সঙ্গে সঙ্গে শুভার শরীরটা কেমন করে উঠল। যেন ইলেকট্রিকের শখ খেল।
.
তারপর একদিন।
গভীর রাত। আকাশে মেঘ থমথম করছে। শুভার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কেবলই এপাশ-ওপাশ করছে। পাশের ঘরেই বাবা ঘুমোচ্ছন। এখান থেকেই নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শুভার মনে হলো সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষই বুঝি ঘুমোচ্ছে। জেগে শুধু সে একা।
ভাবতে ভাবতে কখন একসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল কতকগুলো কুকুরের ডাকে। কুকুর তো ডাকতেই পারে। অমন কত দিন কত রাত্রে কত কুকুর ডেকে গেছে। কিন্তু আজকের ডাকটা যেন কেমন। যেন প্রচণ্ড ভয়ে কুকুরগুলোর গলা কাঁপছে। কুকুরের ডাকটা ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল। আর তারপরেই শুভার ঠিক মাথার জানলাটায় শব্দ হলো খট-খট-খ। সেই সঙ্গে ঝড়ের গোঙানি।
ঝড়েই কি জানলা খটখট করছে?
শুভা ধড়মড় করে হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথা তুলে জানলার দিকে তাকাল। কি যেন দেখল। সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত দেহটা অবশ হয়ে গেল। একটা ছায়ামূর্তি। ঠিক যেন–ঠিক যেন–
কিরে চিনতে পারছিস? জানলার গ্রিলটা ধরে বাইরে ঝুলছে শিখা। ঝোড়ো হাওয়ায় তার লম্বা চুলগুলো উড়ছে। মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু গলার স্বর পরিষ্কার। চিনতে না পারিস তো মনে করিয়ে দিই। আমি তোদর সেই শিখা। তোর জন্যেই আমাকে ইস্কুল ছাড়তে হয়েছিল। তোর জন্যেই অনেক অপমান। প্রতিশোধ তখন নিতে পারিনি। এখন নেব। আজ আমার মৃত্যুদিন। তাই দেখা করে গেলাম।
শিখা একটু থামল। জানলার গ্রিলে মাথাটা রেখে কেমন একরকম চোখ বের করে তাকাল। তারপর বলল, আজ থেকে সাত দিনের মধ্যে তোকে মারবই। কথাটা জানিয়ে গেলাম।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। সেইটুকু আলোয় শুভা দেখল কী যেন একটা হাওয়ায় সাঁতার কেটে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শুভা চিৎকার করে উঠল।
ব্যাপারটা সবাই শুনল। এটা যে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না সে বিষয়ে সকলেই নিঃসন্দেহ। তবু সাতটা দিন সবাই শুভকে সাবধানে থাকতে বলল। শুভা বিমর্ষ গলায় বলল, কী আর সাবধান হব?
ছটা দিন কেটে গেল। এতটুকু অশুভ ছায়া নেই। রাত্তিরে সেই যে কুকুরের ডাক শুনেছিল, সে ডাকও আর শোনা যায়নি। এমন কি ঘুমেরও ব্যাঘাত হয়নি। কিন্তু পরের দিন–
দিনের বেলা। ঘড়িতে তিনটে বাজল। রোজকার মতো শুভা দোতলার ছাদে উঠল শুকনো কাপড় তুলতে। একমনে কাপড় তুলে যাচ্ছিল। লক্ষ্য পড়ল, কয়েকটা বাড়ির পরে যে বাড়িটা, তার ছাদে দাঁড়িয়ে তারই বয়সী একটি মেয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মেয়েটিকে শুভা চিনতে পারল না। কোনোদিন দেখেছে বলেও মনে হলো না। সে একটা একটা করে শাড়ি, ব্লাউজ, ধুতি আলসে থেকে তুলতে লাগল। কিন্তু মুশকিল হলো বাবার গেঞ্জিটা নিয়ে। গেঞ্জিটা উড়ে পড়েছে কার্নিসের ওপর। একটু জোর বাতাস পেলেই পড়বে রাস্তার নর্দমায়। অথচ আলসে থেকে ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়ালেও নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। শুভা একটা লাঠি বা লম্বা কাঠি খুঁজল। কিন্তু তেমন কিছু পেল না। নিচে গিয়ে কিছু একটা নিয়ে এলেই হয়, কিন্তু শুভার আর নিচে নামতে ইচ্ছে করল না। ঠিক করল গেঞ্জিটা নিয়ে অবে যাবে।
কিন্তু নেবে কি করে? ওটা যে নাগালের বাইরে। নিতে গেলে তাকে আলসে টপকে ঐ সরু কার্নিসের ওপর নামতে হয়। আর ওখানে নামা মানেই হয় কার্নিস ভেঙে, না হয় মাথা ঘুরে একেবারে রাস্তায় পড়ে যাওয়া। পড়লে আর রক্ষে নেই।
শুভা আলসের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেঞ্জিটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল। তার মনে হলো পড়ে যাওয়া কি এতই সোজা? সার্কাসে সে শূন্যে দোল খাওয়ার কত খেলা দেখেছে। তারাও তো তারই মতো মেয়ে। তারা কি পড়ে যায়? তারা যদি অমন মারাত্মক খেলা খেলতে পারে তাহলে সে কেন কার্নিসে নেমে সামান্য একটা গেঞ্জি তুলে আনতে পারবে না?
কী করবে ভাবছে হঠাৎ লক্ষ্য পড়ল সেই মেয়েটার দিকে। সে হাসছে। আর আশ্চর্য হাত দিয়ে ক্রমাগত ইশারা করছে কার্নিসে নামার জন্যে। এবার শুভা আর কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। লোকে যেমন করে ঘোড়ায় চাপে তেমনি করে পরনের শাড়িটা গুটিয়ে আলসের ওপর চেপে বসল। সে যে কী অদ্ভুত দৃশ্য! তারপর যেই ডান পা-টা বাড়িয়ে দিয়েছে মরণ-ফঁদের দিকে অমনি কে যেন কঠিন স্বরে ডাকল, শুভা! নেমে এসো শীগগির!
শুভা চমকে উঠে দেখল ছাদে কখন বাবা উঠে এসেছেন। বাবাকে দেখে তার যেমন আনন্দ হলো তেমনি ভয় হলো। তার মনে হলো সে যেন ইচ্ছে করে কত বড়ো অপরাধ করতে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি আলসে থেকে নেমে মাথা নিচু করে নিচে নেমে গেল।
.
কদিন মোটামুটিভাবে কাটল। শুভার মানসিক অবস্থার কিন্তু উন্নতি নেই। বরং আরো একটু খারাপ হয়েছে। যখন-তখন ছাদে যাচ্ছে। সেই মেয়েটাকে আর একবার দেখতে চায়। অনাদিবাবু শেষে বাধ্য হয়ে ছাদের সিঁড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন।
সেদিন গভীর রাতে আবার সেই কুকুরের ডাক। শুভার ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকার ঘর। তার কিরকম ভয় করল। পাশেই মা শুয়েছিলেন। শুভা অন্ধকারে মাকে একবার ছুঁলো। একটু পরে মাথার কাছে জানলায় চুক চুক শব্দ। কে যেন বন্ধ জানলাটা খুলতে বলছে। শুভার দেহ হিম হয়ে গেল। মাকে। ডাকতে গেল। স্বর বেরোল না।
–খুব বেঁচে গেলি সেদিন।
