শান্তনু একটু সামলে নিয়ে সহজ গলায় বলল, যাই হোক, ও প্রসঙ্গ থাক। আপনি কি আমাদের রহস্যটার ব্যাপার বুঝিয়ে বলবেন? আপনার কথামতো আমরা কিন্তু সব ঘটনা খুলে বলেছি। এখন আপনার ইচ্ছা।
মিস চিয়াং একটু ভেবে বললেন, বেশ বলুন কী জানতে চান?
শান্তনু বলল, প্রথমেই জানতে চাই শনিবারটা ড্রাইভারদের কাছে অপয়া কেন? কেন তারা এই পথ দিয়ে আসতে চাইছিল না? কে ঐ ওয়াটারপ্রুফ পরা লোকটা?
মিস চিয়াং একটুক্ষণ চোখ বুজিয়ে কী ভাবলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। ঠিক আছে। আমি উত্তর দেবার চেষ্টা করছি। শেষ থেকেই শুরু করব।
আপনাদের আমি যে লোভী অত্যাচারী বিদেশি পুলিশের কথা বলেছিলাম সেই হচ্ছে, যাকে আপনারা পাহাড়ের রাস্তায় ওয়াটারপ্রুফ গায়ে দিয়ে দাপাদাপি করতে দেখেছিলেন। ঐ পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টির সময়েতেই অমনিটাই ঘটে। বৃষ্টি পড়ে বলেই ওয়াটারপ্রুফ। ওর নাম গর্ডন। দিনের পর দিন লোকটা দাদুকে ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত দাদু আর সহ্য করতে পারলেন না। ঠিক করেন সময়মতো সাহেবকে সরিয়ে দেবেন।
কিন্তু সেও তো যে-সে লোক নয়। হাতে প্রচুর ক্ষমতা। তখন দাদু মতলব ভাঁজতে লাগলেন। পুলিশ অফিসারটিকে আরও বেশি ডলারের লোভ দেখিয়ে হিলে ডেকে আনলেন। তারপর নানা অছিলায় নিয়ে গেলেন একেবারে জোরথাং। সেখানে একটা ছোটো রেস্টুরেন্টে আগে থেকেই ভালো ভালো খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন দাদু টাকা ছড়িয়ে। শুধু খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থাই নয়, খাবার ঘরটির এক কোণে ভালো পর্দা, সুন্দর সুন্দর ফুল দিয়ে ফ্লাওয়ার ভাস সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন। তাছাড়াও রেস্টুরেন্টের মালিকের সঙ্গে পরামর্শ করে অনেক টাকা দিয়ে জনা দশেক গাড়ির ড্রাইভার আর স্থানীয় পাহাড়ি লোকের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
সাহেব টাকার লোভে দাদুর ফাঁদে পা দিলেন। আর তাকে ফিরতে হল না।
মৃত্যুর পর ঐ বিরাট দেহটার ব্যবস্থা কী করা হবে তাও ঠিক করা ছিল। একটু অন্ধকার হতেই সবাই ধরাধরি করে দেহটাকে পাশের খাদে ফেলে দিল। শত্রুর শেষকৃত্য এইভাবেই দাদু সম্পন্ন করে আমার কাছে ফিরে এলেন।
এই পর্যন্ত বলে মিস চিয়াং থামলেন।
শান্তনু জিগ্যেস করল, ঐ ড্রাইভারদের মধ্যে আমাদের বিক্রমও ছিল কিনা কে জানে?
মিস চিয়াং বললেন, গাড়ি চালাতে চালাতে ও যেরকম ভয় পাচ্ছিল বলছিলেন, তাতে মনে হয় ও-ও এসবের দলে ছিল। খুব বেঁচে গেছে।
আচ্ছা, এ ঘটনা কত বছর আগের মনে করেন?
বছর কুড়ি তো বটেই। আমার বয়সই দেখুন না। খুব বুড়িয়ে গেছি কি? বলে হাসলেন।
তারপর?
তারপর দাদু কিন্তু শান্তিতে থাকতে পারলেন না। কী এক দুশ্চিন্তায় ক্রমশই ভেঙে পড়তে লাগলেন। যতই জিগ্যেস করি, দাদু, কী হয়েছে তোমার?’ দাদু বলেন, না, কিছু হয়নি। আগে রোজ সকালে-বিকালে হিলের বাজারে বেড়াতে যেতেন। আস্তে আস্তে বিকালে বেরোনো বন্ধ করে দিলেন। তারপর একদিন দেখলাম সকালেও বেরোচ্ছেন না। সর্বক্ষণ শুয়ে থাকছেন। বললাম, ‘আজ একেবারেই বেরোলে না?’ দাদু আমাকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। তারপর এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে নিচু গলায় বললেন, আমার মনে হচ্ছে বিদেশি পুলিশটা ঠিকমতো মরেনি।
‘ঠিকমতো’ মরেনি মানে কী? মরা তো মরাই। না মরলে বেঁচে থাকা।
দাদু অস্পষ্টভাবে কী বলতে চাইলেন প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি। তারপর অনেক কষ্টে বুঝলাম। দাদু বোঝাতে চাইছিলেন পুলিশটা গভীর খাদে পড়েও বেঁচে আছে।
শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। অত গভীর খাদে যাকে পাঁচ-ছ’জন মিলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সে কখনও বাঁচতে পারে? আর সত্যিই যদি ভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকে তাহলে তো দাদুকে শেষ করে দেবে?
তারপর দাদু এক-এক দিন এমন সব কাণ্ডকারখানার কথা বলতে লাগলেন যা থেকে বুঝলাম পুলিশটা ঠিকমতো মরে গেছে বলেই আরও শক্তি নিয়ে ফের জেগে উঠেছে। এখন তাকে ঠেকানো মানুষের অসাধ্য। মৃত্যুভয়ে দাদু অস্থির। হিলে’ থেকে একটু ওপর দিকে উঠলেই দেখা যাবে তাকে। পাহাড়ি জায়গায় বৃষ্টি প্রায় সব সময়েই লেগে থাকে। আর বৃষ্টি পড়লেই তার আবির্ভাব। ইউনিফর্মের ওপর ওয়াটারপ্রুফ জড়িয়ে হু হু করে তেড়ে আসছে। …এরই মধ্যে একদিন ঘটল একটা ঘটনা।
আমরা একটু নড়ে-চড়ে বসলাম।
… হিলেতে সবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জোর বৃষ্টি নয়। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। কনকনে বাতাস যেন গায়ে ছুঁচ ফোঁটাচ্ছে। আমার হোটেলে এমনিতেই বোর্ডার কম। বৃষ্টি পড়লে তখন কোনো বোর্ডার আসবে এমন আশা করিনি। দরজা, জানলা বন্ধ করে ঘরে আলো জ্বেলে এইখানে ঐ চেয়ারটায় বসে আছি।
হঠাৎ কে যেন দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। অকারণেই আমি ভয় পেয়ে চমকে উঠলাম। বাইরের আলো জ্বালতে গেলাম। আশ্চর্য, জুলল না। অথচ ভেতরে আলো জ্বলছে।
আবার দরজায় ধাক্কা। এবার উঠতে হল। দরজার কাছ এগিয়ে ভারী পর্দাটা সরিয়ে দিলাম। তারপর কাচের দরজা দিয়ে যা দেখলাম তাতে শিউরে উঠলাম। দেখলাম দাদু যে বিদেশি পুলিশটার কথা বলেন, যে আমার এখানে বারকয়েক এসেছিল, যাকে জোরথাং-এর রেস্টুরেন্টে দাদু মেরে ফেলেছিলেন, যার দেহটা পাঁচ-ছ’জন মিলে গভীর খাদে ফেলে দিয়েছিল সেই ‘গর্ডন’ সাহেব সশরীরে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ওয়াটারপ্রুফের হুডটা নেমে এসেছে কপাল পর্যন্ত। কপালের নীচে ভুরুশূন্য, পলকশূন্য দুটি লাল গর্তের মধ্যে ঝকঝক করছে দুটো হিংস্র চোখ। সে কথা বলার জন্য একবার হাঁ করল। অমনি বেরিয়ে এল কালো কালো দাঁত। দু’পাশের কষে কাদা।
