সামভোতা এই পর্যন্ত বলে সকলকে নির্দেশ দিলেন, ওহে নওজোয়ানরা আরও একটু জোরে হাঁটতে হবে। মনে রেখো এখনও পর্যন্ত যেখানে আমরা রয়েছি তা সুখকর নয়।
কথাটা শুনে আমার খটকা বাধল। কী বলতে চাইছেন উনি–সুখকর নয়, না নিরাপদ নয়।
একবার চারিদিকে তাকালাম। পাহাড়ের পর পাহাড়। পাহাড়ের ওপর লম্বা লম্বা ফার, পাইন আর চিনার গাছ।
ইতিমধ্যেই আমার নাছোড়বান্দা বন্ধুটি ফের ঝাঁপিয়ে পড়েছে
আচ্ছা স্যার, চেঙ্গিস খানের চেহারা পোশাক-পরিচ্ছদ কীরকম ছিল?
সামভোতা হেসে বললেন, সত্যিই তুমি অদ্ভুত। পাহাড়ে যখন ভয় দেখা দিয়েছে, আমরা যখন নামার জন্য ব্যস্ত তখনও তোমার যেন কোনো দুশ্চিন্তাই নেই। অবশ্যই এটা তোমার একটা গুণ।
একটু থেমে বললেন, প্রাচীন তিব্বতী গ্রন্থে এক জায়গায় বলা হয়েছে–দাঁড়াও পড়ে শোনাচ্ছি। বলে ঝুলি থেকে একটা বাঁধানো জীর্ণ বই বের করে পড়তে লাগলেন–একটু আগে ছোটো ছোটো বন্দি শিশুদের খাবারের লোভ দেখিয়ে ডেকে এনে পাহাড়ের ওপর থেকে তাদের ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাততালি দিয়ে হেসে উঠেছিলেন মোঙ্গলদের ভয়ংকরদর্শন অধিপতি কটা দাড়িওয়ালা চেঙ্গিজ খান স্বয়ং।… তারপর তাঁর বাদামি রঙের তেজি ঘোড়ায় চেপে খান-ই খানানা আনন্দে শিস দিতে দিতে নিজের হলুদ রঙা তাঁবুতে ফিরে গেলেন। …।
আর এক জায়গায় …দীর্ঘদেহী চেঙ্গিজ খান স্বর্ণ সিংহাসনের ওপর পা গুটিয়ে বসেছিলেন। তাঁর কালো ভয়ংকর মুখে তামাটে রঙের দাড়ি। তাতে পাক ধরেছে, মাথায় গোলাকার কালো মুকুটের ওপর বিশাল পান্না বসানো। মুকুট থেকে কাঁধের ওপর ঝুলছে তিনটে শেয়ালের লেজ।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। অবাক সুরে বিভাস বলে উঠল, শিয়ালের ন্যাজ!
হ্যাঁ।
কী বীভৎস!
আরও শোনো। তার চোখ দুটো ছিল পাহাড়ি বেড়ালের চোখের মণির মতো ঈযৎ সবুজ। সে তো মানুষের চোখ নয়, প্রেতের চোখ।
কথা বলতে বলতে ওরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। পথ কি ফুরোবে না? আমি ছটফট করছি কখন গাড়িতে গিয়ে বসব। এতক্ষণে নিশ্চয় গাড়ি সারানো হয়ে গেছে। অ্যাডভেঞ্চারের শখ মিটেছে। এখন পালাতে পারলে বাঁচি।
কিছুক্ষণ আগে থেকে একটা অস্পষ্ট গুমগুম শব্দ কানে আসছিল। পাইন গাছের ঘন। জঙ্গলটাকে বাঁ দিকে রেখে ডান দিকে ফিরতেই শব্দটা স্পষ্ট হল। আমরা পরস্পরকে জিগ্যেস করলাম, কিসের শব্দ?
সামভোতা মুখে কিছু বললেন না। দাঁড়িয়ে পড়ে শুনতে লাগলেন।
তোমরা আমার পিছু পিছু এসো। মনে হচ্ছে কোনো খরস্রোতা নদীর শব্দ। কিন্তু নদী এল কোথা থেকে? যেন নিজের মনে প্রশ্ন করলেন সামভোতাজি।
বিভাস বলল, পাহাড়-পর্বতে নদী থাকাটা কি অস্বাভাবিক? দাঁড়ান দেখছি। বলে সে একছুটে একটা ছোটো পাহাড়ের দিকে অনেকখানি চলে গিয়েছিল, সামভোতা লাফ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে খপ করে বিভাসের হাত ধরে টেনে নিলেন।
চোখ মেলে দেখো।
সবাই দেখলাম মাত্র কয়েক হাত দূরে পাহাড়ের আড়ালে গভীর খাদ। আর তারই ধার ঘেঁষে ঘুরপাক খেতে খেতে ছুটছে সরু একটা খরস্রোতা নদী।
ইস্ এখুনি কী সব্বোনাশ হত! বললাম আমি।
কিছুই হত না। ঠিক সামলে নিতাম। কী বলুন সামভোতাজি! তা ছাড়া পাহাড়-পর্বতে খাদ থাকবেই। আমি তা ভালো করে জানতাম বলে সাবধানও ছিলাম।
ঘোড়ার ডিম ছিলে। চালবাজির একটা সীমা থাকা উচিত। কথাটা আমি মনে মনে বললাম।
সামভোতা বোধহয় কোনো কথাই শুনছিলেন না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবছিলেন।
কী ভাবছেন? জিগ্যেস করলাম উদ্বেগের সুরে।
যাবার সময়ে অর্থাৎ পাহাড়ে ওঠার সময়ে তো কোনো খাদ বা নদী-নালা দেখিনি।
চমকে উঠলাম। তাই তো!
বিভাস কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, তা হলে নির্ঘাৎ আমাদের পথ ভুল হয়ে গেছে। ভালোই হল স্যার, অন্ধকার পথে অজানা ঠিকানার উদ্দেশে অ্যাডভেঞ্চারটা বেশ জমবে।
সামভোতা কোনো উত্তর দিলেন না। আকাশের দিকে উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তখন অন্ধকার চরিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দোষ আমারই। দিক ঠিক করতে পারিনি।
জিগমে একটা পাথরের ওপর বসে একমনে গাছের সেই লতাপাতাগুলো জড়াচ্ছিল। বিভাস ধমকে উঠে বলল, তুই তো গাইড। ভুল পথে এলি কেন?
উত্তরে ও যা বলল সামভোতা তা বুঝিয়ে দিলেন। ও বলতে চাইছে প্রথম থেকেই পাহাড়ে ওঠায় ওর আপত্তি ছিল। তারপর অশরীরী ঘোড়সওয়ারগুলোর ঘোড়ার খুরের শব্দ ও …. তো পালিয়েই আসছিল–আমরাই দেরি করলাম।
বাঃ! খাসা জবাব।
তা বাবা, এখন কোন দিকে গেলে আমাদের গাড়ির টিকি দেখা যাবে বলতে পার?
জিগমে নিঃশব্দে এবং নির্ভীকভাবে মাথাকে শুধু এদিক থেকে ওদিকে নাড়ল। অর্থাৎ সে জানে না।
সামভোতা গম্ভীর মুখে বললেন, এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। যে রাস্তার ওপর আমাদের গাড়িটা রয়েছে তারই সমান্তরাল কোনো পথ আন্দাজে ঠিক করে এগোতে হবে। গাড়িটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে সারানো হয়ে গেছে, আর বোধ করি বুদ্ধিমান ড্রাইভার সেই পথ ধরে এগিয়ে গেছে আমাদের খোঁজে।
আমার বন্ধুটি যেন ব্যঙ্গ করে বলল, সেরকম হলে তো ভালোই হয়। কিন্তু আন্দাজে নতুন পথ ধরে যেতে যেতে সেই অশরীরী ঘোড়াদের রাস্তায় গিয়ে পড়ব না তো?
দেখা যাক। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সামভোতা হাঁটতে শুরু করলেন।
হায় রে, ভেবেছিলাম এতক্ষণে কোথায় গাড়ির গদিতে পা ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজিয়ে পড়ে থাকব। তা নয় অন্ধকার অজানা পথে চলেছি পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে।
