আশ্চর্য! মিস চিয়াং-এর কিন্তু ব্যস্ততা নেই। অনেক পিছনে তিনি হন্তদন্ত হয়ে আসছেন। মুখে ভয়ের ছাপ–কিন্তু কৃত্রিম। তাঁর মুখে ভয় কিন্তু অন্তরে নয়।
কী ব্যাপার, মিস্টার রায়? কিছু কি দেখতে পেলেন?
আমরা যতটুকু দেখেছি তাতেই যা বোঝবার বুঝে নিয়েছি। মুখে বললাম, কই? কিছুই তো নেই।
আমি জানতাম। এসব আমার ‘হোম’-এর বিরুদ্ধে বদনাম রটানোর চেষ্টা। বলে আর এগিয়ে না এসে ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে।
এই অবসরে শান্তনু চাপা গলায় বলল, আজই আমাদের সুবর্ণ সুযোগ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস চিয়াং-এর দাদুকে এ বাড়িতেই রাখা আছে। আজ তার গোপন ডেরা থেকে বেরোনোর কথা বোধ হয় ছিল না। কিন্তু ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তিনি অস্বস্তিতে পড়েছেন। তবু দেখা করতেই হবে। তাই আমার বিশ্বাস আজ কিছু একটা ঘটবে। সজাগ থেকো।
মিস চিয়াং-এর চেম্বারে এসে বসলাম। এতক্ষণে লক্ষ পড়ল বৃদ্ধ চিনা ওয়ন একমনে খাতাপত্র নিয়ে ঘাড় গুঁজে বসে কাজ করেই যাচ্ছে। এত যে কাণ্ড ঘটে গেল তা কি ওর কানে যায়নি? না কি গুরুত্ব দেয়নি? আশ্চর্য!
ঘরে ঢুকতেই বিরূপাক্ষদা জিগ্যেস করলেন, কাল আমরা ফিরছি তো?
শান্তনু বলল, তাই তো ভাবছি।
অমন হেঁয়ালি করে কথা বল কেন? এই তো বললে কালই যাওয়া হবে। তাহলে—
শান্তনু হেসে বলল, আমি তো বলিনি কাল যাওয়া হবে না।
তাহলে?
আগে রাতটা নিরাপদে কাটুক।
বিরূপাক্ষদা যেন চুপসে গেলেন। বললেন, ওরে বাবা!
অনেক রাতে শান্তনুর খোঁচা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। চমকে উঠতেই শান্তনু আমাকে চুপ করে থাকতে বলল, কিছু শুনতে পাচ্ছ?
বললাম, এ তো বিরূপাক্ষদার নাক ডাকা।
দূর! ভালো করে কান পেতে শোনো।
এবার শুনতে পেলাম। কাছেই কোথাও কেউ শাবল দিয়ে কোদাল দিয়ে পাথর সরাচ্ছে।
হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি।
তাহলে আর দেরি নয়। চটপট বেরিয়ে পড়ো।
তাই করলাম। কোনোরকমে পাজামার উপর পাঞ্জাবি চড়িয়ে দরজা বাইরে থেকে ঠেসিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম।
মনে মনে বললাম, বিরূপদা, এইরকম বিপদের সময়ে আপনাকে কিছুক্ষণের জন্যেও একা রেখে যাচ্ছি। উপায় নেই। তার জন্য ক্ষমা করবেন। ঈশ্বর আপনার সহায় হোন।
আবার সেই অন্ধকার প্যাসেজ। এখন যেন আরও বেশি অন্ধকার মনে হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে।
রাত বলেই মিস চিয়াং-এর চেম্বারে একটা হাল্কা আলো জ্বলছে। সেই আলোয় আমরা সাবধানে চেম্বারের বাঁদিকের প্যাসেজ ধরে এগিয়ে চললাম।
চাপা গলায় বললাম, নিরস্ত্র অবস্থায় এইভাবে কি যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে?
শান্তনু বলল, তাছাড়া উপায় কী? আমরা করো সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না। শুধু রহস্যভেদ করতে যাচ্ছি। তবে যদি কেউ আক্রমণ করে তাহলে শক্তি পরীক্ষা দেব।
শান্তনুর অভয়বাণী শুনলাম বটে, কিন্তু সাহস পেলাম না। এই তো সেই জানালা। যে জানালা দিয়ে পিছনের বারান্দাটা দেখা যায়। কিন্তু এখন সব অন্ধকারে লেপা। আমরা আমাদের এদিকের বারান্দা দিয়ে পাঁচিল পর্যন্ত গিয়েছি। কিন্তু এদিকটা আসার সুযোগ হয়নি।
সাবধানে টর্চ জ্বালব?
বললাম, না–না!
আঃ! পেন্সিল টর্চটা আনলে হত।
সাবধানে হাঁটতে হাঁটতে কোদালের শব্দ অনুসরণ করে আমরা আরও খানিকটা এগিয়ে এসেছি। হঠাৎ শব্দটা থেমে গেল। আমরাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর অন্ধকারের মধ্যে সেই ইউক্যালিপটাস গাছটার নীচে থেকে যেন একটা মূর্তি উঠে দাঁড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুজনের হাতের টর্চ একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
সেই জোরালো আলোয় কালো গাউন পরা মিস চিয়াং স্পষ্ট হয়ে দেখা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত থেকে শাবলটা পড়ে গেল।
এ কি আপনারা? এখানে কী করছেন?
আপনাকে জানতে চেষ্টা করছি।
মিস চিয়াং কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এসে দু’চোখ তুলে বললেন–কী জানতে চান বলুন? এর আগে তো সব বলেছি।
না, সব বলা হয়নি। সেইটুকুই শুনব।
বেশ বলুন কী জানতে চান। এখানে কী করছিলাম?
তা জানি। আপনি পাথর সরিয়ে কোনো সুড়ঙ্গপথের দরজা খুলছিলেন।
মিস চিয়াং বললেন–হ্যাঁ তাই।
এখানে কী আছে?
অনেক গোল্ড অনেক–আমার সারা জীবনের সম্পদ।
গোল্ড!
শান্তনু এবার মিস চিয়াং-এর চোখের ওপর টর্চ ফেলল।
মিথ্যে কথা।
মিস চিয়াং চুপ করে রইলেন।
গোল্ডের চেয়ে ঢের মূল্যবান কিছু।
একটু থেমে শান্তনু বলল, আমরা কিন্তু জানতে পেরেছি কী আছে।
মিস চিয়াং আঁতকে উঠে বললেন, কী? কী জানতে পেরেছেন, বলুন।
শান্তনু বলল, ওখানেই শোয়ানো আছে আপনার দাদুর দেহ। যার মাথার চুল পাকা, যাঁর বুক পর্যন্ত লম্বা সাদা দাড়ি। যিনি এখন বাতাসের চেয়েও হালকা।
একটু থেমে শান্তনু আবার বলল–এও জানি সেই শয়তান লালমুখো পুলিশের প্রেতাত্মার ভয়ে দাদুর বডি আপনি অন্য কোথাও সমাধিস্থ না করে বাড়িতেই করেছিলেন।
মিস চিয়াং চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলেন। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, তাহলে আর আমার বলার কিছু নেই। এখন কী করতে চান? লোকাল পুলিশকে জানাবেন আমার দাদুর আত্মঘাতী হওয়ার কথা? জানাবেন বেআইনিভাবে একটা ডেড-বডি আমারই হেফাজত থেকে লোপাট করে পাহাড়ের সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রেখেছি। তাই যান। থানায় যেতেই বা হবে কেন? চলুন আমার অফিস ঘরে। ওখানে টেলিফোন আছে। বলতে বলতে মিস চিয়াং উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
