শুভা চমকে উঠল। শিখার গলা।–একেবারে ঘরের মধ্যে।
ভাগ্যি তোর বাবা এসে পড়েছিল। কিন্তু এবার আর কারো সাধ্য নেই বাঁচায়। কালই তোকে মারব। বলতে বলতে স্বরটা যেন ফ্যানের হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
পরের দিন। সকাল থেকেই শুভা মা-বাবার কড়া পাহারায়। শুধু মা-বাবাই নন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও বারে বারে আসছে-যাচ্ছে। কেবলই লক্ষ্য রাখছে শুভার ওপর। এ যে অবিশ্বাস্য ব্যাপার! অথচ উড়িয়ে দিতেও পারছে না। শুভা কিন্তু বিরক্ত হচ্ছে। সে কী চিড়িয়াখানার নতুন কোনো জন্তু যে সবাই তাকে দেখে যাচ্ছে? রাগ করে সে ঘরে খিল দিল।
বেলা তখন প্রায় একটা। অনাদিবাবু পুরনো খবরের কাগজ বিক্রি করছিলেন বাইরের ঘরে বসে। শুভার মা বাথরুমে। হঠাৎ অনাদিবাবু শুনলেন রাস্তায় একটা হৈচৈ গেল গেল–গেল
তিনি একলাফে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন দুটো ট্যাক্সি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আর সেখানে লোকের ভিড়। একটু পরেই কারা একটি মেয়েকে ধরাধরি করে নিয়ে এল।
শীগগির একটু জল!
না, শুভা মরেনি। দুটো ট্যাক্সির মুখে পড়েও আশ্চর্যভাবে বেঁচে গেছে।
জ্ঞান ফিরে আসার পর শুভা অল্প দু-একটা কথা যা বলল তা এই
খিল বন্ধ করে জানলায় দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ দেখল সেদিনের সেই মেয়েটা খুব সেজে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হি-হি করে হাসছে। কে এই মেয়েটা, কোথায় তার বাড়ি, কেনই বা তাকে দেখলেই হাসে জানার জন্যে সে তখনি খিড়কির দরজা দিয়ে ছুটে গিয়েছিল। তারপর আর কিছুই মনে নেই।
.
কয়েকটা মাস বেশ ভালোভাবেই কাটল। আর কোনো উপদ্রব নেই। শুভা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আজকাল সবার সঙ্গে গল্প করে, হাসে। ওকে ভুলিয়ে রাখার জন্যে ওর মা এখন ওকে সংসারের টুকিটাকি কাজ দেন।
সেদিন বেলা তখন সাড়ে এগারোটা। অনাদিবাবু বললেন, শুভা, একটু চা করো তো। বলে নিচে নেমে গেলেন। শুভার মা গেলেন ঠাকুরঘরে। দোতলাটা একেবারে ফাঁকা। নিস্তব্ধ। শুভা রান্নাঘরে এসে স্টোভ জ্বালিয়ে চায়ের জল চড়িয়ে দিল। একটু পরে তার শরীরটা কেমন করে উঠল। মনে হলো যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে। মাথাটা ঝিঁঝিম্ করছে। শুভা উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘরের সামনের বারান্দাটার দিকে তাকাল-খাঁ খাঁ করছে। সামনের ঘরগুলোও ফাঁকা। এরকম তো রোজই ফাঁকা থাকে। কিন্তু আজ কেন এত ভয় করছে? মনে হচ্ছে যেন বাড়িতে কেউ নেই। সবাই তাকে ফেলে পালিয়ে গেছেন। মনে হচ্ছে এটা যেন কোনো ভুতুড়ে বাড়ি।
শুভা কেমন যেন ভয় পেয়ে গোঙাতে লাগল। মনে হতে লাগল এখুনি সে বুঝি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে।
আর ঠিক সেই সময়ে সে স্পষ্ট দেখল তার সামনে শিখা দাঁড়িয়ে। রান্নাঘরের দোরগোড়ায়। দুচোখে আগুন-ঝরা দৃষ্টি। একরাশ কালো চুল বাতাসে উড়ছে।
–দুবার বেঁচে গেছ। এবার রেহাই নেই। বলে শিখা দুহাত বাড়িয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল। আর শুভা পিছোতে লাগল জ্বলন্ত স্টোভের দিকে। ক্রমশ আগুনের তাত তার গায়ে লাগল। তবু পিছোচ্ছে শুভা। না পিছিয়ে উপায় নেই। শিখা রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে।
চিৎকার করতে গেল শুভা, পারল না। ঠিক এই মুহূর্তে বাইরের ঘরের দরজায় কলিংবেল বাজল–কি-রিং-কি-রিং–
শুভা শুনতে পেল বাবা দরজা খুলে দিলেন। শুনতে পেল, কাকে যেন সাদর অভ্যর্থনা করছেন–আসুন–আসুন।
সেই সঙ্গে আরো শুনতে পেল কোনো মহিলার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, শীগগির আমায় ওপরে নিয়ে চলুন।
সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের শব্দ। কে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসছে। শুভা যেন জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। দেওয়াল ধরে সামলে নিল কোনোরকমে। না, শিখা নেই। শুভা তবু ভয়ে ভয়ে তাকাল। দেখল সামনে ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতে মাতাজি দাঁড়িয়ে।
মাতাজি হেসে বললেন, ভয় নেই। ও আর কোনোদিন আসবে না। আজ ওর আত্মা মুক্তি পেয়ে গেল।
ততক্ষণে শুভার মা-বাবাও এসে পড়েছেন। তাঁরা অবাক হলেন, রান্নাঘরের কাছ থেকে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভুরভুর করে আসছে।
ওরা চলেছে নিঃশব্দে
ট্রেনে নতুন সঙ্গী
হিমালয় আমাকে বরাবর টনে। সেই টানে আমি কখনও গিয়েছি দার্জিলিং, কখনও শ্রীনগর। শ্রীনগর থেকে সোনমার্গ, গুলমার্গ, পহেলগাঁও। আবার এদিকে হিমালয়ে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। এসব জায়গায় যাওয়ার অসুবিধে ছিল না। পাহাড়ের বুক চিরে ঝকঝকে তকতকে রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে যাত্রীবোঝাই বাস নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট জায়গায়। খাওয়া-দাওয়ার কোনো অসুবিধে নেই। মাঝে-মাঝেই হোটেল। চা-কফি থেকে ভাত-ডাল-রুটি-মাংস সবই পাওয়া যায়।
কিন্তু এবার হিমালয়ের যেখান দিয়ে যাচ্ছি সে পথ খুবই বিপদসংকুল। সংকীর্ণ পথ, একজন কোনোরকমে পা ফেলে চলতে পারে। তাও পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁষে। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। নাম জানতে পারিনি। তবে স্রোতের গতি দেখলেই বুক কঁপে। একবার পা ফসকালে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এ দুর্ভোগে পড়তে হবে কে ভেবেছিল! মাঢ়িতে টাটা সুমো থেকে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে, কেউ আলু-পরোটা, কেউ ব্রেড-বাটার-ওমলেটের সঙ্গে গরম চা কিংবা কফি খেয়ে ফের গাড়িতে উঠে পড়েছিলাম নিশ্চিন্ত মনে। রাস্তা বলে কিছু নেই। কখনও শুকনো নদীখাতে, কখনও বা পাথরের ওপর দিয়ে ডাইনে, বাঁয়ে টাল খেতে খেতে গাড়ি এগিয়ে চলছিল। আমাদের গন্তব্যস্থল লে। লাদাখের রাজধানী। লাদাখ নাম হল কেন? কোন বই-এ যেন পড়েছিলাম লা শব্দটার মানে গিরিবর্ক্স বা পাহাড়ি রাস্তা। আর দাখ মানে দেশ। লাদাখ মানে তাই গিরিবক্সের দেশ।
