তবে চেঙ্গিস খানের স্ত্রী অশুভ আত্মায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার প্রমাণ পুঁথিপত্রে পেয়েছি। একবার চেঙ্গিস খান পর্বতে বাস করছিলেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী কুলান খাতুন আর চেঙ্গিসের শিশুপুত্র কুলকানও ছিলেন। তারা দুজনেই অসুস্থ হয়ে রেশমী গদির ওপর পশুলোমের চাদর জড়িয়ে শুয়ে জ্বরের ঘোরে ছটফট করছিলেন। সেই পার্বত্য অঞ্চলে যতটুকু সম্ভব চেঙ্গিস খান চিকিৎসার ত্রুটি করেননি। কিন্তু রোগ সারার কোনো লক্ষণ নেই। হতাশ কুলান খাতুন কাঁদতে কাঁদতে স্বামীকে বললেন, যেভাবে আমার চিকিৎসা করছ, তা যতই যত্ন নিয়ে হোক, তবু আমরা সেরে উঠব না। এ হল এখানকার পাহাড়ি ভূত-প্রেতের কাণ্ড। এই অভিশপ্ত জায়গায় যে থাকবে ওনারা তাকেই কষ্ট দেবেন।
একটু থেমে বললেন, খাদের তলা থেকে কেমন কুয়াশা ওঠে দেখেছ? তোমার নিজের এবং তোমার ফৌজের হাতে যে সব কচি বাচ্চার প্রাণ গেছে এ হল তাদেরই আত্মা। আমি আর ছোট্ট কুলকান এখানেই মারা যাব। বাঁচাতে গেলে নিজের দেশ মোঙ্গলস্তেপে আমাদের ফিরে যেতে দাও।
চেঙ্গিস খান রেগে উঠেছিলেন। বলেছিলেন, এখান থেকে অন্য কোথাও যাবার কথা মুখে আনবে না। আমাকে আগে দুনিয়ার বাকি অর্ধেকটা জয় করতে হবে। তারপর অন্য কথা।
কুলান খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, একটার পর একটা রাজ্য জয় করে, নিরাপরাধদের রক্তে হাত রাঙিয়ে আর কত গুনাহ বাড়িয়ে তুলবে? তানগুত-সম্রাট বুখানের বিকলাঙ্গ ছেলেটাকে তুমি কী নির্মমভাবে খুন করেছিলে সে কথা তো ভুলে যাওনি?
হু! বিকলাঙ্গ হলে কি হবে, ও ব্যাটা ছিল সাক্ষাৎ শয়তানের বাচ্চা। যে আমাকে মারবার চেষ্টা করবে তাকে আমিই আগে শেষ করে দেব। এটাই আমার নীতি।
তা কি তুমি পারতে যদি না তোমার অনুগত পদলেহী কিছু সাধারণ মানুষ মিথ্যের ফাঁদ পেতে বিশ্বাসঘাতকতা করে ওকে তোমার তরোয়ালের মুখে ঠেলে দিত?
সামভোতা আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন হঠাৎ পাহাড়ের নিচু অংশের শালগাছগুলোর মধ্যে একটা ঝোড়ো হাওয়া উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে কী একটা ভারী বস্তু বিকট শব্দ করে পাশের পাহাড়ের গাছগুলোর ওপর লাফিয়ে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে সামভোতা টর্চের বোতাম টিপলেন। এদিক-ওদিক আলো ফেললেন। তারপর বললেন, ও কিছু না, বাঁদর। এখানকার পাহাড়ে পাহাড়ে বাঁদররা রাতে লাফালাফি করে।
কিন্তু স্যার, হঠাৎ বলে উঠল জিগমে, টর্চের আলোয় আমি যে দেখলাম বাঁদর নয়। অন্য কিছু। বাঁদরের তো ল্যাজ থাকবে।
অন্য কিছু! চমকে উঠলাম আমরা তিনজনেই।
ঠিকঠাক বলো তো বাছা, অন্য কিছু বলতে কী বোঝাচ্ছ?
একটা বড়োসড়ো মোটাসোটা কালো ল্যাড়কা। ল্যাড়কা–কিন্তু গায়ে লোম। হ্যাঁ, আর যেন মনে হল তার মাথাটাই নেই।
.
অন্ধকার গুহায় কিছুক্ষণ
দুর্ভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আমরা জনমানবশূন্য পথে হেঁটে চলেছি। কোথায় কোনদিকে যাচ্ছি কিছুই জানি না। পাঁচ-দশ মিনিট অন্তর আমরা প্রত্যেকেই হোঁচট খাচ্ছি। টর্চ থাকায় অবশ্য পাহাড়ি রাস্তায় সামান্য এক চিলতে পায়ে চলা পথের সন্ধান পাচ্ছি–এইটুকুই রক্ষে। শুধু চলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সামভোতা বলতে চান রাতের মতো একটা মাথা গোঁজার জায়গা চাই-ই। আকাশে মেঘের ঘনঘটা–বিদ্যুতের চমকানি। পাহাড় কাঁপিয়ে গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে। এ যেন প্রলয়ের পূর্বাভাস! বৃষ্টি নামল বলে। তা হলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে হবে। এই প্রবল শীতে বৃষ্টিতে ভিজলে, তারপর ভিজে জামা-প্যান্ট পরে রাত কাটালে মৃত্যুর ঘণ্টা বাজবেই।
আমার মাথায় তখনও ঘুরছিল সেই অন্যকিছু বস্তুটার কথা। সামলোমশাই বললেন, পাহাড়ি বাঁদর। বেশ কথা। তার না হয় একটা মানে আছে। কিন্তু হতভাগাটা যা বলল সে তো অদ্ভুত কথা। একটা জলজ্যান্ত ল্যাড়কা অর্থাৎ ছেলেমানুষ-বড়োসড়ো খোকা, মোটাসোটা, গায়ে লোম, আবার নাকি মাথাটাই নেই!–সে বস্তুটি কী?
টর্চের আলোয় চকিতের মধ্যে এমন বস্তুটি শুধু শ্রীমান জিগমের চোখেই পড়ল, আর কারও নয়!
আশ্চর্য, কারও মনে কোনোরকম খটকাই বাধল না? সন্ন্যাসীজি তো চুপ করেই গেলেন। মুখে যেন রুমাল গুঁজে আছেন।
আমি নিচু গলায় বিভাসকে জিগ্যেস করলাম, খোকাটিকে কী মনে হল শুনে?
তৎক্ষণাৎ বলল, নাথিং। স্রেফ ইলিউশন! চোখের ভুল!
ব্যস! তাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়েই গেল। এদিকে জিগমে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে যেন ভয় পেয়ে আমাদের মাঝখানে থাকতে চাইছে। তবু এক এক সময় দলছুট হয়ে যাচ্ছে। একে গাঢ় অন্ধকার। তার ওপর কালো রঙ। মনে হল অন্ধকারে বুঝি মিশেই গেল।
জিগমে! স্তব্ধতা খান খান করে আমরা হাঁক দিই। দেখা তো নেই, সাড়াও নেই। তারপরই হঠাৎ ও যেন মাটি খুঁড়ে ওঠে।
কী বলছ?
কোথায় গিয়েছিলি?
ঐ যে কে একজন ডাকল আমায় ঐ পাহাড়টার দিকে …
কে ডাকল? আমরা তো ডাকিনি।
নির্লিপ্ত স্বরে বলল, তা হলে … কি জানি।
সামভোতা বললেন, ঐ পাহাড়ের পাশে খাদ আছে। শেষ হয়ে যেতে। খবরদার, স্বয়ং চেঙ্গিস খান ডাকলেও আমাদের কাছ থেকে কোথাও যাবে না। মালুম?
ও সুবোধ বালকের মতো উত্তর দিল, জি হাঁ।
তবু সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বোঝাতে চাইল ইচ্ছে করে সে ওদিকে যায়নি। কেউ ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।
মরুক গে। এসব অদ্ভুত কথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।
কড়কড়কড়াৎ করে হঠাৎ বাজ পড়ল। বিদ্যুতের চোখ ধাঁধানো ঝিলিক ছুটে গেল সামনের পাহাড়টার দিকে। একটা দেবদারু গাছের মাথা জ্বলে উঠল। কতকগুলো পাথর গড়িয়ে পড়ল খাদের নীচে। পাহাড়ে এমন বজ্রপাত এই প্রথম দেখলাম।
