আসুন আমার অফিস ঘরে। বলে আমাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিলেন।
অনুগ্রহ করে বসুন।
আমরা বসতেই উনি টেলিফোনটা এগিয়ে দিলেন।
এই যে পুলিশ স্টেশনের নাম্বার। ওদের আসার অপেক্ষায় থাকব। আমায় অ্যারেস্ট করুন। আমি রেডি।
শান্তনু ফোনটা সরিয়ে দিয়ে বলল, আপনি দয়া করে শান্ত হন, মিস চিয়াং। আমরা তদন্ত করতে আসিনি। দাদুর কাছ থেকে সরিয়ে আপনাকে থানাতে পাঠাতেও নয়। যে রহস্যকে সঙ্গে নিয়ে এতদূর এসে পড়েছিলাম সেই রহস্যের সমাধান আজই হয়ে গেল। এখন কালই চলে যাব। কিন্তু একটা কথা–সেই পুলিশের প্রেতাত্মা আপনার দাদুর বডি খুঁজতে খুঁজতে আপনার হোম পর্যন্ত চলে এসেছে। জানেন তো?
জানি।
এখন বডিটাকে বাঁচাবেন কী করে?
জানি না। সপ্তাহে একদিন-দু’দিন বডিটাকে দেখে আসি। একটা তেল মাখাই। তবু দাদু মাঝে মাঝে কফিন থেকে বেরিয়ে পড়ে। যেমন আজ হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছিল। বোধহয় বুঝতে পেরেছে তার শত্রু কাছেই এসে পড়েছে। আমাকে সাবধান করতে চায়।
কিন্তু–
কিন্তু আমি আর কী করে সাবধান হব? বলুন–আপনারা বলুন—
বলতে বলতে মিস চিয়াং-এর দু’চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।
বললাম–ভয় নেই। আপনি পারবেনই। কারণ আপনার দাদুর দেহই বলুন আর আত্মাই বলুন আপনার ভালোবাসা পেয়ে অজেয় হয়ে উঠেছে। কোনো অশুভ শক্তির সাধ্য নেই সেই পবিত্র দেহের ক্ষতি করতে পারে।
কথা শেষ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।
ভোরের আকাশ তখন ফর্সা হয়ে আসছে।
[শারদীয়া ১৪১৫]
আতঙ্ক
হঠাৎ কলিংবেল বাজল। খুব আস্তে। বেল বাজানোর ধরন শুনেই বোঝা গেল অপরিচিত কেউ। নিশ্চয়ই ভদ্র, বিনীত। তবু অনাদিবাবু অবাক হলেন। এই অসময়ে কে আসতে পারে?
জায়গাটা কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকার কুঁদঘাট। একসময়ে পরিত্যক্ত ছিল। এখন দিন যত যাচ্ছে ততই লোকবসতি বাড়ছে। তবু এখনো এখানে-ওখানে বাঁশঝাড়, জলা-জঙ্গল। বাইরে থেকে এসে সে সময়ে অনাদিবাবু বুদ্ধিমানের মতো সামান্য টাকায় বাড়িটা করে ফেলেছিলেন। পাড়ার সকলেই পরিচিত।
এখন বেলা দুটো। অনাদিবাবু খেয়েদেয়ে কাগজ পড়ছিলেন। এমনি সময়ে কলিংবেল বাজল কি-রিং।
অনাদিবাবু উঠে দরজা খুলে দিয়ে প্রথমে কিছুটা অবাক হলেন। তারপরেই হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন, আসুন–আসুন।
সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীকে ডাকলেন, শুনছ? দেখে যাও কে এসেছেন।
ভদ্রমহিলাকে হঠাৎ দেখলে ভয় পেতে হয়। কুচকুচে কালো রঙ, মাথার চুল জট পাকিয়ে গিয়েছে। নাকটা থ্যাবড়া। চোখ দুটো গোল। একটু লালচেও। পরনে গেরুয়া কাপড়। কাছা দিয়ে পরা। হাতের ক্যাম্বিসের ব্যাগটা মাটিতে রেখে হাতজোড় করে অনাদিবাবুদের নমস্কার করে ইংরিজিতে বললেন, দেখা করতে এলাম।
অনাদিবাবু আর তাঁর স্ত্রী দুজনেই নমস্কার করে বললেন, আমাদের সৌভাগ্য। মাদ্রাজী এই মহিলাটির সঙ্গে অনাদিবাবু আর তাঁর স্ত্রীর পরিচয় হয়েছিল বছর তিনেক আগে দক্ষিণ ভারতে তিরুপতির পাহাড়ে। ভদ্রমহিলা দীর্ঘদিন ধরে প্রেতচর্চা করেন। শুধু প্রেতচর্চাই নয়, মনোবিকারগ্রস্ত লোকেদের ওপর
প্রচণ্ড শক্তিতে প্রভাব বিস্তার করতেও পারেন।
এর সঙ্গে পরিচিত হয়ে অনাদিবাবুরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে আসবার সময়ে অনাদিবাবু বলেছিলেন, মাতাজি, কলকাতায় যখনই আসবেন, আমার বাড়িতে একবার পায়ের ধুলো দেবেন।
মাতাজি কথা দিয়েছিলেন। গতবার দার্জিলিং যাবার পথে কলকাতায় এসে দেখা করেছিলেন। এবার যাচ্ছেন কাশ্মীর-পহেলগাঁও। যাবার পথে তাই দেখা করতে এসেছেন।
দুপুরবেলায় বিশ্রামের পর বিকেলে ওঁরা তিনজন বসে গল্প করছেন, শুভা কলেজ থেকে ফিরল। তাকে দূর থেকে দেখেই মাতাজি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। অনাদিবাবু বললেন, আমাদের মেয়ে শুভা, একটিমাত্র মেয়ে।
শুভা ভুরু কুঁচকে মাতাজিকে একবার দেখেই চলে যাচ্ছিল, শুভার মা ডাকলেন, ও কি! চলে যাচ্ছ কেন? প্রণাম করো। সেবার সাউথে গিয়ে এঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।
শুভা কোনোরকমে প্রণাম করে বেজার মুখে দাঁড়িয়ে রইল। মাতাজি যেন কেমন একরকমভাবে শুভকে দেখছিলেন।
–আপনাদের মেয়ে? তিরুপতিতে তো দেখিনি। আগের বার এসেও দেখিনি।
অনাদিবাবু বললেন, তিরুপতিতে ও যায়নি। আর যেবার আপনি এখানে এসেছিলেন তখন ও ছিল ওর মামার বাড়িতে।
মাতাজি শুভকে দেখতেই লাগলেন। শুভার মা বললেন, শরীরটা ওর মোটেই ভালো যাচ্ছে না। দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছে। খাওয়া একরকম বন্ধ। সব সময়ে কী ভাবে। আর মেজাজ
মায়ের কথার মাঝখানেই শুভা বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিল, মাতাজি সস্নেহে ওর হাতটা চেপে ধরে ইংরিজিতে বললেন, রাতে তোমার বোধহয় ভালো ঘুম হয় না। তাই না?
শুভা এক মুহূর্তের জন্যে অবাক হয়ে মাতাজির দিকে তাকাল। তারপর জানি না বলে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।
শুভার মা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখলেন তো কিরকম অভদ্র! কিন্তু এরকম ও ছিল না। বছর চারেক থেকে ও যেন কেমন হয়ে উঠছে।
বছর চারেক? এখন তো ও কলেজে পড়ছে। তাহলে তখন
–তখন ক্লাস নাইনে পড়ত। পড়াশোনায় খুব ভালো। ধীর, শান্ত
বাধা দিয়ে মাতাজি বললেন, ইস্কুলে কি ওর কোনো অশান্তি ছিল?
শুভার বাবা বললেন, না, অশান্তি আর কি। পড়াশোনা নিয়েই থাকত। তবে–
এই পর্যন্ত বলে তিনি শুভার মায়ের দিকে তাকালেন।
