সোলাং পেরিয়ে এসেছি। রাস্তার ধারে দেবদারু আর ওক গাছ। বরফঢাকা চুড়ো কখনও সামনে কখনও পিছনে। সামনে চড়াই। … এইভাবে চলতে চলতে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে একটুকরো সমতল ভূমি মাঢ়িতে এসে পৌঁছেছিলাম। এরপর টানা চড়াই প্রায় ষোলো কিলোমিটার। কিন্তু এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য স্থান রোটাং গিরিপথের মুখে গাড়িটা খারাপ হয়ে গেল। গাড়ির আর দোষ কী? যা লম্ফঝম্ফ!
কিন্তু স্বল্পভাষী গাইডটি অস্পষ্ট হিন্দিতে নিজের মনেই বিড় বিড় করে যা বলল তার অর্থ দাঁড়ায়–হঠাৎ গাড়ি খারাপ হওয়া লক্ষণটা ভালো নয়।
একপক্ষে ভালোই হল। সেই কখন মানালি থেকে রওনা হয়েছিলাম। একঘেয়ে গাড়ির মধ্যে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। একেবারে খাস হিমালয়ের বুকে পা রেখে একটু চলাফেরা করে হাত-পা ছাড়িয়ে নেওয়া মন্দ কী!
গাড়ির ড্রাইভার ছাড়া আমি, আমার কলকাতার বন্ধু বিভাস, একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থুমি সামভোতা, আর একজন গাইড জিগমে। জিগমে জোয়ান মরদ। তিব্বতী। চওড়া চোয়াল, ছোটো ছোটো চুল। চ্যাপ্টা মুখ। ফ্যাকাশে রঙ। মানালিতে যে হোটেলে ছিলাম, দুই বাঙালি আনাড়ি বন্ধু হিমালয় ভ্রমণে (ভ্রমণ নয়, একরকম রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার) যাচ্ছি জেনে সেই হোটেলের বাঙালি ম্যানেজার অনুগ্রহ করে তার চেনা এই তিব্বতী ছেলেটিকে গাইড হিসেবে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, জানি গাড়ি নিয়ে যাবেন। কিন্তু কোথাও কোথাও হাঁটতেই হবে। হাঁটার অসুবিধে যে কোনো মুহূর্তে ভুল পথে চলে যাওয়া। তা ছাড়া কোথায় খাবার পাবেন, কোথায় পানীয় জল পাবেন, কোন ফুল দেখতে সুন্দর কিন্তু বিষাক্ত–সে সব এর নখদর্পণে। তারপর কোন জায়গাটা কতখানি দূরে তা আপনারা আন্দাজও করতে পারবেন না।
আপত্তি করিনি। কেননা এই অচেনা, অজানা দুর্গম পাহাড়ি পথে, দুবেলা খেতে দেওয়া আর রোজ হিসেবে পাঁচ টাকা দিলেও লাভ বই লোকসান নেই।
বিভাস আমার সঙ্গে কলকাতার একই মেসে থাকে–একই ঘরে। আমারই মতো চাকুরে। মনের মিলও খুব। তবে আমার চেয়ে ওর স্বাস্থ্য অনেক ভালো। আর স্বাস্থ্য ভালো বলেই সাহসও বেশি। তবে দুজনের হবি দুরকম। আমি পছন্দ করি ঘরে বসে লিখতে, দেশ বিদেশের ওপর লেখা বই পড়তে। আর ওর নেশা ভ্রমণের। দুর্গম পথে। মাঝে মাঝে দুঃখ করে, এদেশে যদি আফ্রিকার জঙ্গলের মতো দুর্ভেদ্য জঙ্গল থাকত। কিংবা ক্ষ্যাপা সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে সাঁতার কেটে কোনো অজানা নির্জন দ্বীপে গিয়ে অসভ্য জাতির মতো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারতাম!
সত্যি কথা বলতে কি, হাওড়া থেকে দিল্লি-কালকা মেলে চেপে ভোরে চণ্ডীগড়। তারপর মানালির বাস। তারপর মানালি থেকে রোটাং পাস। সম্ভব হলে আরও উঁচুতে ওঠার গোটা পরিকল্পনাটাই বিভাসের। মন থেকে আমার বিশেষ সায় ছিল না। কিন্তু বিধির ব্যবস্থা কী তা আগে কে জানতে পারে। নইলে দিল্লি কালকা মেলের একটা কামরায় হঠাৎই বা যোগাযোগ হবে কেন থুমি সামভোতার মতো একজন জ্ঞানতপস্বীর সঙ্গে? বয়েস ষাটের কাছে হলেও শরীর মজবুত। কোনোরকম রোগের লক্ষণ নেই। বিভাস ওঁর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। তারপর ফিসফিস করে বলেছিল, তিব্বতী ভদ্রলোক। নিশ্চয় যোগব্যায়াম বা প্রাণায়াম জাতীয় কিছু করেন। নইলে এই বয়সে অত সুন্দর চেহারা হয় কী করে?
ফর্সা রঙ। ন্যাড়া মাথা। গেরুয়া রঙের কাপড়ের টুপি। পরনে গেরুয়া আলখাল্লা, গায়ে মেটে রঙের ফতুয়া আর বুক, পিঠ, জানু ঘিরে আড়াআড়ি ভাবে হলুদ চাদর। রিজার্ভড সিটে গা এলিয়ে নিশ্চিন্তভাবে তিনি পড়ছিলেন একটা ইংরিজি বই–History of Mongolians. মোঙ্গল জাতির ইতিহাস। বইটি যে বিদেশে প্রকাশিত তা মলাটের জৌলুস আর পরিচ্ছন্নতা দেখলেই বোঝা যায়।
ভদ্রলোকের শান্ত, সৌম্য, গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারা। দেখলে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে।
তিনি যে শুধু ইতিহাসই চর্চা করেন তা নয়। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে বুঝলাম তিনি রীতিমতো একজন পণ্ডিত লোক। জ্ঞানের গভীরে যেন ডুবে রয়েছেন। কথায় কথায় যখন জানতে পারলাম সংস্কৃত থেকে তিব্বতী ভাষায় পুঁথি অনুবাদ করেছেন তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। তিনি যে একজন তিব্বতী মাত্র নন, প্রতিবেশী দেশগুলি যেমন চিন, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ প্রভৃতির সঙ্গে রীতিমতো সাংস্কৃতিক যোগ রাখেন তা তার কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারলাম। আর তিনি যখন জানালেন যে, কলকাতায় শুধু এবারই নয়, অনেকবার এসেছেন তখন তার মুখে বাংলা কথা এত সহজে সরে কী করে তার কারণ বুঝতে বাকি রইল না।
তারপর যখন আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম তখন জিগ্যেস করতে সাহস হল, কী জন্যে তিনি সুদূর তিব্বত থেকে বার বার কলকাতায় ছুটে আসেন? উত্তরে তিনি শুধু একটু মুখ টিপে হাসলেন। তারপর একটু যেন ভেবে বললেন, আপনাদের কলকাতার সবচেয়ে মূল্যবান অ্যাসেট কী বলুন তো?
বিভাস জিগ্যেস করল, আপনি কী দর্শনীয় স্থানের কথা বলছেন?
ধরুন তাই।
এবার আমরা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। কলকাতাতেই থাকি তবু কি কলকাতা শহরটা ভালো করে দেখতে পেরেছি? কত ঐতিহাসিক জায়গা আছে–
বাধা দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, কলকাতার মিউজিয়ামটা আপনারা দেখেছেন নিশ্চয়ই?
কোনোরকমে মাথা দুলিয়ে সায় দিলাম। (সত্যি কথা বলতে কি কবে কোন ছোটবেলায় একবার কি দুবার দেখেছিলাম, তারপর যাদুঘরের পাশ দিয়ে হাজার বার গেলেও ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে বা সময় হয়নি)।
