছে।
