আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিগ্যেস করলাম, হুম ডু ইউ ওয়ান্ট?
সে ফ্যাসফ্যাসে গলায় কী বলল বুঝতে পারলাম না। তবে যখন দরজার কাচের ওপর ‘হিপ হো’ নামটা আঙুল দিয়ে লিখে দিল তখন বুঝলাম দাদুকেই খুঁজছে। এও বুঝলাম দাদুর আর রক্ষে নেই।
তখনই দরজার ওপর পর্দা টেনে দিয়ে ভেতরে ছুটে এলাম দাদুর কাছে। দেখি দাদু কীভাবে বুঝতে পেরেছেন। ভয়ে মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে শব্দ করছেন আর চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, আমি দাদুকে দু-তিন বার বললাম, ভয় পেও না। যে এসেছিল বুদ্ধের নাম করতেই সে চলে গেছে। দাদু দুই কঁপা কাঁপা হাত তুলে বুদ্ধের উদ্দেশে প্রণাম করলেন।
তারপর?
এবার মিস চিয়াং বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর চোখের জল সামলে বললেন, এরপর তিনি আর বাঁচতে চাননি। শেষের দিকে বলতেন, আমার বডি সাবধানে সমাধিস্থ কোরো। যত কম লোক সঙ্গে নিতে পারো, ততই ভালো। অন্ধকারে নিয়ে যাবে নিঃশব্দে। ও যেন জানতে না পারে কোথায় আমার বডি আছে। আমার বডির হদিস পেলে নানাভাবে উপদ্রব করবে তা জানি। সাবধান!
তারপর সেদিন ভোরবেলায় উঠে দাদুকে কফি দিতে গিয়ে দেখি দরজায় খিল দেওয়া নেই। অন্যদিন ঘড়ির কাটায় ছ’টা বাজতেই দাদু দরজা খুলে দিতেন। আমি কফির পেয়ালা নিয়ে ঘরে ঢুকতাম। বলতাম… গুড মর্নিং গ্র্যান্ড!
হেসে, দাদু উত্তর দিতেন, ইয়েস! ভেরি গুড মর্নিং!
আজ দেখলাম দরজা ঠেসানো। ঠেলে ঘরে ঢুকতেই কাপ থেকে খানিকটা কফি চলকে পড়ে গেল। দেখলাম দাদু সিলিং থেকে ঝুলছেন! বলতে বলতে মিস চিয়াং দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন।
তারপর?
কিন্তু–
ওখানে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে?
না, দাঁড়িয়ে নেই। কালো কোট, কালো টুপি। কেউ যেন অন্ধকারে গা মিশিয়ে আমাদের ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে।
আমি তখনই নিঃশব্দে মিস চিয়াং-এর চেম্বারে ফিরে এসে চাপা গলায় শান্তনুকে ডাকলাম, শিগগির।
শান্তনু চটপট উঠে আমার পিছনে পিছনে আসতে লাগল। আমাদের হাবভাব দেখে মিস চিয়াং নিশ্চয়ই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। নইলে তিনিও ব্যস্ত হয়ে আমাদের পিছু পিছু আসবেন কেন?
কিছু যেন দেখলাম।
কী দেখলে? কোথায় দেখলে?
আমাদের ঘরে ঢুকেছিল–ঐ যে ঐ যে বেরিয়ে যাচ্ছে।
মিস চিয়াং হয় তো দেখতে পাননি। কেননা তিনি তখনও দূরে ছিলেন। আমরা দুজনেই দেখলাম একটা চলন্ত প্যান্ট আর একটা কোট–আর একটা টুপি। দেহ নেই, কোনো অস্তিত্বই নেই। স্রেফ ভাসতে ভাসতে বাইরের পাঁচিলের দিকে চলে গেল। যেখানে মাত্র গত সন্ধ্যায় সেই নেকড়ের শাবক তার ছায়াশরীর নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সব শুনে মিস চিয়াং হতাশ সুরে বললেন, কই, আমি তো কিছুই দেখতে পেলাম না।
দুঃখের সঙ্গে কথাগুলো বললেও গলায় যেন ছিল আর একটা চাপা বেসুর।
শান্তনু ইশারা করে আমায় বলল, কী দেখলাম তা যেন চিয়াংকে না বলি।
কেন?
আমাদের ধারণা ও সব জানে। সব জেনেও না জানার ভান করছে। কেন?
কী উদ্দেশ্য?
আবার আমরা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। মিস চিয়াং আগের মতোই যেন গল্প করতে মন দিলেন। কিন্তু গল্প যেন জমছিল না। আমরা তিনজনেই কেমন অন্যমনস্ক।
এইভাবে ঘণ্টা দেড়েক চলল। এরই মধ্যে আমরা গিয়ে বিরূপদার সঙ্গে কথা বলে এসেছি। জ্বরটা অনেক কমে গেছে। একটু উঠে বসেছেন।
এই তো গুড বয়ের মতো ভালো হয়ে উঠেছেন। চলুন, বাইরের ঘরে গিয়ে বসবেন।
ওখানে বসে কী হবে? ওখানে তো যত অনাসৃষ্টি ইয়ের গল্প। সন্ধেবেলায় ওসব গল্প করা ঠিক নয়। বিশেষ এইরকম বাজে জায়গায়।
তাহলে আমরা যাই?
হ্যাঁ, তা যাও। আমি আর একটু ঘুমোবার চেষ্টা করি।
মিস চিয়াংকে এই খবর জানালে তিনি বললেন–বয়েস হয়েছে। তার ওপর জ্বর গেল। শরীরটা দুর্বল হয়ে গেছে। উনি কথা শেষ করেছেন, আর তখনই দরজায় জুতোর শব্দ। স্পষ্ট লক্ষ করলাম সামান্য জুতোর শব্দতেই …. উনি চমকে উঠলেন।
কে? কে ওখানে?
আমি ম্যাডাম। আসব?
আমরাও তাকালাম। বিক্রম থাপা।
ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বিক্ৰম বলল, আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে। বললাম, তাতে কোনো অসুবিধে হয়নি। হ্যাঁ, আমরা কালই যাব। এখনও পর্যন্ত এইরকমই
ঠিক।
কাল কখন গাড়ি আনব, স্যার?
ব্রেকফাস্ট করে বেরোব।
ঠিক আছে। বলে বিক্রম যাবার জন্য ঘাড় ঘোরাল। কিন্তু এরপরই তার ঘাড়টা যেন শক্ত হয়ে গেল। ওর দৃষ্টি তখন ঘরের জানলার ভেতর দিয়ে বারান্দার দিকে যেখানে একটা ইউক্যালিপটাস গাছ অন্ধকারে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
মনে হল বিক্রমের চোখ দুটো যেন ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠল। আর সেই চোখের ভাষায় শুধু বিস্ময়–ভয়!
বিক্রম কি কিছু দেখেছে? অমন করে তাকাচ্ছে কেন?
বিক্রম!
বিক্রম উত্তর দিল না। তখনও ওর একটা পা দরজায় আর ঘাড়টা বেঁকিয়ে বিস্ফারিত চোখে সেই ইউক্যালিপটাস গাছের নীচে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে অস্বাভাবিকভাবে।
বিক্রম! ধমকে উঠল শান্তনু, কী দেখছ অমন করে?
কে ওখানে? কে ও? একজন বুড়ো-সাদা দাড়ি-ক্রমশই লম্বা হচ্ছে! … চললাম স্যার। এখানে আর একদণ্ড নয়। যদি বেঁচে থাকি তাহলে কাল ঠিক সময়ে গাড়ি নিয়ে আসব। বলতে বলতে বিক্রম যেন মরিয়া হয়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দিল।
শান্তুনু আর আমি মিস চিয়াং-এর অনুমতি না নিয়েই বাঁ দিকের সেই ইউক্যালিপটাস গাছটার দিকে ছুটলাম। গাছটার পিছনেই পাহাড়। তারই গায়ে একটা গুহার মতো। তখন কোনো মূর্তি দেখা গেল না। শুধু সাদা খানিকটা ধোঁওয়া গুহার মুখ দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে।
