বিচক্ষণ মানুষটি এ কথায় খুশি হলেন বলেই মনে হল। কেননা ভদ্রলোক এখটু চাপা স্বভাবের। উচ্ছ্বাস নেই। প্রাণ খুলে হাসেন না। তবু লোকটি ভালো।
বিভাসের কথা শুনে তিনি হাই তুলে, আলিস্যি ভেঙে বলে উঠলেন, বেশ তাহলে তোমাদের সঙ্গে যাওয়াই স্থির করলাম।
টিকিট?
বললেন, ভেব না। আপাতত চণ্ডীগড় পর্যন্ত টিকিট আছে। তারপর তো বাস। বাসে মানালি। তোমাদেরও তো সেইরকম ব্যবস্থা?
হ্যাঁ।
উনি যেন একটু ভেবে বললেন, আমি একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মাত্র। সুযোগ পেলে বৌদ্ধ তীর্থগুলিতে যাই। আর যাই বহু পুরনো গোম্ফাগুলোতে। সম্ভব হলে রাত কাটিয়ে দিই। কিন্তু ঐ রাত কাটানোই। ঘুম হয় না।
কেন?
ঠিক জানি না। বহু পুরনো জায়গা তো। কেমন যেন মনে হয়। যাক, ওসব কথা বাদ দাও। অনেক রাত হল। কিছু খাবার সঙ্গে থাকলে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ো।
কী জানি কেন এই মানুষটির কথায় আমরা বেশ উৎসাহ পেলাম।
আপনি কী খাবেন? জিগ্যেস করলাম সবিনয়ে।
আপেল আর মিষ্টি আছে। আমি সন্ন্যাসী মানুষ। স্বল্পাহারী।
.
অশরীরী অরোহী
গাড়ি থেকে আমরা চারজনে নামলাম। তার মধ্যে হাঁড়িমুখো গাইডটিও আছে। নেমেই সে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। যেন পথ চেনবার চেষ্টা করল। আমরাও রাস্তায় নেমে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচলাম। একবার আকাশের দিকে তাকালাম। ভাবলাম যদি নীল আকাশ একটু দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু পাশের কালো কালো উঁচু উঁচু পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে লম্বা ফার, আর চিনার গাছগুলো যেন আকাশটাকে আড়াল করে রেখেছে।
ড্রাইভার ততক্ষণে ইঞ্জিনের বনেট খুলে ঝুঁকে পড়ে কলকজা পরীক্ষা করছে। জিগ্যেস করলাম, কত দেরি হবে?
ড্রাইভার বললে, দেখি। আপনারা এক কাজ করুন। এই পথ ধরে বেড়াতে বেড়াতে এগিয়ে যান। গাড়ি সারানো হলেই আপনাদের ধরে ফেলব।
এই প্রস্তাবে আমরা সকলেই খুশি। সন্ন্যাসী ভদ্রলোকের দুচোখ খুশিতে উৎসাহে চকচক করে উঠল। উনি যেন হাঁটতেই চাইছিলেন। আমরা যে পাশাপাশি হাঁটব, তেমন সুবিধে নেই। রাস্তাটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে। ইচ্ছে করেই বাসরাস্তা ছেড়ে এসেছি। বাসরাস্তায় এত নুড়ি ছড়ানো যে পা হড়কে যাবার ভয়।
আমাদের গাইড বোধহয় তার কাজ দেখাবার জন্যে এগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। তিন-চারটে সরু পাহাড়ি পথ হেলেসাপের মতো হিলবিল করে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। সে রকম একটা পথ ধরে আমাদের উঠতে ভালোই লাগছিল।
অনেকক্ষণ থেকে বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল। গাইডকেই জিগ্যেস করলাম, কিসের গন্ধ হে? গাইড ছোকরা তার উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করল না। সে যেন মেন অন্যমনস্কভাবে হাঁটছিল। আর ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক দেখছিল। কিসের এত ভয় তা তো বুঝি না।
আমার কথার উত্তর পিছন থেকে দিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ঠাকুর। বললেন, গন্ধটা বন গোলাপের।
আমি মুগ্ধ হয়ে তখন দেখছিলাম পাইন গাছের বনগুলি। দেখছিলাম পাহাড়ের সবুজ চাদরে সাদা ফুলের ছিট। অপূর্ব!
আর ঐ দ্যাখো নাগলিলি। ঠিক যেন সাপের ফণা। আর কেশরগুলো যেন সাপের জিব। দেখতে খাসা কিন্তু সাপের মতোই বিষাক্ত।
বাসরাস্তা নীচে ফেলে আমরা ওপরে উঠছি তো উঠছিই। মনে হচ্ছে এই ভাবে পাহাড়টা পার হলে নতুন কোনো জায়গায় পৌঁছে যাব। কিন্তু আশ্চর্য, আমাদের কেউ একবারও ভাবল না, ইতিমধ্যে গাড়ি সারানো হয়ে গেলে ড্রাইভার আমাদের খুঁজে পাবে কী করে?
গাইডকে জিগ্যেস করা বৃথা। সন্ন্যাসী মশাইকে জিগ্যেস করলাম, শেষ পর্যন্ত বাসরাস্তায় ফিরে যেতে পারব তো?
উনি একবার একটা বড় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখে কিছু একটা হিসেব করে বললেন, নিশ্চিন্ত থাকো।
তারপর সার সার পাহাড়ের উপর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার অনুমান যদি ভুল না হয় তা হলে আর অল্পক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের ওপারে আরও একটা রাস্তা পাব।
আমি ভীতু শান্ত প্রকৃতির মানুষ। মনে মনে বললাম, নতুন রাস্তা পেয়ে কাজ নেই। তখন সন্ন্যাসী মশাই বললেন ঐ রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে নীচের রাস্তায় নামবেন। তিনি এ কথা বললে বিভাসও লাফিয়ে উঠবে। কিন্তু আমি তা চাই না। এখন গাড়িটা সারানো হয়ে গিয়ে থাকলে উঠে বসতে পারলে বাঁচি।
হঠাৎ দেখি আমাদের গাইড খুব ভয় পেয়ে ইশারায় আমাদের নীচে নেমে যেতে বলছে। নিজেও দাঁড়িয়ে থাকল না। এক-এক লাফে পাথর ডিঙিয়ে নীচের দিকে ছুটছে।
কী ব্যাপার? কী হয়েছে জিগমে?
ও অস্ফুট স্বরে কোনোরকমে বলল, বক্সী-বক্সী–
বক্সী! সে আবার কী? ভুটানিরা নাকি ভূতকে বক্সী বলে। এরাও কি বলে?
যদি সত্যিই ভূত বোঝাতেই ও বকসীবী বলছে তাহলে এখানে ভূত কোথায়?
আমি তিব্বতী মানুষটার দিকে তাকালাম।
দেখি তিনিও যেন কীরকম অন্যমনস্ক হয়ে গেছেন।
হঠাৎ এই সময়ে নিস্তব্ধ পাহাড়ের উপরে থেকে একটা শব্দ শোনা গেল। টানা শব্দ। অনেকটা যেন ঘোড়ার খুরের মতো–খটাখটখটাখটখটাখট–যেন অনেকগুলো ঘোড়া পাহাড়ের ওপর দিয়ে ছুটে আসছে।
শব্দটা সবাই শুনেছিলাম। তাই সকলেই থমকে গিয়েছিলাম।
পাহাড়ের ওপর এত ঘোড়া এল কোথা থেকে? যেন নিজের মনেই প্রশ্ন করল বিভাস।
এর উত্তর দিতে পারে একমাত্র আমাদের গাইড জিগমে গ্যাসো আর তিব্বতী পণ্ডিত থুমি সামভোতা। কিন্তু গ্যাটসো যেন কেমন হয়ে গেছে আরআর–আশ্চর্য, সন্ন্যাসী মশাই এর মুখ ফ্যাকাশে।
