বিভাস বলল, না হয় তাই হল। এখন আমার দুটো প্রশ্ন। এক–আপনি বলেছিলেন কলকাতার মিউজিয়ামে বারে বারে গিয়েছিলেন মমির কেসের মধ্যে কিছু খুঁজতে। কী খুঁজতে বলেননি। আজ বলবেন?
সামভোতা বললেন, যথাসময়ে বলব। এখন তোমার দ্বিতীয় প্রশ্ন কী?
বিভাস বলল, ঐ যে অদৃশ্য ঘোড়সওয়াররা ঘোড়া ছুটিয়ে গেল। কোথা থেকে এল বা কোথায় গেল বলে মনে করেন?
সামভোতা হাসলেন। বললেন, অন্তত আট-ন শ বছর আগে এই বিদেহীরা কোন জাতির দেহ ধারণ করে সৈনিকবৃত্তি নিয়েছিল, কোন রাজার সৈনিক কোন রাজ্য আক্রমণ করতে চলেছে এসব কি আমার মতো সামান্য একজন মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব? একজন খুব উঁচুদরের ইতিহাসবিদও এর উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ ইতিহাসবেত্তারা মানুষ নিয়ে গবেষণা করেন, প্রেতাত্মাদের নাগাল পান না। তবে
সামভোতা একটু থামলেন।
তবে কী?
আমি সন্ন্যাসীই হই বা যাই হই মনে-প্রাণে আমি একজন ইতিহাসপ্রেমী। শুধু ইতিহাসপ্রেমী নই, প্রাচীন কালের মানুষদের সমাজ, তাদের সংস্কার, তাদের ধর্ম, তাদের ক্রিয়াকলাপ সব নিয়ে গবেষণা করতে ভালোবাসি। সারা জীবন আমি ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি তিব্বতী। তিব্বত আমার দেশ। ওখানকার প্রতিটি ধূলিকণায় কত না প্রাচীন সংস্কার লুকিয়ে আছে–আমি সেসবের সন্ধান করেছি। ওঁ মণিপদ্মে হুম এই শাস্ত্রীয় কথাটার মধ্যে যে কী যাদু আছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির মানুষকে বোঝাতে পারব না। এই কথাটা উচ্চারণ করলেই আমার সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। তিব্বতের কত প্রাচীন গোস্যায় গোম্ফায় আমি ঘুরে বেড়িয়েছি–শুধু চোখের দেখার জন্যে নয়, ঠিক কী খুঁজে পেতে চেয়েছি তা আমি নিজেও জানি না। বৌদ্ধদের দেবদেবীর শেষ নেই।
গিয়েফাং থেকে জোখাং মন্দিরে এগারো মাথা হাজার হাতযুক্ত অবলোকিতেশ্বর বুদ্ধ বা ঢেং রেজি–সবই আমি দেখেছি। দেখেছি দু-চার বার নয়, বহু বার। কিন্তু যা খুঁজতে চাই তা পাই না। বলে তিব্বতী সন্ন্যাসী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
শুনতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু হাতি-ঘোড়া কী যে খুঁজে পাচ্ছেন না তা বুঝতে পারলাম না।
একটু থেমে তিনি ফের বলতে লাগলেন, আমি কিছুকাল ধরে মোঙ্গলদের কথা পড়ছি। মোঙ্গলদের দেশ হচ্ছে মোঙ্গলিয়া। এটা কোথায় জান তো?
আমরা লজ্জায় পরস্পরের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
সামভোতা একজন যোগ্য শিক্ষকের মতো গম্ভীর গলায় বললেন, শুধু এক ফালি পশ্চিমবঙ্গ, বড়োজোর ভারতবর্ষের ম্যাপটা মনে রাখলে চলবে না। চোখের সামনে রাখতে হবে গোটা পৃথিবীর মানচিত্র। যাই হোক এশিয়ার মানচিত্রটা একবার খুলে দেখো। চিনের ঠিক ওপরেই মোঙ্গোলিয়া। মোঙ্গোলিয়ার মাথার ওপরেই সোভিয়েত রাশিয়া। আর অনেক নীচে চিনের গায়ে গায়ে আমাদের দেশ তিব্বত। আর তিব্বতের গায়ে তোমাদের ভারতবর্ষ।
বিভাসটা সত্যিই তড়বড়ে। পণ্ডিত ব্যক্তিটি সবে একটু কথা বলতে শুরু করেছেন অমনি বিভাস বলে উঠল, কোথায় ভারতবর্ষ, কোথায় তিব্বত আর কোথায় মোঙ্গোলিয়া! পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে হঠাৎ মোঙ্গোলিয়াকে নিয়ে পড়লেন কেন?
সামভোতা বিরক্ত না হয়ে বললেন, অধৈর্য হচ্ছ কেন? এই মোঙ্গোলিয়ার সঙ্গে এমন একটি ইতিহাস জড়িয়ে আছে যা সন্ধান করতে আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি। এখন–এ কী! এখুনি অন্ধকার হয়ে আসছে কেন? আমার ঘড়িতে তো সবে সাড়ে তিনটে। তোমাদের?
আমরাও দেখলাম আমাদের কারও ঘড়িতে তিনটে পঁচিশ, কারও কয়েক মিনিট বেশি।
পাহাড়ে ঘেরা চারিদিক তো। তাই বেলা যতই থাক সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলেই দিনের আলো কমে আসে। নাও, ওঠো। আর দেরি হলে পথ খুঁজে পাব না। বলতে বলতে আকাশের দিকে আর একবার তাকিয়েই অদ্ভুত ব্যস্ত হয়ে পাহাড় থেকে নামতে লাগলেন।
আপনি যেন একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। সেই কথাটা শুনিয়ে দিন।
সামভোতা বললেন, শুধু সেই একটুকরো কথা শুনলে তোমরা কিছুই বুঝতে পারবে না। তবু বলছি, আমি নিশ্চিত যে, মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উর্গা বা উলানবাটোর থেকে খারজম (Khawrizm), সমরখন্দ, বোখারা, আফগানিস্তান, হিরাট, গজনী হয়ে অন্তত পেশোয়ার পর্যন্ত একটা রাজপথ ছিল। যেমন রোটাং গিরিপথই বহু কাল ধরে লাহুল, স্পিতি, লে, লাদাখ এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যপথ হয়ে আছে। কত যুগ ধরে কত বণিকের দল উট, ঘোড়া কিংবা গাধার পিটে মাল চাপিয়ে বরফ-পড়া শীতে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেছে। কতজন পথশ্রম আর হিমপ্রাহ সহ্য করতে না পেরে মাঝপথেই প্রাণ হারিয়েছে। সেই সব মৃতদেহ পড়ে থেকেছে তুষারধবল পাহাড়ের নীচে কিংবা ভাগ্য ভালো হলে পাহাড়ি ঝর্নার জলে হয়েছে সলিলসমাধি। ফিরে তাকাবার বা শোক করবার বা ভয় পেয়ে পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। মাইলের পর মাইল তাদের হাঁটতে হবে-১৩০০০/১৪০০০ ফুট চড়াই ভেঙে। প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তাদের চলে না।
বিভাস বলল, না হয় বুঝলাম এইখানেই কোথাও আদ্যিকালের সেই পথটা আছে। কিন্তু সে পথটা খোঁজার জন্যে আপনার এত আগ্রহ কেন? সারা পৃথিবীর স্থলভাগে আদিকাল থেকে কত পথই না ছড়িয়ে আছে। তার মধ্যে অনেক পথ হয়তো ধসে চাপা পড়ে গেছে কিংবা পাহাড়ি নদী গ্রাস করে ফেলেছে। তাহলে একটা বিশেষ পথের জন্যে মাথা ঘামানো কেন?
