মিস চিয়াং বললেন, যদি শুধু ফুল দেখতে যাওয়াই উদ্দেশ্য হয় তাহলে ওখানে গিয়ে আর লাভ নেই।
তাহলে তো কালকেই আমরা এখান থেকে ব্যাক করতে পারি।
তা পারেন। অবশ্য কাল আপনাদের সিনিয়ার পার্টনারের শরীর কেমন থাকে তার ওপরই আপনাদের যাওয়া নির্ভর করছে। আর এককাপ করে চা হবে নাকি?
শান্তনু বলল, একটু পরে।
তাহলে এখন বলুন কাল কী কথা জানতে চাইছিলেন। আমার যদি উত্তর ঠিক জানা থাকে তাহলে সবই বলব।
শান্তনু বলল, দেখুন রহস্যটা গোড়া থেকেই। আর টানা অনেকক্ষণ ছিল।
মিস চিয়াং বললেন, আর একটু পরিষ্কার করে যদি বলেন। আপনারা কি কোনো অলৌকিক ব্যাপারের অভিজ্ঞতা বলতে চাইছেন?
বললাম, এক কথায় তা বলে বোঝানো যাবে না। দেখুন পাহাড়ে বেড়াতে ভালোবাসি বলেই আমি আর শান্তনু বেরিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ এসে জুটলেন বিরূপাক্ষদা–যাঁকে আপনি বলেন আমাদের সিনিয়ার পার্টনার।
মিস চিয়াং হাসলেন একটু–তারপর?
বিরূপাক্ষদা আমাদের চেয়ে বয়েসে অনেক বড়ো। ভ্রমণের নেশার কাছে উনি বয়েসকে পাত্তা দিতে চান না। তাই সহজেই মিশে আছেন আমাদের সঙ্গে।
তবে ফুল-টুলের মর্ম বুঝতে চান না। সামান্য ফুল দেখার জন্য শিলিগুড়ি থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে সিকিমের বার্সে যাওয়াটা তার ভালো লাগেনি। তার মতে এটা পাগলামো।
মিস চিয়াং একটু হাসলেন। তারপর বললেন, রহস্যটা শুরু কোথা থেকে হল?
রহস্য শুরু হল শিলিগুড়ি থেকেই। কোনো ড্রাইভারই হিলের পথে যেতে রাজি হয় না। বিশেষ বারটা যখন শনিবার।
দেখলাম মিস চিয়াং কিছু নোট করলেন।
বললাম, আমাদের প্রথম প্রশ্ন–শনিবারে যেতে এত আপত্তি কীসের?
একটু থেমে বললাম, যাই হোক, অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে, বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে ঐ ড্রাইভারটিকে রাজি করানো হল। কিন্তু কিছুদূর যাবার পরই শুরু হল ড্রাইভারের ছটফটানি। ভয় পেতে লাগল। কীসের যেন আতংক।
এটা কোনখান থেকে?
আমার হয়ে শান্তনুই উত্তর দিল, জায়গাটার নাম জোরথাং। রংগীত নদীর কাছে।
একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। বিক্রম হিলে যেতে রাজি হলেও এই পথ দিয়ে কিছুতেই আসবে না। আমাদেরও জেদ এই পথ দিয়েই যেতে হবে। শেষে রাজি হল বটে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না এলেই ভালো হত।
মিস চিয়াং টুকটুক করে কিছু নোট করে নিয়ে সকৌতূহলে জিগ্যেস করলেন, তারপর?
তারপরের ঘটনাগুলো (হিলে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত) সব আমরা বলে গেলাম। উনি নোট করে নিলেন।
তার মানে আপনারা বলতে চাইছেন মেঘ ডাকা, বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে ঐ কালো সুটপরা ওয়াটারপ্রুফ গায়ে লোকটির একটা সম্পর্ক আছে।
হ্যাঁ অবশ্যই।
তবে সবচেয়ে অবাক হচ্ছি যখন রাস্তার একদিকে পাহাড় থেকে দলে দলে নেকড়ের বাচ্চাগুলো নেমে অন্যদিকের পাহাড়ে গিয়ে উঠল। এত নেকড়ে দেখা যায়?
মিস চিয়াং একটু হাসলেন। বললেন, ওগুলো নেকড়ের বাচ্চা নয়।
তাহলে? অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।
কিছুই না। চোখের ভ্রম। দুর্গম পাহাড়ে এইরকম চোখের ভুল হয়। খুবই বিপজ্জনক। এইভাবেই পাহাড়ের অশুভ শক্তি অসহায় মানুষকে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দেয়। খুব বেঁচে গেছেন।
না হয় তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম চোখের ভুল। কিন্তু কাল সন্ধেবেলাতেই আপনার এই হোটেলে যে জীবটিকে মুহূর্তের জন্য দেখা গিয়েছিল সেটাও কি চোখের ভ্রম? এ তো আর পাহাড় নয়। আপনার সাজানো-গোছানো ‘হোম’!
মিস চিয়াং এবার চট করে উত্তর দিতে পারলেন না। মুখটার ওপর একটা ছায়া নেমে এল। একটু চুপ করে থেকে বললেন, বুঝতে পারছি না। অন্য কেউ হলে বলতাম চোখের ভুল। কিন্তু আপনাদের সে কথা তো বলতে পারি না।
শান্তনু বলল, আপনি হয়তো জানেন শুধু ইন্ডিয়াতে নয়, ইন্ডিয়ার বাইরেও প্রায় সব দেশেই ভূতের ওপর অনেক ঘটনা আছে। তার সবই যে কাল্পনিক এমন ভাবার কারণ নেই। বেশির ভাগই যে সত্য তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আর এই সব সত্যি-মিথ্যে কাহিনির সঙ্গে দেখা যায় একটি হিংস্র পশুকে। সে পশু বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক নয়। নেকড়ে। প্রায় প্রতিটি কাহিনিতে নেকড়ে কী করে এল তার সঠিক তথ্য আমার জানা নেই।
তাই যদি হয়, অর্থাৎ আমাদের দেখা সেই নেকড়ের বাচ্চাগুলি যদি চোখের ভুলই হয়, তবে তো স্বীকার করে নিতেই হবে, শিলিগুড়ি থেকে হিলে পর্যন্ত আমরা পথে যা দেখেছি–যা কিছু ঘটল তা সমস্তই চোখের ভুল। কিছু মনে করবেন না মিস চিয়াং। একথা আমরা মানতে পারব না। বিশেষ করে আমরা স্বচক্ষে যা দেখেছি। আচ্ছা, আমাদের কথা না হয় বাদ দিন। কিন্তু আমাদের ড্রাইভার বিক্রম থাপা। ও তো আজ সন্ধ্যায় এখানে আসবে। তখন আপনিই ওকে জিজ্ঞাসা করবেন।
মিস চিয়াং একটু হাসলেন, বললেন, আপনাদের ধারণাকে না হয় সত্য বলে মেনে নিলাম। তা বলে নেকডের বাচ্চা এ বাড়িতে দেখার দুঃস্বপ্ন দু’চোখে নিয়ে বসে থাকলেও যেন ভেবে বসবেন না আমার এই হোমে ঘোস্ট জাতীয় কিছু আছে। আজ পর্যন্ত বহু বোর্ডার এখানে থেকে গেছে। তারা কেউ তেমন কথা বলেনি।
তারা কেউ বলেননি কেন তা জানি না, জানবার ইচ্ছেও নেই। আমরা এখানে ভূতের গল্পের প্লট খুঁজতে আসিনি। তবে যা দেখেছি যা শুনেছি তা অস্বীকার করতে পারব না।
মিস চিয়াং মুখ লাল করে বললেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার।
আমি আড়ালে শান্তনুকে বললাম, তর্ক কোরো না। মিস চিয়াং রেগে যাচ্ছেন। এখনও আমরা কিন্তু ওঁর আশ্রয়েই আছি।
