সামভোতার মতো এক প্রবীণ ঋষিতুল্য তিব্বতী মানুষ কখন যেন আমাদের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে তিনিই এগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। টর্চের আলো ফেলে ফেলে পথ দেখে নিচ্ছেন।
সহজ হবার জন্যে একসময়ে তিনি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, তুমি তো বেশ সাহসী ছেলে। দিব্যি একটা ঘাড়-মটকানো কংকালের গায়ে গা লাগিয়ে সময় কাটাচ্ছিলে।
সাহস আর কী স্যার, আমি যদি জানতাম গায়ের কাছে আস্ত একটা কংকাল ঝুলছে তাহলে কি ওখানে দাঁড়াতাম। তবে লোকটা কোনো এক কালে খুন হয়েছিল এ কথা ভাবতেও কষ্ট হয়। হয়তো লোকটা নিরপরাধ ছিল। তবে যদি খুনটা ভূতে করে থাকে তাহলে বলার কিছু নেই।
সামভোতা বললেন, আমার দেশে তিব্বতে প্রেতচর্চা চলে নিষ্ঠার সঙ্গে। অনেক প্রাচীন পুঁথিপত্র ঘাঁটা হয়। এইসব আলোচনাচক্রে আমিও বহুদিন ছিলাম। একটা সত্য জেনেছি ভূত মাত্রই মানুষের ক্ষতি করে না। অকারণে মানুষ মারে না। কিন্তু সে নিজে যদি অত্যাচারিত হয়ে খুন হয়ে থাকে তাহলে সে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করে। চেঙ্গিস খান কতখানি নিষ্ঠুর ছিলেন প্রাচীন পুঁথিপত্র তার সাক্ষ্য দেয়। তার নিজের হাতে বা তার ফৌজের হাতে কত নিরীহ মানুষ খুন হয়েছে তার হিসেব নেই। সেইসব ক্ষুব্ধ প্রেতাত্মা যদি তার বা তার পরিজনদের ওপর প্রতিশোধ নেয় তাহলে বলার কিছু নেই। এ কথা তিনিও বুঝতেন। তাই তিনি কী করলে মঙ্গল হবে, কী করে ফেললে ক্ষতি হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্যে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার ওপর নির্ভর না করে শামান, ওঝা, বৈদ্য, ফকিরদের ডাকতেন।
একবার তার খেয়াল হল চুলে পাক ধরেছে। চুল পেকে যাওয়াটাকে তিনি খুব ভয় পেতেন। মনে হত এবার বৃদ্ধ হয়ে পড়বেন, তারপরেই মৃত্যু।
মৃত্যু ব্যাপারটা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। অথচ সব মানুষকেই নাকি মরতে হবে–এ তো বড় অদ্ভুত কথা। যদিও তাঁর উপযুক্ত ছেলে ছিল জাগাতাই, পৌত্র ছিল মুতুগান–যে মুতুগানই ঠিক হয়েছিল সমস্ত মুসলিম দুনিয়ার ভাবী খাই-খানা, তবু তার হাতে গড়া বিরাট সাম্রাজ্য।
বাধা দিয়ে বিভাস জিগ্যেস করল, তার সাম্রাজ্য কতদূর পর্যন্ত ছিল?
তা ধরো উত্তরে সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে জর্জিয়া আর পুবে চিন থেকে পশ্চিমে রাশিয়া।
বাবাঃ! এ তো বিশাল সাম্রাজ্য!
হ্যাঁ, তাই। আর একটার পর একটা রাজ্য জয় করেছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজে সৈন্য পরিচালনা করে। তাঁর দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী সৈন্য ছিল শত্রুদের ত্রাস। যেমন ধরো এ যুগে য়ুরোপ-কাঁপানো হিটলারের ট্যাঙ্ক বাহিনী। আর তার সেই বিশাল সাম্রাজ্য ভেবে রেখেছিলেন তিনিই শাসন করে যাবেন চিরকাল ধরে।মৃত্যু বলে ব্যাপারটা কোনোরকমেই বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
মন্ত্রীদের, পণ্ডিতদের তো মাথায় হাত। এই পৃথিবীতে জীবজন্তু তরুলতা মানুষ কেউই অমর নয়। অমর হওয়া সম্ভব নয়।
চেঙ্গিস খান শোনবার পাত্র নন। তাঁকে অমর হতেই হবে। তাও বিছানায় পড়ে থেকে নয়। রীতিমতো শাসনদণ্ড হাতে নিয়ে। তখন তিনি তার বিশাল সাম্রাজ্যের যত নামকরা বৈদ্য, ওঝা, কবিরাজ, হেকিমদের ডেকে পাঠালেন। এমন কিছু ওষুধ তৈরি করো যাতে অমর হওয়া যায়।
এই অসম্ভব আদেশ শুনে তাদের তো থুতনি ঝুলে গেল। এ কী করে সম্ভব?
চেঙ্গিস খান কোনো কথা শুনতে চান না। সাত দিন সময় দিলেন। সাত দিনের মধ্যে তার ওষুধ চাইই।
নির্দিষ্ট দিনে চারজন বৈদ্য অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পানীয় নিয়ে হাজির হলেন। সন্দিগ্ধস্বভাব, অবিশ্বাসী খান মুখে পাথরের ফাটলের মতো সরু হাসি হাসলেন। বললেন, যাক, তোমরা তাহলে দাওয়াই তৈরি করতে পেরেছ?
চারজনেই বলল, আজ্ঞে হাঁ সম্রাট।
বেশ তা হলে তো তোমাদের পুরস্কৃত করা উচিত।
আজ্ঞে সে আপনার মর্জি।
তখন তিনি ঐ সব বৈদ্যদের যার যার নিজের আবিষ্কৃত দাওয়াই পান করার হুকুম দিলেন। তার পরদিন তিনি তাদের বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে নিজে হাতে শিরোচ্ছেদ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ করতে থাকেন তারা সত্যিই মরে গেছে কিনা।
তারা কেউ বেঁচে ওঠেনি। তাই দেখে চেঙ্গিস খান মনে মনে গর্জে উঠেছিলেন–দুনিয়ার সবাই তাকে ঠকাতে চায়। সবাই শক্ত।
শেষে তার প্রধান অমাত্য ও জ্যোতিষী ইয়েলিও-এর পরামর্শে চিন দেশের শ্রেষ্ঠ গুণী মহাস্থবির চানচুকে সাদরে তার রাজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি ত্রিকালদর্শী মহাসাধক। তিনি ধ্যান করেন কখনও মৃতদেহের মতো নিশ্চল হয়ে বসে; কখনও সারাদিন গাছের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়েই থাকেন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন। বহু প্রাচীন পুঁথি পড়েছেন। তিনি বহু কষ্টে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে এলেন। তিনিই চেঙ্গিস খানকে বোঝাতে পেরেছিলেন, এ জগতে কেউ অমর হতে পারে না।
তারপর সামভোতা পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে বললেন, নিরপরাধ মানুষকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ না দিয়েই খেয়ালের বশে তিনি কতজনের প্রাণ সংহার করেছেন। এইসব ক্ষুব্ধ আত্মা সুযোগ পেলে কি সম্রাটের ক্ষতি করবে না?
ক্ষতি কি চেঙ্গিস খানেরও হয়নি? বালতান দুর্গের লড়াইয়ে শত্রুপক্ষের ছোঁড়া বর্শার আকারের এক বিশাল তীর এসে বেঁধে চেঙ্গির খানের বড়ো আদরের পৌত্র মুতুগানের বুকে। তাতেই সে শেযশয্যা গ্রহণ করেছিল। বেদনাহত, ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ চেঙ্গিস তখনই গণৎকারদের ডেকে এনে এত বড়ো দুর্ঘটনার কারণ জিগ্যেস করলেন। কিন্তু কেউ সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। শুধু একজন বৃদ্ধ গণৎকারই বলেছিল, এটা কোনো ক্ষুব্ধ আত্মার প্রতিহিংসা।…..
