আলো! আনন্দের আতিশয্যে আমাদের মুখ থেকে একটা চাপা উচ্ছ্বাস বেরিয়ে এল। যেন আমরা কত যুগ পরে আলো দেখলাম।
কিন্তু এই অন্ধকারের রাজ্যে ওটা কিসের আলো, আনন্দে উৎসাহে তা ভেবে দেখার অবকাশই পাইনি। তিব্বতী প্রৌঢ়টির দিকে তাকালাম। তার মুখে কোনো উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনার চিহ্নমাত্র নেই।
জিগ্যেস করলাম, ওটা কিসের আলো?
উনি বিরক্ত হয়ে বললেন, এখান থেকে কী করে বলব? আমি গণৎকার নই। ওটা আলো নাও হতে পারে। চলো, সাবধানে এগোনো যাক।
না, আলোই। মরীচিকা বা অন্য কোনোরকম অলৌকিক চোখ-ভোলানো ব্যাপার নয়।
আমরা সবাই আলোটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। একটা মস্তবড়ো পাথরের প্রদীপে তেল জাতীয় কিছুতে সলতে জ্বলছে। আর তা থেকে সুগন্ধ বেরোচ্ছে।
আরে! ঐ দ্যাখো, সামনে রাস্তার ধারে ধারে আরো কটা পিদিম জ্বলছে।
কাছে গিয়ে দেখা গেল একই রকমের প্রদীপ।
কিন্তু এগুলো এত যত্ন করে জ্বালাল কে? কেনই বা জ্বালিয়ে রেখেছে? পথিকদের সুবিধের জন্যে?
তা হলে কি সত্যিই আমরা এতক্ষণে অন্ধকার থেকে আলোর জগতে এসে পৌঁছলাম?
সামভোতা মুখ ভোঁতা করে বললেন, আমাকে তোমরা ক্ষমা করো। আমার মাথা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে পথের ধারে ধারে এত সুন্দর দীপাধারে কারা আলো জ্বেলে রেখেছে? কেন রেখেছে? অথচ দ্যাখো কাছেপিঠে লোকজনের চিহ্নমাত্র নেই। আচ্ছা, গাছগুলোর আড়ালে ওটা কী?
উনি টর্চের বোতাম টিপলেন। একটা বহু পুরনো ভাঙা পোড়ামাটির ইটের বাড়ি।
এই দীর্ঘ পাহাড়ের রাজ্যে, হোক ভাঙা তবু, এই প্রথম একটা বাড়ি চোখে পড়ল। তাহলে?
দাঁড়াও-দাঁড়াও মনে পড়ছে। ইতিহাস….সিন্ধুসভ্যতা….মাটির নীচ থেকে তুলে আনা প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের দুটি গোটা নগরী হরপ্পা আর মহেঞ্জোদো! পোড়া ইটের বাড়ি, রাস্তার মাঝে মাঝে আবর্জনা ফেলার জায়গা, জল-নিকাশি ব্যবস্থা, নগরের বাইরে উঁচু উঁচু টিলার ওপর বড়ো বড়ো ট্যাঙ্কের মতো জলাধার, যাতে বৃষ্টি আর নদীর জল ধরে রাখা হত নগরবাসীর প্রয়োজন মেটাবার জন্যে! প্রধানত পুরোহিত আর ধনী সামন্ত বণিকরাই শাসন করত নগরবাসীদের। এই সময়ে এখানেই দেখা গেছে পথিকের সুবিধের জন্য রাস্তায় রাস্তায় প্রদীপ জ্বেলে রাখবার ব্যবস্থা। পূর্ণিমা শুক্লপক্ষ ছাড়া। বাড়ির আলো রাস্তায় পড়ত না। কেননা রাস্তার দিকে বাড়ির কোনো জানলা থাকত না। কেন থাকত না কে জানে!
সাড়ে তিন হাজার বছর আগের সিন্ধুসভ্যতার ধারার এক চিলতে আলো কি আজও ধরে রেখেছে এই অঞ্চলের মানুষ?
কিন্তু মানুষজন কই?
.
রহস্যময় চৈনিক মহাজ্ঞানী
আপনারা দেখছি সারা রাত জেগে, পথ চলে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন। যান, অনুগ্রহ করে আপনাদের জন্যে নির্দিষ্ট কক্ষে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন।
সকাল তখন নটা। পাহাড়ের অন্ধকার রাজ্য পার হয়ে একটা সমতলভূমিতে আমরা এখন এসে পৌঁছেছি। এখানে লোকজন, বাড়িঘর, ঘোড়ায় টানা টাঙা সবই আছে। হোটেল আছে কিনা ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে একজনকে জিগ্যেস করতেই সে একজন চ্যাপটা মুখ, হলদে রঙের ছোকরার হাতে আমাদের তুলে দিল। ছেলেটার শুধু চ্যাপটা মুখই নয়, মুখের তুলনায় বড়ো বড়ো কান। হাসলে মুখটা হাঁ হয়ে প্রায় কানের লতি ছোঁয় আর কি। দেখলে ভয় করে। মোঙ্গল নাকি?
এটা হোটেল?
ছোকরাটি উত্তর না দিয়ে মাথা দুলিয়ে সায় দিল।
তুমি এখানে কাজ কর?
ছোকরাটি আবার নিঃশব্দে সায় দিল।
এখানে দু-একটা দিন থাকা যাবে?
শুধু মাথা দুলিয়ে এবারও জানাল, হ্যাঁ।
হোটেলটি পুরনো। একতলা বাড়ি। দূরে পাহাড়ের শ্রেণি। ঐ সব পাহাড়ের কোনগুলির মধ্যে দিয়ে কাল সারা রাত্রি হেঁটেছি এখান থেকে তা অনুমান করার সাধ্য নেই।
ভেতরে ঢুকতেই কাজের লোকদের গলা পাওয়া গেল। সেই সঙ্গে রান্নার সুগন্ধ। মনটা শান্ত হয়ে হল। মনে হল কত দিন এরকম ব্যস্তসমস্ত মানুষের গলা শোনা যায়নি। যদিও তাদের ভাষা আমাদের কাছে অজানা।
এরপর পীত বর্ণের কারুকার্য করা পর্দা সরিয়ে যে ঘরে আমাদের আনা হল সে ঘরটি বেশ সাজানো। দেওয়ালে দেওয়ালে চিনদেশীয় ছবি। ছবিগুলির মধ্যে অনেকগুলি পাহাড় পর্বতের। মাঝখানের ছবিটি ধ্যানস্থ বুদ্ধদেবের। একটা সাধারণ কার্পেটের ওপর পুরু ভেড়ার লোমে ঢাকা আরামকেদারায় দুপা গুটিয়ে শুয়ে শুয়ে দীর্ঘ সট্রা ঠোঁটে চেপে যে বৃদ্ধটি ভুরুক ভুরুক করে গড়গড়া টানছিলেন তাঁকে দেখে আমরা দুই বন্ধু যতটা অবাক হয়েছিলাম তার থেকে ঢের বেশি স্তম্ভিত হয়েছিলেন সামভোতা।
চিনদেশীয় বৃদ্ধটি এতই বৃদ্ধ যে তার বয়েস অনুমান করা যায় না। এই বয়েসে মুখের চামড়া হাতের মুঠোয় মোড়া কাগজের মতো অজস্র ভঁজে কুঁকড়ে গেছে। তা হলেও ফর্সা মুখখানায় লালচে আভা। থুতনির কাছে কয়েক গাছা পাকা দাড়ি। মাথায় চিন দেশের ধর্মগুরুদের মতো টুপি। মুখে স্নিগ্ধ হাসি।
ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে কথাগুলি বললেন তা কলকাতার চিনেপট্টির চৈনিকদের মুখে বাংলা ভাষার মতো। স্বচ্ছন্দ নয়, দুর্বোধ্যও নয়। থুমি সামভোতা হঠাৎ কেন যে কার্পেটের ওপর নতজানু হয়ে বৃদ্ধ চিনাটিকে শ্রদ্ধা জানালেন বুঝতে পারলাম না। দেখাদেখি আমাদেরও ঐভাবে নত হতে হল। একজন হোটেলের মালিককে এতখানি শ্রদ্ধা জানাবার কারণ প্রথমে বুঝতে পারিনি। একটু পরেই বুঝলাম।
