তারপরই শুরু হল বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি। এই ভয়টাই করছিলাম আমরা। একটু আশ্রয়ের জন্যে সামভোতা টর্চের আলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফেলতে লাগলেন।
চলো ঐ দিকে। ঐ পাহাড়টার নীচে। মনে হচ্ছে ওখানে মাথা গোঁজা যাবে।
ছুটতে ছুটতে আমরা পাহাড়টার নীচে এসে পৌঁছলাম। পাহাড়ের এই অংশ ছাদের মতো খানিকটা বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ভিতরটা ফাঁকা। এখানে চারজনে ঘেঁষাঘেঁষি করে কোনোরকমে দাঁড়াতে পারব। সামভোতা টর্চের আলো ফেলে চারিপাশটা একবার দেখে নিলেন। গুহাটার চারিপাশে বুনো লতাপাতার ঝোপ। সাপখোপ চোখে পড়ল না। চোখে না পড়লেও আড়াল থেকে একটি নিঃশব্দ ছোবল হানতে কতক্ষণ। কিন্তু ভেবে লাভ কী?
জোর বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির সময় কলকাতার রাস্তায় পথ চলতে চলতে আমরা যেমন ছুটে গাড়িবারান্দার নীচে আশ্রয় নিয়ে হাঁট থেকে রেহাই পাবার জন্যে কেবল পিহোতেই থাকি, তেমনি এই সংকীর্ণ গুহায় ঢুকেই বুদ্ধিমানের মতো যতটা সম্ভব পিছিয়ে একেবারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। এমন জায়গায় নিশ্চিন্ত হয়ে দাঁড়ালাম যে বৃষ্টির ছাঁট লাগা তো দূরের কথা, বাইরে যে শীতল প্রবাহ বইছে তার থেকেও রক্ষা পেয়ে যাচ্ছি।
সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, আমি তখন উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলাম, বসবার জায়গা যদি থাকত তাহলে এখানে বসেই বাকি রাতটুকু নিরাপদে কাটানো যেত।
বিভাস দাবড়ে উঠে বলল, রাতটুকু মানে? এখন কটা বেজেছে জান?
কটা?
স্যার, টর্চটা একবার জ্বালুন তো।
টর্চটা জ্বেলেই সামভোতা বললেন, দশটা পনেরো মিনিট।
মাত্র দশটা। আমি মুষড়ে পড়লাম, তা হলে তো বৃষ্টি থামলেই আবার হাঁটতে হবে। তাও যদি জানা একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকত! আচ্ছা, আমরা কোথায় চলেছি? তিব্বতী সন্ন্যাসী তো বলছিলেন কোন একটা বহু প্রাচীন রাস্তার খোঁজ করছেন। সে রাস্তা নাকি ভয়ংকর! আচ্ছা, পাগল না হলে কেউ এইরকম পাহাড়ে-পর্বতে ঐরকম ভয়ংকর রাস্তা খুঁজে বেড়ায়? সে রাস্তাটা খুঁজে পেলে নাকি একটা ঐতিহাসিক আবিষ্কার হবে। কী জানি! ওসব ব্যাপার বুঝি না।
আর আমরা কোথায় যাচ্ছি? গন্তব্যস্থল ছিল লাদাখের রাজধানী লে। কিন্তু গাড়ি খারাপ হয়ে যাবার পর ভুল রাস্তায় পড়ে এখন যে কোথায় এসে পড়েছি তার ঠিক নেই। তাই ঠিক করা গেছে যতটা সম্ভব পাহাড়ের পথ ধরে এগিয়ে যাব। তারপর? পথের শেষ কোথায় কে জানে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ভারী হয়ে যাওয়ায় পাথরের গায়ে হেলান দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলাম। যে জিনিসটা আমার গায়ে ঠেকল সেটা কিছুতেই পাহাড়ের খসখসে পাথর নয়, অন্য কিছু। শরীর বাঁকানো দূরের কথা, জায়গাটা এত সংকীর্ণ যে ঘাড় ফেরানোও কষ্টকর। সেই অন্যকিছুটা যে গুহা-ভেদ-করে-ওঠা কোনো গাছ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না তা জানতাম, তবু ঘাড় না ফিরিয়ে দু হাত দিয়ে জিনিসটা কী বোঝবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলাম না। গাছ নয়, এটা ঠিক। তাহলে? হাত বোলাতে বোলাতে মাঝে মাঝে ফাঁকে ফাঁকে আঙুল ঢুকে যাচ্ছিল। সেইভাবেই দুটো হাত আরও একটু উপরে তুললাম। গোলমতো একটা কিছু হাতে ঠেকল। একটা ফুটোর মধ্যে দুটো আঙুল ঢুকে গেল স্বচ্ছন্দে। জিনিসটা যেন একটু নড়ে উঠল। তার পর….তার পর দুটো সরু সরু গাছের ডালের মতো কিছু যেন আমার গলার চামড়া ছুঁল। আমি শিউরে উঠলাম। হাঁকপাক করে বললাম, স্যার, একবার টর্চটা জালুন তো।
আমার গলার স্বরে নিশ্চয় ভয় ফুটে উঠেছিল তাই সাপটাপ ভেবে উনি চমকে উঠে টর্চটা জ্বাললেন।
অন্ধকার ঘুটঘুঁটে সেই গুহার কিছুটা অংশ আলোকিত হল। সেই আলোতেই দেখলাম।
দেখলাম যেটার গায়ে হেলান দিয়ে এতক্ষণ নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা একটি নরকংকাল। ঘাড়টা কাত হয়ে বুকের কাছে ঝুলছে। যে হাত দুটো উঠে আমার গলার দিকে এগিয়েছিল, এখন সেই হাড্ডিসার হাত দুটো তারই রক্তমাংসশূন্য গায়ের পাশে হাওয়ায় দুলছে। আর
আর দেখা গেল কবেকার সেই কংকালটি লতাপাতায় শক্ত করে বাঁধা। সেটি ঝুলছে গুহার ছাদের উপর থেকে।
তারপর কী করে যে সবাইকে ঠেলে দুই লাফে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম তা আমিই জানি।
আবার হাঁটা শুরু হয়েছে। কারও মুখে কথাটি নেই। আমার গা-টা কেমন ঘিন ঘিন করছে। কবেকার একটা কংকাল….
কিন্তু অন্ধকার গুহার মধ্যে মরল কী করে? আমাদের মধ্যে কেউ বলছে নির্জন জায়গা পছন্দ করে দড়ির অভাবে লতাপাতা জড়িয়ে ঝুলে মরেছে। কেউ বলছে খুন করে গুহার ভেতর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিভাস প্রতিবাদ করে বলল, খুনটুন বাজে কথা। এখানে কে কাকে খুন করবে? খুন হয়েছে তার প্রমাণও নেই।
আমি বললাম, খুলিটা দেখেছিলে? কাঁধের উপর লটকে পড়েছিল না? আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি ও বেচারিকে ঘাড় মটকে মারা হয়েছে। তারপর শক্ত লতা দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মারলটা কে?
এবার সামভোতা বললেন, ও তর্ক করে লাভ নেই। টর্চের আলোর যতটুকু লক্ষ করেছি তাতে বুঝেছি কংকালটা ঝুলে আছে বহুদিন। কংকালের গায়ে ছাতলা পড়ে গেছে। চটা উঠে গেছে।
এরপর কেউ আর কোনো কথা বলল না। কথা বলতে বলতে হাঁটলে ভয় থেকে দূরে থাকা যায়। কিন্তু কেউ কথা না বললে একা একা কি কথা বলা যায়? ফলে নিজেদের জুতোর শব্দ শুনে অন্তত আমি চমকে উঠছিলাম–কেউ পিছনে আসছে না তো?
