আশ্চর্য! তিব্বতী প্রবীণ জ্ঞানী মানুষটিও ভয় পেলেন নাকি? কিসের ভয়?
ততক্ষণে খুরের শব্দ দূর থেকে দূরান্তরে মিলিয়ে গেছে।
কী ব্যাপার পণ্ডিতজি?
উনি বিমর্ষ মুখে জোর করে হাসি টেনে বললেন, যা শুনলে তা নিয়ে আলোচনা করতে নেই। তবে আমি খুশি, যে পথটা সন্ধান করার জন্যে ইতিপূর্বে আসতে হয়েছে, আজ দৈবের বশে সে পথের সন্ধান বোধহয় পেয়ে গেলাম।
সে পথটা কোথায়?
আরও ওপরে।
ঘোড়াগুলো কোথা থেকে এল? ঘোড়সওয়ারই বা কারা?
শুনে ঘাবড়ে যেও না, ঘোড়ার অস্তিত্ব নেই, ঘোড়সওয়ারও নেই। থাকলেও চোখে দেখা যায় না।
চমকে উঠলাম। বললাম, সে আবার কী? অতগুলো ঘোড়া পাহাড়ের ওপারে রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটে গেল, কাছে থাকলেও দেখতে পেতাম না?
কাছে থাকলে চোখ মেলে দেখবার সময় পেতে না। ততক্ষণে ধড় থেকে মাথা খসে পড়ত।
আমাদের গাইড যখন প্রাণের ভয়ে পাহাড় থেকে নীচে নামতে যাচ্ছিল, বিভাস তখন ঘোড়াগুলোকে দেখবার জন্যে সামনের উঁচু পাহাড়টার দিকে ছুটছিল। শব্দটা আর শোনা না যেতে সে নেমে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। তিব্বতী সন্ন্যাসীর কথা শুনে দুহাত মাথায় চেপে ধরে বলে উঠল, হে ভগবান! এই বিজ্ঞানের যুগে এও বিশ্বাস করতে হবে? সামভোতার দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, এসব কথা কি আপনার মস্তিষ্ক প্রসূত?
বিভাসের জিগ্যেস করার টোনটা এতই উগ্র ছিল যে ভেবেছিলাম সামভোতা বুঝি রেগে যাবেন। কিন্তু আশ্চর্য, তিনি এতটুকু রাগলেন না। একটু হেসে বললেন, না, আমার মস্তিষ্ক প্রসূত নয়। এটা তো ঠিক–ঘোড়া ছুটিয়ে যারা গেল তারা আজকের মানুষ নয়। আজকের মানুষ ঐরকম দুর্গম পাহাড়ের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে পারে না। ওরা সাধারণ অশ্বারোহী নয়। কোনো ত্রিভুবনজয়ী নৃপতির দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী সৈন্য। অথচ সে নৃপতি জীবিত ছিলেন সম্ভবত আটশো-নশো বছর আগে। হাজার বছরও হতে পারে। কাজেই তাদের চর্মচক্ষুতে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমায় সাহায্য করেছে বই। বই পড়েই আমি জানতে পেরেছি। যেমন জানতে পেরেছি সিন্ধুসভ্যতার যুগে দুটি শহর হরপ্পা আর মহেঞ্জোদাড়োর অনেক কথা।
ভয় পেলাম। এইবার বুঝি তিব্বতী পণ্ডিতমশাই শুরু করেন সেই হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়োর ধ্বংসাবশেষের ইতিহাস। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলাম না। বিভাস অবশ্য চঁচাছোলা কথা বলে। সোজাসুজি বলল, খুব সংক্ষেপে যদি বলেন শুনতে পারি।
না শুনলেও আমার কোনো ক্ষতি নেই। উত্তর দিলেন সামভোতা। তবে তোমরা বুঝতে পারতে এই অদৃশ্য ঘোড়সওয়ারদের সূত্র কোথায়?
তাহলে বলুন।
এসো, তবে এই পাথরটার ওপর বসা যাক।
সামভোতা বলতে শুরু করলেন, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর আগে সিন্ধুসভ্যতার বিকাশ। তোমারা জান কিনা জানি না ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক বাঙালি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়ারাম সহানী আর ঐ বিভাগের অধ্যক্ষ স্যার জন মার্শালের উদ্যোগে সিন্ধুনদের অববাহিকার কয়েকটি জায়গায় খননকার্য শুরু করা হয়। তার ফলে আবিষ্কৃত হল মহেঞ্জোদাড়ো আর হরপ্পা নামে দুটি প্রাচীন উন্নত নগরী। খননকার্যের ফলে সিন্ধুদেশবাসীর সেদিনের জীবনযাত্রার কিছু কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। তা থেকে সে সময়ের পথঘাট, সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, উপাস্য দেবতা প্রভৃতি অনেক কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন সম্প্রতি চণ্ডীগড়ে পাওয়া গিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের সীলমোহর। সেগুলির গায়ে খোদাই করা ছিল ষাঁড়, মোয, হাতি, গণ্ডার প্রভৃতি মূর্তি। অর্থাৎ সিন্ধুসভ্যতার যুগে প্রধানত এই সব জন্তুর প্রাধান্য ছিল।
হরপ্পা আর মহেঞ্জোদাড়ো দুটি নগরীই বেশ শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। তারপর একদিন শুরু হল বহিঃশত্রুর আক্রমণ। তারা আসত পশ্চিম আর উত্তর দিক থেকে। এদের গায়ের রঙ ছিল গৌরবর্ণ, উন্নত নাক–আর্য সম্প্রদায়ের মানুষ। দুর্ধর্ষ তাদের শক্তি। তারা আক্রমণ করত দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে চড়ে। এদের দেশেও ঘোড়ার অভাব ছিল না। কিন্তু এরা কখনও ঘোড়াকে বশ করে তার পিঠে চড়ত না।
কেন? ভয় করত যদি ঘোড়া থেকে পড়ে যায়? খানিকটা ব্যঙ্গের সুরেই জিগ্যেস করল বিভাস।
না। আসলে এরা বিশ্বাস করত একমাত্র অশরীরী আত্মারাই ঘোড়ায় চেপে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দাপাদাপি করে বেড়ায়। অর্থাৎ ঘোড়া মাত্রই অশরীরী আত্মার বাহন।
ফলে আক্রমণকারীরা যখন চোখের সামনেই ঘোড়া ছুটিয়ে এসে লুঠপাট করে ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পালাত তখন এরা উটের পিটে চড়ে ওদের পিছনে ধাওয়া করত। কিন্তু দ্রুতগতি ঘোড়ার সঙ্গে উট পেরে উঠত না।
এই ভাবেই একদিন হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো পিছিয়ে পড়ল। প্রভুত্ব করতে এগিয়ে এল আর্যরা।
সামভোতা একটু থামলেন। তারপর বললেন, সিন্ধুসভ্যতা কী করে ধ্বংস হয়ে গেল সে সব কথা বলার সময় এখন নয়। শুধু এইটুকুই জানাতে চেয়েছিলাম, খ্রিস্টপূর্ব তিন সহস্র বছর আগেও হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়োর লোকেরা ঘোড়া দেখে ভয় পেত। তারা অনুমান করতে পারত এক একটি ঘোড়ার ওপর এক একটি অপদেবতা বসে চারিদিকে লক্ষ রাখছে। অথচ তাদের দেখা যায় না।
এখন, এই কিছুক্ষণ আগে যে ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ আমরা শুনলাম, সেসব ঘোড়ার পিঠে যারা সওয়ার তারা কেউ জীবন্ত মানুষ নয়, প্রেতাত্মা। আর ঘোড়াগুলোও তাই।
