আমার মন ছটফট করছিল। গাড়িটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে সারানো হয়ে গেছে। আপাতত গাড়িতে গিয়ে বসতে পারলে বাঁচি।
সামভোতার যেন কোনো দুর্ভাবনা নেই। পাহাড় থেকে নামতে নামতে এক জায়গায় একটু দাঁড়িয়ে পাশের পাহাড়ের পথে হাঁটতে লাগলেন। বিভাসের কথার উত্তরে বললেন, আমার ধারণা সেই পথ দিয়েই ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অর্থাৎ ১২২১ সাল নাগাদ মোঙ্গোলীয় যোদ্ধা চেঙ্গিস খাঁ সসৈন্য দিগ্বিজয়ে যেতেন।
আমি অবাক হয়ে বলালম, তার মানে প্রায় আটশো বছর আগে!
বিভাস বিদ্রুপের সুরে বলল, রাজা বা সেনাপতিরা যুদ্ধ করতে সসৈন্য রাজপথ দিয়েই যাবে। আর রাজপথ যদি একটি থাকে তাহলে সেই পথেই যাবে। এতে আর ভাবনার কী আছে!
সামভোতা বললেন, যে রাজপথের কথা বলছিলাম সেই পথ দিয়েই যদি কফিনও নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে সেই পথ পরে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল।
কথা বলতে বলতে আমরা এক একটা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করছিলাম। কেবলই ভাবছিলাম পাশের ঐ পাহাড়টা দিয়ে এগোলে হয়তো তাড়াতাড়ি নামা হবে।
আগে আগে যাচ্ছিলেন সামভোতা। পাহাড়ের বাতাসে তার গায়ের র্যাগ গরম কোট থেকে বারে বারে ঝুলে যাচ্ছিল। তিনি বারে বারেই সামলাচ্ছিলেন। আর হনহন করে হাঁটছিলেন। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি কিছু ভাবতে ভাবতে হাঁটছেন।
হঠাৎ পিছন ফিরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে আমাদের উদ্দেশে বললেন, গাইড ছোঁড়াটা গেল কোথায়?
তাই তো!
আমরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। কোথাও নেই।
তাই তো! ছোকরা গেল কোথায়?
আমি বললাম, কিছুক্ষণ আগে দেখলাম ও মাথা নিচু করে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন আমাদের এড়িয়ে তাড়াতাড়ি চলে যেতে চাইছিল।
সামভোতা গম্ভীরভাবে বললেন, গাড়ি খারাপ হওয়ার সময় থেকেই ওর মুখে চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখেছিলাম। তারপর ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনার পর থেকে ও যেন কেমন ভয় পেয়ে গেল। ও যেন অশুভ কোনো ঘটনার গন্ধ পাচ্ছিল। হাজার হোক ও তো এসব অঞ্চলের লোক। অনেক কিছুই জানে।
বিভাস বলল, ওসব কিছু নয়। যতক্ষণ গাড়ি ছিল, বেশ আরামে ছিল। তারপর পাহাড়ে উঠতে ভালো লাগছিল না। আমার মনে হচ্ছে ও কেটে পড়েছে।
কী পড়েছে? সামভোতা চলতি বাংলা কথাটা বুঝতে পারলেন না।
বললাম, এটা আমাদের এখনকার চলতি কথা। কেটে পড়েছে মানেনা বলে চলে গেছে।
ও আচ্ছা। তা যাক। কিন্তু আমার ভয় পথ হারিয়ে না ফেলে।
বলেই তিনি হন হন করে হাঁটতে গেলেন কিন্তু জোরে হাঁটতে পারছিলেন না। কারণ প্রথমত পাহাড়ি পথ, সর্বত্র পাথর ছড়ানো। দ্বিতীয়ত কিছুক্ষণ ধরে একটা ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়েছে। সেই বাতাসটা আসছে সামনের দিক থেকে। ফলে বাতাস ঠেলে এগোনোই মুশকিল। এ অবস্থা আমাদের দুজনেরও। তাই তো, জিগমে গ্যাটসোটা কোথায় গেল? ও কি সত্যিই পালিয়ে গেল? না কি পথ হারাল?
যদি পথ হারায় তো সব্বনেশে কথা। যে হোটেল থেকে ওকে এনেছিলাম সেখানে তো পৌঁছে দিতে হবে।
একেই তো পাহাড়ের ওপর আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগছিল না। তার ওপর এই এক দুশ্চিন্তা।
হিমালয়ের রাজত্বে এসে পর্যন্ত এখনকার আবহাওয়ার মর্জি বুঝতে পারছি না। কখনও মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনও বৃষ্টি, কখনও দমকা হাওয়া, কখনও তুষারঝড়। কখনও ধূলিঝড়। শীতে হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। তা ছাড়া হঠাৎ হঠাৎ কুয়াশা তো আছেই। পথ হাঁটাই যায় না।
এখন আমার শীতের পোশাকের বর্ণনা একটু দিই। মোটা গেঞ্জি। তার ওপর দুটো ফুলহাতা সোয়েটার। তার ওপর উইন্ডচিটার। তার ওপর মোটা ওয়াটার প্রুফের কোট। পরনে উলের প্যান্ট। মাথায় মাঙ্কি টুপি। হাতে উলেন দস্তানা। পায়ে নাইলনের মোজা, তার ওপর উলেন মোজা। জুতোর কথা নাই বললাম।
কলকাতায় বসে তোমরা যখন এই উপন্যাস পড়বে তখন আমার এই পোশাক শুনে এখানে শীতটা কেমন কল্পনা করার চেষ্টা কোরো।
বিভাসের সব তাতেই বাড়াবাড়ি। আমার পোশাকের বহর দেখে হেসেই খুন। বললে, আস্ত একটা ক্লাউন। ও বলতেই পারে। কারণ তার গায়ে একটা হাফহাতা সোয়েটার, তার ওপর একটা ফুলহাতা সোয়েটার, তার ওপর উইন্ডচিটার। পরনে নাইলনের প্যান্ট, হাতে গ্লাভস। মাথায় টুপি। ওর টুপির বাহার দেখে ওকেই ক্লাউন বলে মনে হচ্ছিল আমার।
খুব সিমপল অথচ ফিটফাট লাগছিল তিব্বতী সন্ন্যাসীটিকে। যেমনই হোক তিনি সন্ন্যাসী। তাঁর আলখাল্লার আড়ালে পুরু সোয়েটার আর একটা গরম কম্বল আড়াআড়ি ভাবে জড়ানো। মাথায় সেই গেরুয়া টুপি। ফোলা ফোলা চোখ। ঠান্ডায় যেন আরো ফুলে উঠেছে। কাঁধে একটা বড়ো ব্যাগ। তার মধ্যে নিশ্চয় রাত্রে গায়ে দেবার কিছু কম্বল-টম্বল আছে।
কিন্তু জিগমে বেচারি গরিব। তার গায়ে একটা ফুলহাতা সোয়েটার আর মাথায় পাগড়ির মতো জড়ানো একটা মাফলার …।
সত্যি ছেলেটা গেল কোথায়? গাইড হিসেবে ওকে আনা আমাদের ভুল হয়েছে। এখন মানে মানে ওকে সেই হোটেলে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারলে বাঁচি।
উতরাই ধরে অল্প একটু নামতেই হঠাৎ সামভোতা দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চলার গতির মধ্যে হঠাৎ ব্রেক কষা দেখে আমরা বুঝলাম নিশ্চয় সামভোতা এমন কিছু দেখেছেন–
দ্রুত পায়ে তাঁর কাছে যেতেই তিনি আঙুল তুলি দেখালেন, Look!
দেখলাম। পাহাড়ি ঝোপের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জিগমে পটাপট করে কী সব লতাপাতা ছিঁড়ছে। আর নিজের গলায়, মাথায়, বাহুতে জড়াচ্ছে।
