তিব্বতী মানুষটি খুশি হয়ে বললেন, দেখেছেন নিশ্চয়ই। কলকাতার কোনো মানুষ যাদুঘর দেখেনি তা হতেই পারে না। তা কবার দেখেছেন?
বিভাস তড়বড় করে বলল, তা অনেকবার।
বেশ। সব ঘরে ঢুকেছিলেন?
হ্যাঁ, তা তো নিশ্চয়ই। টিকিট কেটে যখন যেতে হয়েছিল তখন সবকিছুই তো দেখব।
ঘুরে ঘুরে সব দেখতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল?
বিভাসকে বলতে না দিয়ে আমিই বললাম, তা অনেকক্ষণ।
শুনে ভদ্রলোক মুচকে একটু হাসলেন।
মমি দেখেছিলেন?
বাবাঃ! মমি দেখার জন্যই তো যাওয়া। দেখলে গায়ের মধ্যে কেমন শিরশির করে ওঠে। কত যুগ আগের বাসি মড়া।
সামভোতা মুখ টিপে একটু হাসলেন। বললনে, ঐ মমি দেখার জন্যেই আমি কলকাতায় ছুটে আসি।
শুধু মমি দেখার জন্যে এতবার কলকাতায় আসেন! অবাক হয়ে আমরা পরস্পরের দিকে তাকালাম। এ আবার কীরকম কথা!
হ্যাঁ, শুধু মমি দেখার জন্যেই বার বার আসি। তোমাদের সঙ্গে তফাত এই যে, তোমরা মমি দেখতে আস আর আমি মমির কাচের কেসের মধ্যে কিছু খুঁজতে আসি।
কিন্তু ওরা আপনাকে কি কেসের গায়ে হাত দিতে অ্যালাউ করে?
করে না বলেই তো বারবার আসতে হয়।
কেসের মধ্যে কী খোঁজেন?
সেটা এখনই এই ট্রেনের মধ্যে বলা যাবে না। পরে বলব। এখন বলো তোমরা কোথায় যাচ্ছ?
আমরা দুজনে আবার পরস্পরের দিকে তাকালাম। অর্থাৎ বলে ফেলা উচিত হবে কিনা। গোপনীয়তা কিছুই নেই। উদ্দেশ্যও তেমন নেই। হয়তো বিচক্ষণ লোকটি হাসবেন। তবু বলেই ফেললাম, এমনি পাহাড়ে ঘুরতে।
সামভোতা আবার একটু হাসলেন। বললেন, ভারতবর্ষে কি পাহাড়ের অভাব আছে? তা হলে উত্তর দিকেই কেন? কোথায় যাবে?
বললাম, আমার এই বন্ধুটি, বিভাস, অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসে। দুর্গম নির্জন পাহাড়ি জায়গাই ওর পছন্দ। তাই ওর কথামতোই আপাতত আমরা যাব মানালি। সেখান থেকে গাড়ি পাই তো ভালোই। না হলে হিমাচল পর্যটনের বাস। সেই বাসে বিখ্যাত রোটাং পাস। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
সামভোতা উৎসাহ দিয়ে বললেন, খুব ভালো। রোটং পাসেই থেমে যেও না। গাড়ি যদি পাও, মানালিতে টাটা সুমো, টয়োটা কোয়ালিস এসব আধুনিক গাড়ি পেয়ে যাবে, তাহলে আরও উঁচু গিরিব পার হয়ে চলে যেও লাদাখ পর্যন্ত।
একটু থেমে বললেন, তা তোমরা এই পথটা ধরলে কেন? অন্য পথও তো ছিল শ্রীনগর থেকে। সেখান থেকে বাসে সোনমার্গ হয়ে জোজিলা গিরিপথ পেরিয়ে কার্গিলে। সেখানে রাত্রিবাস করে পরের দিন ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় লে। আমার তো মনে হয় এ পথটা অনেক কম হত। শত্রুপক্ষের গোলাগুলি ছাড়া অন্য ভয় নেই।
অন্য ভয়? চমকে উঠলাম দুজনেই। জিগ্যেস করলাম, অন্য ভয় বলতে?
প্রাজ্ঞ মানুষটি শান্তভাবে বললেন, পথটা তো দুর্গম। তাছাড়া বহুকাল আগের বহু ঘটনার সাক্ষী। কিন্তু–না, তোমারা ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছ। এখন আমার ইচ্ছে করছে আমিও তোমাদের সঙ্গে যাই।
অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, সত্যিই আপনি যাবেন? অবশ্য শুধু শুধু কষ্ট করে, পয়সা খরচ করে কেনই বা যাবেন?
সামভোতা এতক্ষণ নিজের সিটে গা এলিয়ে বই হাতে বসেছিলেন। এবার সোজা হয়ে উঠে বসলেন। বললেন, ঐ পথে এর আগে আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু যেজন্য গিয়েছিলাম তা সফল হয়নি। আরও যেতে হবে। হয়তো বার বার।
সাহস করে বললাম, আপনি বিরক্ত না হলে বলি ঐ রাস্তার এমন কী আকর্ষণ আছে। যে আপনাকে আবার যেতে হবে?
পণ্ডিত ব্যক্তিটি অল্পক্ষণ চুপ করে চোখ বুজিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ঐখানেই সেই বহু যুগ আগের পথ–যাকে বলা হত প্রাচীন সিল্করুট। ঐ পথ দিয়েই তো যাতায়াত করত হুন উপজাতির দল। সেই পথটা খুঁজে পাবার পর আরও অনুসন্ধান করার জায়গা আছে…এটা কোন স্টেশন এল?
আজিমগঞ্জ জংশন।
এতক্ষণে আজিমগঞ্জ।
হেসে বললাম, তবু তো বেশ তাড়াতাড়ি এসেছি। আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে আমাদের মনে হচ্ছে সময় কোথা দিয়ে কেটে গেল। কিন্তু পুরনো পথ ছাড়াও আর কী খুঁজতে চান?
আসল কথা হচ্ছে, আমার ওপর বরাবর কর্তৃত্ব করে এসেছে ইতিহাস। আর সে ইতিহাস শুধু ভারতের বা ইউরোপের নয়, মধ্য এশিয়ার মোঙ্গোলীয়দের নিয়ে। আর আমার ইতিহাসের নায়ক হচ্ছে চেঙ্গিস খান যাঁর আসল নাম ছিল তেমুচিন। পরে যখন মোঙ্গল জাতির প্রধান হয়ে উঠলেন তখন ওঁর নাম হল চিঙ্গীজ খান। চিঙ্গীজ কথার অর্থ অসাধারণ শক্তিশালী আর খান বলতে বোঝায় নেতা। কালে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের উচ্চারণের ফেরে চেঙ্গীজ খান শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় চেঙ্গিস খান। তোমরা চেঙ্গিস খানের নাম শুনেছ তো?
আমরা দুজনেই বলে উঠলাম, নিশ্চয়ই। চেঙ্গিস খান, তৈমুরলঙ্গ এঁরা ইতিহাসের কলঙ্ক। ওঁদের অত্যাচারের কথা কেউ ভুলবে না।
থুমি সামভোতা বললেন, চেঙ্গিস খান শুধু একজন মহা যোদ্ধা বা অত্যাচারী ছিলেন না, তাঁর মৃত্যু ও পারলৌকিক ক্রিয়াকলাপও ছিল রহস্যময়।
রহস্যময়!
হ্যাঁ। কিন্তু সেই রহস্যের কথা এখুনি বলব না। তবে জেনো যতদিন সামর্থ্য থাকবে ততদিন সেই রহস্য সমাধান করার চেষ্টা করে যাব।
সেইজন্যেই কি আমাদের সঙ্গে যেতে চাইছেন?
হ্যাঁ। বুঝতেই পারছ ওসব জায়গায় একা যাওয়া যায় না। যেতে হয় দলবদ্ধ হয়ে।
আপনাকে যদি সঙ্গে পাই তাহলে খুব খুশি হব।
বিভাস আরও একটু যোগ করল, শুধু খুশি হওয়াই নয় স্যার, আমরা উৎসাহ পাব, বিপদে পড়লে আপনার মতো ধীর শান্ত বিচক্ষণ মানুষের পরামর্শ উপদেশ পাব। তা ছাড়া রহস্য আমরাও ভালোবাসি।
