সামভোতা কয়েকবার তার নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু জিগমে সাড়া দিল না। একটু উঁচুতে একটা ফুল ফুটেছিল। সেটা নেবার জন্যে লাফালাফি করেই চলল।
সামভোতা এগিয়ে গেলেন। দেখলেন জিগমের চোখমুখ ভয়ে বসে গিয়েছে। কাটার আঁচড়ে তার কপাল, হাত ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।
ঐ ফুলটা তোমার চাই?
জিগমে মাথা দোলাল। দীর্ঘদেহী সামভোতা ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে ফুলটা পেড়ে দিলেন। তাতে জিগমে কতটা খুশি হল বোঝা গেল না। তবে নিশ্চিন্ত হল।
এবার সে কিছু কিছু লতাপাতা আমাদের তিনজনের কব্জিতে বেঁধে দিল।
সামভোতা জিগ্যেস করলেন, এগুলো দিয়ে কী হবে?
জিগমে পাহাড়ি ভাষায় যা বলল সামভোতা বাংলা করে বুঝিয়ে দিলেন। জিগমে নিশ্চিত এই অঞ্চলে অপদেবতার ভয় আছে। গাড়িটা যখনই খারাপ হল তখনই ও নাকি বুঝতে পেরেছিল অদ্ভুত ঘটনা ঘটবেই। তারপর যত সবাই পাহাড়ে উঠতে লাগল ততই ও নাকি নিশ্চিত হয়েছিল জায়গাটা খারাপ। তাই এগোতে চাইছিল না। তারপর সেই অদৃশ্য ঘোড়া আর খুরের শব্দ ….
ও আরও বলল, এ কহানি তার জানা আছে।
থিবস–থিবস– বলে জিগমে হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছিল।
থিবস! চমকে উঠলেন সামভোতা।
বোঝা গেল এই নাম তিনি জানেন।
থিবস্ কোথায় জিগমে?
ও উত্তর দিতে পারল না। শুধু সামনের একটা উঁচু পাহাড় দেখিয়ে দিল। বুঝিয়ে দিল যেখান দিয়ে ঘোড়াগুলো ছুটছিল সেখানেই আছে থিবস্–অতি ভয়ংকর …
এই বিশেষ ধরনের লতাপাতা ফুল গায়ে জড়ানো থাকলে প্রেতাত্মারা নাকি কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
.
পাহাড়ে আতঙ্ক
জিগমের মতো একজন পাহাড়ি ছেলের ভয়-সন্ত্রস্ত মুখে যখন থিস্-এর কহানি উচ্চারিত হল তখন বিভাস খুব কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এসেছিল সব ঘটনাটা শুনতে। কিন্তু জিগমে আর একটি কথাও খরচ করল না। জোরে জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলল।
তার ভাবখানা এমনই যেন একমাত্র প্রেতাত্মা ছাড়া আর কারও পরোয়া করে না।
সামভোতার মুখটা ক্রমশই গম্ভীর হয়ে উঠছিল। কিছু একটা বুঝে তিনি তিব্বতী ভাষায় জিগমেকে আস্তে আস্তে চলতে বললেন। কিন্তু জিগমে কারো কথা শোনার পাত্র নয়। শুধু পিছনের পাহাড়টার সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েই জোরে হাঁটতে লাগল।
আমরা তিনজনেই সেই উঁচু চুড়োটার দিকে তাকালাম। বাদুড়ের পাখা ঝাঁপটানোর গতিতে ধোঁয়াটে অন্ধকার একটা আকার ধারণ করে ক্রমশ এই দিকে এগিয়ে আসছে … এছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।
বুঝলাম জিগমে ঐ অন্ধকারটাকেই ভয় পাচ্ছে।
আবার আমাদের পাহাড়ি পথে হাঁটা। কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। জিগমে তো জানেই না। এমনকি মনে হচ্ছে সামভোতাও কেমন দিশেহারার মতো হাঁটছেন।
আমি তো আগেই বলেছি আমার বন্ধুটি যেমন দুঃসাহসী তেমনই বেপরোয়া। পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতি খেয়াল না রেখেই সময় সময় এমন এক-একটা মন্তব্য করে বসে যা শুনে আমারই লজ্জা করে। যেমন এখন নানারকম দুশ্চিন্তার জন্যে তাড়াতাড়ি পাহাড় থেকে নামার সময়ে ও হঠাৎ সামভোতাকে জিগ্যেস করল, আচ্ছা সন্ন্যাসীজি, (সামভোতাকে কী বলে সম্বোধন করবে বিভাসের তা ঠিক থাকত না। আর যাই হোক অত বড়ো পণ্ডিত মানুষটি যিনি বাপ কাকার বয়সী তাকে তো মিস্টার সামভোতা বলা যায় না। সেদিন ট্রেনে মোঙ্গলদের কথা বলছিলেন, এরাই কি ইতিহাসের মোগল?
সামভোতাকে ভালো করে এখনও চেনা হয়ে না উঠলেও এইটুকু বুঝেছি উনি আমাদের মতো অর্বাচীন ছোকরাদের যেমন-তেমন কথাবার্তায় বা মন্তব্যে রেগে যান না, বিরক্তও হন না। বাইরের শান্ত ধীর, সৌম্য মূর্তির মতোই তাঁর অন্তঃকরণটাও যেন অমলিন, স্বচ্ছ, সুন্দর।
বললেন, এইরকম একটা সময়েও তোমার জানার আগ্রহ ভালো লাগল। না, মোঙ্গলরাই মোগল বা মুঘল নয়। তবে পরে–অন্তত একশো বছর পরে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের অনেকেই তুর্কি জাতির সঙ্গে মিলে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অনেকখানি সভ্য হয়ে ওঠে। তারাই পরে ইতিহাসে মুঘল নামে পরিচিত হয়।
একটা প্রশ্নের উত্তর পাবার সঙ্গে সঙ্গে গুরুতর পরিস্থিতির কথা মনে না রেখেই আমার বেপরোয়া বন্ধুটি ফের জিগ্যেস করল, স্যার, এইমাত্র আপনি বললেন তুর্কি জাতির সঙ্গে মিলে আর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মোঙ্গলরা অনেকখানি সভ্য হয়ে উঠল। তা হলে কি মোঙ্গলরা অসভ্য ছিল?
সামভোতা একটা ছোটোখাটো পাথরের চাই লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে পাশের ঢালের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, মোঙ্গল কথাটির উৎপত্তি হয়েছে মোঙ শব্দ থেকে যার মানে হচ্ছে নির্ভীক। তারা ছিল মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি। তারা বেশিরভাগই ছিল সুদক্ষ অশ্বারোহী, নিষ্ঠুর আর দুর্ধর্ষ সৈনিক। তাদের হাতে থাকত বাঁকা তরোয়াল আর বর্শা। চেঙ্গিস খানের বাহিনীর বেশির ভাগই ছিল দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী এই মোঙ্গল যাযাবররা।
এই রণোন্মাদ রক্তপিপাসু সৈন্যদের সাহায্যে তিনি পিকিং অধিকার করেন। আর এক বছরের মধ্যেই চিনের উত্তর ভাগ দখল করে নেন। মোঙ্গোলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে যে বিশাল খোয়ারদাম সাম্রাজ্য তাও চেঙ্গিসের পদানত হয়। তারপর বুখারা, সমরখন্দ, বা এমনকি আফগানিস্তানের হিরাট প্রভৃতি শহরগুলি শুধু অধিকার করা নয়, ধ্বংস করে ফেলা হয়।
আর এইসব মোঙ্গলদের চেহারা কেমন ছিল শুনবে? শোনো
যা বলব তা আমার শোনা কথা নয়। বিখ্যাত কবি আমীর খসরু একবার এই মোঙ্গলদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। একে কবি মানুষ। ঝগড়াঝাটি, অশান্তি মোটেই পছন্দ করেন না। সেপাই-শাস্ত্রী, কারাগারের কথা ভাবলে ভয় পান। ঘটনাচক্রে তিনিই মোঙ্গলদের জালে পড়েন। তার জন্যে তার দোষ ছিল না। কিন্তু কে শুনবে তাঁর কথা? মোঙ্গলরা কবি টবির ধার ধারে না। আমীর খসরু তো মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, কিন্তু কী ভাবে যে তাঁর মুক্তি হল সে ইতিহাস অন্তত আমার জানা নেই। তবে তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এই মোঙ্গলদের যা বর্ণনা দিয়েছেন তা এই রকম–তাদের পশমের পাগড়ি বাঁধা লাল টকটকে মুখ দেখলে মনে হত পশমগুলো যেন জ্বলছে। তাদের মাথা ন্যাড়া। পাথরের গায়ে সরু ফাটলের মতো ছিল তাদের ক্রুর চোখ। তাদের সকলেরই শরীর থেকে পচা মৃতদেহের গন্ধ বেরোত, যে গন্ধ তাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। বিশাল জয়ঢাকের চামড়ার মতো খসখসে তাদের গায়ের চামড়া। তাদের নাকের গর্ত দুটো ছিল এ গাল থেকে ও গাল পর্যন্ত চওড়া। নাকের গর্ত সব সময়ে ভিজে থাকত। আর তা থেকে নর্দমার গন্ধ বেরোত। বড়ো বড়ো দাঁত দিয়ে তারা কুকুর-শুয়োরের মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেত। জল খেত নালা-নর্দমার। আস্বাদহীন ঘাস ছিল তাদের আর এক ধরনের প্রিয় খাদ্য।
