শুনতে শুনতে আমরা অনেক দূর চলে এসেছিলাম। হঠাৎ মনে হল আমাদের দলটা যেন হাল্কা হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সামভোতা টর্চ জ্বেলে সঙ্গীদের হিসেব নিয়ে নিলেন। জিগমে নেই। চমকে উঠে বার বার তার নাম ধরে ডাকা হল। কিন্তু সাড়া পাওয়া গেল না।
হয় তো অন্ধকারে অন্যমনস্ক ভাবে চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেলেছে।
আমি কতকটা নিজের মনেই বলে উঠলাম, আচ্ছা সেই কংকালের গুহা থেকে আমরা যখন সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসি তখন ও-ও বেরিয়ে আসতে পেরেছিল তো?
এর উত্তরে আমরা শুধু নিঃশব্দে মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করেছি। উত্তর দিতে পারিনি।
.
আঁধারে প্রদীপ জ্বলে
জিগমের কথা মনে করে আমরা সকলেই এমন ভারাক্রান্ত হয়ে আছি যে হাঁটার ক্লান্তিকে ক্লান্তি বলেই মনে হচ্ছে না। কতকগুলো যান্ত্রিক মানুষ যেন দম দেওয়া পুতুলের মতো এগিয়ে চলেছে দুর্ভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে। অথচ কোন নিরুদ্দেশের পথে, কোন মৃত্যুপুরীর ঠিকানায় চলেছি তার ধারণাটুকুও নেই।
হঠাৎ ডান দিকের পাহাড়ের গাছগুলো কেঁপে উঠল। আমরা চমকে উঠলাম। আবার কি সেই মনুষ্যাকৃতি লোমশ জন্তুটা–হ্যাঁ, তাই।
বেঁটেখাটো একটা প্রাণী অন্য একটা গাছে লাফিয়ে পড়ে তার ডাল ধরে ঝুলতে লাগল। আমরা ভয়ে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু তারপর যা ঘটল–
সামভোতা হঠাৎ টর্চ-এর আলো ফেললেন জীবটার দিকে। চমকে উঠলাম। মনুষ্যাকৃতি একটা বামন। লোমে ভরা তার ছোট্ট দেহটা। বীভৎস তার মুখ। ক্রোধে ঝকঝক করছে চোখ দুটো। দেহের তুলনায় হলদে দাঁতগুলো বড় বড়ো। সেই দাঁতে চেপে আছে একটা ছোরা। আশ্চর্যের বিষয় তার মাথাটা ঠিক ঘাড়ের ওপর নেই। কাঁধের পাশে লেগে রয়েছে।
মুখের ওপর আলো পড়তেই ও মুখটা আরও ভয়ংকর করে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ল আমাদের সেই পাহাড়ি রাস্তার ওপর। তারপর দুহাত দোলাতে দোলাতে গুটগুট করে আমাদের সামনে সামনে এগিয়ে চলল। কাটা মাথাটা কাঁধের ওপর দুলতে লাগল।
গভীর রাতে নির্জন পাহাড়ি পথে এমন একজন বামনকে দুহাত দুলিয়ে বীরবিক্রমে হাঁটতে দেখব কল্পনা করিনি। এই কি জিগমের ভাষায় সেই থি?
কে উত্তর দেবে?
অল্পক্ষণের মধ্যেই বামনটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
তারপর আরও কিছুক্ষণ হাঁটা–কিছুক্ষণ পথের ধারে পাথরের ওপর বসে বিশ্রাম। আবার চলা। আশ্চর্য, কেউ কোনো কথা বলছে না। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন আমাদের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়েছে। অবশ্য কী কথাই বা বলা যাবে? এ তো বেড়াতে যাওয়া নয়? সবাই নিজের মতো করে রহস্যের সমাধান করার চেষ্টা করছি। জিগমের কথা ছাড়াও আমার ভাবনা হচ্ছিল আমাদের ড্রাইভারকে নিয়ে। সে এই ভয়ানক জায়গায় একা গাড়ি নিয়ে কোথায় কত দূরে পড়ে আছে কে জানে!
হঠাৎ সামভোতা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। টর্চের আলো এদিক-ওদিক ফেললেন।
ইস! একী!
রাস্তার দুপাশে কংকালের পর কংকাল পড়ে আছে। তাদের কোনোটারই মাথা নেই।
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে সামভোতা চাপা গলায় বলেছিলেন, সাবধান! আর এগিয়ো না। ঐ দ্যাখো।
সবাই দেখলাম। না, চোখের ভুল নয়। স্পষ্ট দেখলাম, পাহাড়ি যে রাস্তা দিয়ে আমরা এতক্ষণ হাঁটছিলাম সেই রাস্তাটা যেখানে অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তায় এসে মিশে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে তারই কিছুদূরে কয়েক জন একটা কফিন কাঁধে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তাদের একহাতে ভোলা তরোয়াল। শুধু চারজন শববাহকই নয়, তাদের সামনে-পিছনে জনা দশেক লোক নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যেকের হাতে বর্শা।
এত রাতে এই অন্ধকার নির্জন পথে ওরা কারা? কফিনে করে কার শব নিয়ে যেন অতি গোপনে অতি সন্ত্রস্তভাবে এগিয়ে চলেছে। আরও খানিক দূর এগিয়ে শবযাত্রীর দল হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সামভোতা আমাদের একটা বড় পাথরের আড়ালে বসে পড়তে ইশারা করলেন। আমরা তার নির্দেশ পালন করলাম।
অভিজ্ঞ সামভোতা ঠিকই বুঝেছিলেন শবযাত্রীর দল এবার একবার পিছন ফিরে তাকাবেই। তাকালও। বোধহয় দেখতে চাইল কেউ তাদের দেখছে কিনা।
তারপর তারা পথ ছেড়ে ডান দিকের গভীর জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল। রাতচরা একটা মস্ত শেয়াল জাতীয় পশু এত লোকজন দেখে ভয় পেয়ে ছুটে পালাচ্ছিল, শববাহী দলের সামনে যারা ছিল তাদেরই একজনের হাতের বর্শায় নিরপরাধ পশুটা দুবার ঘুরেই পড়ে গেল। শববাহীর দল খুব গোপনে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দশ-পনেরো মিনিট পরে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। তারপর ফের এগিয়ে যাওয়া। আমার দুঃসাহসী বন্ধুটির ভাষায় যতই চোখের ভুল হোক না কেন, তবু আমরা, যেখান থেকে শববাহীর দল ডান দিকের জঙ্গলের পথ ধরেছিল সাবধানতার জন্যে সেই পথটুকু ছেড়ে দিয়ে একটু ঘুরপথ ধরে এসে আবার সেই অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তা ধরলাম।
একটার পর একটা ঘটনায় আমরা বিমূঢ়, শ্রান্ত। আমাদের ব্রেন যেন আর কাজ করতে চাইছে না। রাত কটা বেজেছে? নিজের হাতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না। কী হবে কপ্রহর রাত হয়েছে জেনে? এ রাত কি কোনোদিন সূর্যের মুখ দেখবে? এ পথ কি কোনোদিন ফুরোবে?
এর পরেই আবার একটি আকস্মিক ব্যাপার!
সূর্যের মুখ কবে দেখতে পাব বা কোনোদিনই দেখতে পাব কিনা জানা না থাকলেও কিছু দূরে সেই জনমানবশূন্য অন্ধকার পথে হঠাৎ একটা বিন্দুর মতো আলো দেখা গেল।
