শুভার মা বললেন, তবে অশান্তি বাধাত একটি মেয়ে–শিখা। গাজিয়াবাদ না কোথা থেকে নতুন এসেছিল। যেমনি রূপ, তেমনি দেমাক। সে শুভাকে একেবারে সহ্য করতে পারত না। ও পড়াশোনায় ভালো, দেখতে খারাপ নয়, সবাই ওকে ভালোবাসত। আর শিখা হিংসেয় জ্বলে পুড়ে মরত। আশ্চর্য!
মাতাজি হেসে বললেন, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এক ধরনের মানুষ থাকে যারা স্বভাবতই ঈর্ষাপরায়ণ। তারা কাউকে সুখী হতে দেয় না, নিজেও সুখী হতে পারে না।
একটু থেমে বললেন, মেয়েটিকে কি আপনি কখনো দেখেছিলেন?
-হ্যাঁ, একবারই।
মেয়েটি কি খুব বেপরোয়া?
খুবই। টিচারদেরও নাকি মানত না।
মাতাজি টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন, হাতে ছড়ি জাতীয় কিছু নিয়ে বেড়াতে ভালোবাসত? পায়ের কাছে ঢিল পেলে কুড়িয়ে নিয়ে অকারণে কুকুর, ছাগল মারত?
শুভার মা হেসে বললেন, অত বলতে পারব না। তবে বিরাট একটা কুকুর নিয়ে ঘুরত। একদিন শুতাকে রাস্তায় একা পেয়ে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যি ঠিক সেই সময়ে মেয়েটার দাদা এসে পড়েছিল। তাই শুভা বেঁচে গিয়েছিল।
– যাক, একটা বড়ো রকমের অ্যাকসিডেন্ট থেকে আপনার মেয়ে বেঁচে গিয়েছে। আচ্ছা, সে কি আপনার মেয়েকে কোনোভাবে টিজ করত?
–নিশ্চয়। তার টিজ করার জ্বালায় তো শুভকে ইস্কুল ছাড়তে হতো।
–কিরকম টিজ করত একটু বলুন।
–সে আর কত বলব। দল পাকিয়ে ওর বিরুদ্ধে নানা কথা রটাত, অঙ্গভঙ্গি করে ভ্যাঙাত। সিঁড়ি দিয়ে হয়তো নামছে–শিখা ওপর থেকে এসে হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে চলে যেত। এমনি কত। শুভা তো সব বলত না।
মাতাজি মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন–মেয়েটি এখন কোথায়? নিশ্চয়ই এখানে নেই?
শুভার মা বললেন, ঠিকই বলেছেন। ওরা এখন আর এখানে নেই। ইস্কুল ছেড়ে দেবার পরই চলে যায়।
–ইস্কুল ছেড়ে দিল কেন?
–সেও এক কাণ্ড। একদিন শিখা টিফিনের সময়ে আর একটা মেয়ের বই চুপি চুপি নিয়ে শুভার ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে চোর সাজাবার চেষ্টা করে। মেয়ে তো কেঁদেকেটে অস্থির। এই নিয়ে তুলকালাম। একটি মেয়ে বুঝি শিখার কাণ্ডকারখানা দেখে ফেলেছিল। সেই সব ফাঁস করে দেয়। শিখা ছুটে গিয়ে সেই মেয়েটার গলা টিপে ধরে। মেরেই ফেলত। ভাগ্যজোরে বেঁচে যায়। হেডমিস্ট্রেস শিখার গার্জেনের কাছে কড়া ভাষায় চিঠি লিখলেন। ব্যস! তারপরই শিখা ইস্কুল ছেড়ে দিল।
মাতাজি বললেন, কিন্তু তাতেও অশান্তি ঘুচল না, কি বলুন?
–ওরে বাবা! অশান্তি ঘুচবে কি, আরো বেড়ে গেল। উড়ো চিঠি আসতে লাগল–পড়াশোনা না ছাড়লে শুভকে মরতে হবে। কী সাংঘাতিক কথা ভাবুন তো!
মাতাজি বললেন, শুভা নিশ্চয়ই ইস্কুল ছাড়েনি?
–সে মেয়েই নয়।
উড়ো চিঠির কথা পুলিশে জানিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। কিন্তু ওরা তখন এ তল্লাট থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়েছে।
মাতাজি চুপ করে ভাবতে লাগলেন।
শুভার মা বললেন, মেয়ের যে তারপর কী হলো–হাসি নেই–আনন্দ নেই–দিন দিন যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।
মাতাজি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আমি একবার আপনার মেয়ের সঙ্গে কথা বলব। আমি নিজেই যাচ্ছি ওর কাছে। আপনারা এখানেই থাকুন।
টেবিলের ওপর দুহাতের মধ্যে মুখ গুঁজে বসেছিল শুভা। মাতাজি ঢুকেই বললেন, রাত্তিরে তোমার ঘুম হয় না। নিশ্চয় তুমি ভয় পাও?
শুভা বিরক্ত হয়ে মুখ তুলে তাকাল। মাতাজি বলতে লাগলেন, আমি জানি যখনই তুমি একা থাক তখনই কিছু দেখতে পাও। ঠিক কিনা?
শুভা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
–উত্তর দাও?
এবার শুভা নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়াল। কোনোরকমে বলল, হ্যাঁ।
–কি দ্যাখ, পরিষ্কার করে বলো।
শুভা একটু চুপ থেকে বলল, তেমন কিছু নয়, ঘরে হয়তো একা পড়ছি, বাড়িতে কেউ নেই, মনে হলো কেউ যেন চট্ করে সরে গেল। কখনো মনে হয় পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। রাতে প্রায় কিরকম একটা শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি ঘরের মধ্যে কি যেন নড়ে বেড়াচ্ছে। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে যাই। বুকের মধ্যে কিরকম করে।
–মা-বাবাকে এ কথা বলেছিলে?
না।
–কেন?
–কেউ বিশ্বাস করবে না। উল্টে ঠাট্টা করবে। নইলে বলবে মানসিক ব্যাধি। আমি সায়েন্স-পড়া মেয়ে। আমি নিজেকে বুঝি। জানি এ আমার ব্যাধি নয়। কেউ একজন আমাকে মারবার চেষ্টা করছে।
মাতাজি শান্ত গলায় বললেন, কে মারবে তোমায়?
শুভার মুখটা হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে গেল। বলল, তা জানি না। তবে যে আমাকে রোজ ভয় দেখাচ্ছে সেই-ই আমায় মারবে।
মাতাজি চুপ করে তাঁর নিজের আঙটির মস্তবড়ো পাথরটা অকারণ নাড়তে লাগলেন। তারপর বললেন, আমি শুধু আর একটা কথা জিগ্যেস করব। তুমি কি এর মধ্যে কোনোদিন তোমার ইস্কুলের সেই মেয়েটিকে শিখা যার নাম–স্বপ্নে কিংবা অন্য কোনোভাবে দেখেছ?
শুভা অবাক হয়ে বলল, তা কি করে দেখব! ও তো আর এখানে নেই। কোথায় আছে তাও জানি না।
মাতাজি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, তাও হয়তো শীগগির জানতে পারবে। তবে আমার একটা কথা কিছুতেই ভয় পেও না। মনে রেখো দুষ্ট আত্মা ভয় দেখাতেই পারে, সজীব মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না, যদি না জীবিত মানুষ নার্ভাস হয়ে পড়ে।
কি-ন্তু- দুষ্টু আত্মার কথা বলছেন কেন? শুভার গলা কেঁপে উঠল। শিখা কি তবে–
–ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। আমি আজ যাচ্ছি। পরে আবার দেখা হবে। বলে শুভার মাথায় হাত রাখলেন।
