সামভোতা হাত জোড় করে বললেন, আপনি কী করে জানলেন আমরা সারা রাত জেগে পথ হেঁটে এসেছি?
হাসলেন বৃদ্ধ চৈনিক। বললেন, শুধু এইটুকুই? আর সারা রাত কত ভয়ংকর ব্যাপার কাটিয়ে এসেছেন তাও কি আমি জানি না?
হঠাৎ আমার মনে হল–কে এই চৈনিক বৃদ্ধ? কোথায় এঁকে দেখেছি?
না, কোথাও দেখিনি। দেখা সম্ভবও নয়। তবে এঁর কথা শুনেছি সামভোতার মুখে। যে বর্ণনা শুনেছিলাম তাতে মনে হয় প্রায় আটশো বছর অতিক্রম করে সুদূর চিন দেশ থেকে এখানে এসে অবস্থান করছেন সেই মহাস্থবির গুণী–যিনি ধরণী ও আকাশের সমস্ত রহস্য উদঘাটন করেছেন এমনকি অমরত্ব লাভের পরশপাথর তান্-এরও নাকি সন্ধান জানেন–যাঁকে একদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং চেঙ্গিস খান–যাঁর নাম চানচু।
কিন্তু তা সম্ভব কী করে? সুদূর চিন থেকে চেঙ্গিস খান-এর আহ্বানে তিনি পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। তা বলে সেই মানুষ আটশো বছর বেঁচে থাকবেন। তিনি কি তা নামে সেই পরশপাথর সত্যিই আবিষ্কার করে ফেলেছেন?
বিভাসকে বলতেই ও ক্ষেপে গেল। বলল, যত আজগুবি ধারণা তোমাদের মাথায় আসে? একজন অতি বৃদ্ধ চিনা লোক হলেই কি তিনি আটশো বছর আগের চানচুন্ হবেন?
ইতস্তত করে বললাম, তা ঠিকই তবে সামভোতার মতো মানুষ হঠাৎ ওঁকে নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন কেন? কী করেই বা ঐ বৃদ্ধ আমাদের গত রাত্রের কথা বলে দিলেন? তা ছাড়া ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছ কেমন একটা দৈব অভিব্যক্তি!
এমনি সময়ে একটি বিচিত্র ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তি বাইরে থেকে এসে দাঁড়াল। দুর্বোধ্য ভাষায় লোকটি কিছু বলল। সঙ্গে সঙ্গে গায়ের চাদরটি জোব্বার ওপর ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বৃদ্ধ সবিনয়ে আমাদের বললেন, হোটেল চালানো ছাড়াও আমার ছোটোখাটো একটি নার্সিংহোম আছে। এই সময়টা একবার পেশেন্টদের দেখে আসি। আপনারা ততক্ষণ বিশ্রাম করুন। অবশ্য ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে যেতেও পারেন। গেলে খুশিই হব।
সারারাত্তির দুর্ভোগের পর আর রুগি দেখতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম প্রায় শত বছর বয়েসের ভার মাথায় নিয়ে কী উৎসাহে বৃদ্ধ স্বচ্ছন্দে রোগিরও সেবা করে যাচ্ছেন!
যেতে যেতে বোকার মতো বলেই ফেললাম, হোটেল চালাচ্ছেন, সে তত কম ঝামেলা নয়, তার ওপর আবার নার্সিংহোমের ব্যবসা।
বৃদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সরু আকারের চশমার কাচটা একটু তুলে ধরে মিনিটখানেক আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে না বুঝে কথা বলা ঠিক নয়। হোটেল চালানোটা আমার জীবিকা কিন্তু আমার কোনো ঝামেলা নেই। আমার একদল দায়িত্ববান কর্মচারী আছে। তারাই সব ঝামেলা কাঁধে নিয়ে আছে। বিশ্বাসভঙ্গের কথা তারা ভাবতেই পারে না।
আর নার্সিংহোম? ওটা ব্যবসার জন্যে নয়। মানুষের সেবা করার জন্যে। শুধু মানুষের সেবা করাই নয়, পশুপাখির জন্যেও আমার নিরাময় কেন্দ্র আছে। দুদিন যদি থাকেন দেখাব। আমরা যে সম্প্রদায়ের মানুষ, সেবাই হচ্ছে তাদের একমাত্র ধর্ম–একমাত্র কর্ম। আপনাদের স্বামী বিবেকানন্দর মতো
হ্যাঁ, এমন মানবপ্রেমী
বিভাসকে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বললেন, তিনি শুধু মানবপ্রেমী নন, জীবপ্রেমীও…..
যাই হোক, প্রথম আলাপেই বৃদ্ধটিকে খুব ভালো লাগল। আর তার নার্সিংহোমে গিয়ে যে লাভ হল তার জন্যে ভগবানকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই।
একটি বেডের কাছে গিয়ে প্রাজ্ঞ বৃদ্ধটি বললেন, দেখুন তো একে চেনা মনে হচ্ছে কিনা?
আমরা তিনজনেই আনন্দে চমকে উঠলাম।
এ কী! জিগমে!
হ্যাঁ, আজ ভোরে একে ঐ পাহাড়টার নীচে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। জ্ঞান ফিরলে ও সব কথা বলে। জিগ্যেস করেছিলাম, তা দল ছেড়ে কী করে ওদিকে গেলে? ও যা বলল তা অদ্ভুত। বলল, কে নাকি ওকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। খাদের ধারে গিয়েও গাছের শেকড় আঁকড়ে ধরে বেঁচে যায়।
এর আগেও ওকে অমনি কে ডেকে খাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কে অমন মরণডাক দিয়েছিল আপনি কি বলতে পারেন?
বৃদ্ধটি একটু হাসলেন। বললেন, পারি। এখন আপনারা হোটেলে ফিরে গিয়ে খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম করুন। সন্ধেবেলা বলব।
জিগ্যেস করলাম, জিগমের সুস্থ হতে কত দিন লাগবে?
আপনারা তো দুদিন আছেন। দুদিন রেস্ট পেলেই ও ঠিক হয়ে যাবে। একসঙ্গে ফিরবেন।
.
সন্ধেবেলা।
সেই ঘরটিতে সাদা পশমী গদির ওপর বসে আছেন বৃদ্ধ চৈনিক জ্ঞানী মানুষটি। তাকে যেন এখন কেমন কুঁজো কুঁজো লাগছে। দুপাশে রুপোর উঁচু উঁচু বাতিদানে জ্বলছে মোটা মোটা মোমবাতি। তিনি ভাঙা ভাঙা গলায় সামভোতাকে জিগ্যেস করলেন, প্রথমেই আপনার কথা জানতে ইচ্ছে করছে। তিব্বতের পুণ্যভূমিতে আপনার জন্ম। সংসার করেননি। তবু সারা জীবন কিসের খোঁজে নানা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?
সামভোতা বললেন, আমি জানি আপনি সর্বজ্ঞ। তবু বলি–খাতায় কলমে বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসের ডিপ্লোমা না পেলেও আমি মনে-প্রাণে একজন ইতিহাসবিদ। পৃথিবীর যত প্রাচীন প্রখ্যাত পুরুষ, তাদের প্রকৃত জীবনকাহিনি, লুপ্তপ্রায় প্রাসাদ, জন্মভিটে, তাদের স্থাপত্যকীর্তি আমি খুঁজে বেড়াই। শুধু ছাপার বই নয়, প্রাচীন পুঁথিপত্রও কম পড়িনি।
একটু থেমে সামভোতা ফের শুরু করলেন–মহাযোদ্ধা রক্তলোলুপ চেঙ্গিস খানের কথা যতই পড়েছি ততই অবাক হয়েছি। তার কোনো মহৎ গুণের কথা কোথাও পাইনি। তবু নৃশংস সাম্রাজ্যবাদী একজন যোদ্ধা হিসেবে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। তার সম্বন্ধে আরও কিছু জানতে ইচ্ছে করে।
