সামভোতা পঁধের ঝুলি থেকে টর্চ বার করলেন। নতুন তেজি ব্যাটারি। বোতাম টিপতেই আলোর ছটা অনেক দূর গিয়ে পড়ল। কিন্তু তাতে মোটেই উৎসাহ পেলাম না। সামনে শুধুই কালো কালো পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে বিরাট বিরাট গাছ যেন পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
হতচ্ছাড়া বিভাসের দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা বলে ব্যাপারগুলোই নেই। এই প্রবল ঠান্ডায় অন্ধকার অজানা বিপদসংকুল পথে চলতে চলতে যখন ভয়ে আমার বুক কাঁপছে তখন ও কিনা সামভোতাকে সোজাসুজি বললে, এটাই কিন্তু স্যার, সবচেয়ে ভালো পরিবেশ যখন পথের ক্লান্তি ভোলার একমাত্র উপায় ভূতের গল্প শোনা।
রাগে আমার শিরাগুলো দপদপ করতে লাগল। ইচ্ছে করল সকলের সামনেই বিভাসটার কান দুটো আচ্ছা করে মুলে দিই। বিন্দুমাত্র কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কি কেউ এই দুঃসময়ে দুর্গম পথে ভূতের গল্প শুনতে চায়? কয়েক ঘণ্টা আগে ঘোড়ার খুরের শব্দর কথা কি ভুলে গেছে? সত্যিই তারা অশরীরী কিনা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি ঠিকই, তবু পাহাড়ের পর পাহাড়ের রাজ্যে এতগুলো ঘোড়া ছোটা কি বাস্তবে সম্ভব? কোন যুগের কোন দেশের কোন রাজা কোন রাজ্য দখল করতে ছুটল কে বলতে পারে? তা ছাড়া এ যুগে অশ্বারোহী সৈন্য পাঠিয়ে রাজ্য জয়ের কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। এই অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার দেখার পরও এখন আবার ভূতপ্রেতদের ডাকা কেন?
সামভোতা কিন্তু একটুকুও বিরক্ত হলেন না। বললেন, তোমার সাহস দেখে আমি খুশি হচ্ছি। কিন্তু তিব্বতের মতো জায়গায় বাস করেও ভূতের ঘটনা বিশেষ জানি না। বরঞ্চ তুমি কিছু বলো।
বিভাস বললে, দূর! কলকাতায় ভূতটুত নেই। কাজেই ভূতের গল্প আমি জানি না। আমার প্রশ্ন–চেঙ্গিস খানের মতো ভয়ংকর নেতা ভূতটুত কি মানতেন? সে তো আজকের ব্যাপার নয়, প্রায় আটশো বছর আগের কথা। তখন ভূত-প্রেতরা বেশ জাঁকিয়েই রাজত্ব করে গেছে। তাই না?
সামভোতা এ কথার উত্তর না দিয়ে হয়তো নিছক সময় কাটাবার জন্যেই বললেন, আমি চেঙ্গিস খানের ওপর নানা ইতিহাসবিদের নানা বই পড়েছি। চেঙ্গিস খান যে কখনও ভূতের মুখোমুখি হয়েছিলেন এমন কথা পড়িনি। তবে উনি সংস্কার, গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব মানতেন, কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটলে তার কারণ না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পেতেন না। আর এই কারণ খোঁজবার জন্যে নিজের বুদ্ধি, বোধশক্তি, বিচার-শক্তি খাটাতেন না। বৈজ্ঞানিক চিন্তার কোন ব্যাপারই ছিল না। কারণ জানার জন্যে তাঁর সাম্রাজ্যের সব বড়ো বড়ো গণৎকার, জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠাতেন।
একবার শিকারে বেরিয়ে একটা বন্য বরাহর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে তার ঘোড়া হোঁচট খায়। খান মাটিতে পড়ে যান। ঘোড়া ছুটে পালায়। বরাহটি খানের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু খানের কোনো ক্ষতি না করে ধীরে ধীরে নলখাগড়ার বনে চলে যায়। নির্ঘাৎ মৃত্যুর হাত থেকে এই বেঁচে যাওয়াতেও দুশ্চিন্তায় তাঁর ঘুম হল না। মনের ভেতর ঘোরাফেরা করতে লাগল একটাই কথা–কে তাকে বাঁচাল? এতে অমর-লোকের কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা।
এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্যে তার অধিকৃত চিনের উত্তর ভাগ থেকে ঐ দেশের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী চানচুকে ডেকে আনালেন। সব শুনে সেই চৈনিক শাস্ত্রজ্ঞানী শুধু এই কথাই বলেছিলেন যে, মহামান্য খানের অনেক বয়স হয়েছে। স্বর্গীয় নির্দেশ–তিনি যেন শিকার করাটা এখন কমান।
চেঙ্গিস খান এ কথায় সন্তুষ্ট হননি। কারণ শিকারে যাওয়া তিনি বন্ধ করতে পারবেন না।
সুদূর চিন থেকে সহস্র লি [চিনা ভাষায় দূরত্বের পরিমাপ ও এক লি = প্রায় ২ কিলোমিটার।] পথ অতিক্রম করে আসা এই মহাজ্ঞানী তাপস চানচুকে কাছে পেয়ে খান আরও জিগ্যেস করেছিলেন, আচ্ছা আমাকে বুঝিয়ে বলুন দেখি বজ্র জিনিসটা কী? ওঝারা আর শামানদের সর্দার বেকি আমাকে বলে, মেঘলোকের ওপারে স্বর্গলোকে যে দেবতারা থাকেন তারা যখন মানুষের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে গর্জন করেন তখনই নাকি বজ্রপাত হয়। এ কথা কি সত্যি? তারা আরও বলে, লোকে যখন নিয়মমতো কালো রঙের প্রাণীর বদলে অন্য কোনো রঙের প্রাণী কুরবানি দেয় তখনই তিনি রুষ্ট হন, এ কথাও কি সত্যি? এছাড়াও লোকেরা আমাকে ভয় দেখায় গরমকালে স্নান করা বা নদীতে কাপড়-জামা ধোওয়া উচিত নয়, কম্বল বোনা কিংবা ব্যাঙের ছাতা তোলাও উচিত নয়। তাতে দেবতারা রুষ্ট হয়ে মানুষকে শাস্তি দেবার জন্যই বজ্র ও বিদ্যুতের সন্ত্রাস করেন।
বৃদ্ধ শাস্ত্রজ্ঞানী মানুষটি চেঙ্গিস খান-এর দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিলেন।
চেঙ্গিস খান তখন স্বর্ণসিংহাসনে সাদা পশমী গদির ওপর দুটি পা গুটিয়ে বসেছিলেন। মাথায় তার গোল মুকুট। মুকুটে লাগানো শেয়ালের কালো লেজ তাঁর মুখের ওপর ছায়া ফেলেছিল। স্বর্ণসিংহাসনের দুপাশের উঁচু উঁচু বাতিদানে জুলছিল মোটা মোটা মোমবাতি। শিবিরের মধ্যে কেউ ছিল না। থাকার মধ্যে গালিচার ওপরে বসে মোঙ্গল ও চিনাভাযায় দক্ষ তাঁর দুই দোভাষী।
পুণ্যবান চৈনিক শাস্ত্রজ্ঞানী বয়েসের কারণে দুর্বল কণ্ঠে শুধু বললেন, হে সম্রাট, আমি একজন সামান্য বুনো পর্বতবাসী। প্রাচীন পুঁথিপত্রে পড়েছি যে, মানুষের বিভিন্ন রকমের তিন হাজার অপরাধের মধ্যে ঘৃণ্যতম অপরাধ হল পিতা-মাতার উপর অশ্রদ্ধা। আর যিনি প্রজাপালক তার বাঁকা তরোয়ালে রক্তের ছোপ লাগা। আপনার রাজ্যে এসে দেখেছি প্রজারা নিজেরা ভোজসভায় মাতামাতি করে। অন্যদিকে বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পিতামহ-পিতামহীকে শুকিয়ে মারে। এমনকি তাড়াতাড়ি ঘর খালি হওয়ার জন্যে তাদের মৃত্যু কামনা করে; সেবাশুশ্রূষা করা তো দূরের কথা। সম্রাট অন্য কোনো কারণে নয়, শুধু এই দুটি কারণেই স্বর্গের দেবতারা অসন্তুষ্ট হয়ে নরাধমদের ধ্বংস করার জন্যে বজ্রবিদ্যুৎ নিক্ষেপ করেন। …সামনে আবার খাদ। সাবধান! বলে সামভোতা টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফেলতে লাগলেন।
