.
০৪.
ভালোভাবেই রাতটা কেটে গেল। ভোরবেলা প্রথমেই ঘুম ভাঙল আমার। নতুন জায়গা বলে প্রথমটা ঠিক ঠাহর করতে পারিনি কোথায় আছি। একটু পরেই সব মনে পড়ল। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। তখনও শান্তনু ঘুমোচ্ছে। আর লেপের ওপর দু’খানা কম্বল চাপিয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছেন বিরূপাক্ষদা।
পুরু সোয়েটারের ওপর একটা গরম চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
তখন ভোরের আলো সবে ফুটে উঠছে। বাড়ির পিছনেই পাহাড়টা। কাল সন্ধেবেলায় ভালো বোঝা যায়নি। আজ দেখে রীতিমতো ভয় করল। পাহাড়টা যেন কেমন অস্বাভাবিকভাবে ঝুঁকে আছে মিস চিয়াং-এর হোটেলের ওপর। কুচকুচে কালো পাথর। আর আশ্চর্য, পাহাড়ের গায়ে গাছপালার চিহ্নমাত্র নেই। বলা যেতে পারে ন্যাড়া পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের পিছনেই ঘন অরণ্য। রহস্যঘেরা।
এবার একটু ঘুরে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম হোটেলের গায়েই অজস্র লাল ফুলের সমারোহ। এত লাল ফুল! রডোড্রেনড্রন নয় তো? তাহলে তো ভালোই!
শান্তনুকে দেখাবার জন্যে ডাকতে যাব ভাবছি, দেখি শান্তনু ঘুমচোখে এসে দাঁড়িয়েছে, লাল ফুল দেখে সেও চমৎকৃত। বলল, আমারও মনে হচ্ছে এটাই প্রকৃত রডোড্রেনড্রন! তারপর হঠাৎ জিগ্যেস করল, কাল যে মিস চিয়াংকে বললে পায়ের শব্দ শুনেছিলে সেটা সত্যি?
অবাক হয়ে বললাম, কী বলছ তুমি! মিথ্যে বলতে যাব কোন দুঃখে?
শান্তনু আমতা আমতা করে বলল, আয়্যাম স্যরি। আসলে, কাল অনেক রাত পর্যন্ত ভেবেছি। বিশ্বাস করতে পারিনি। লোক নেই, জন নেই তবু পায়ের শব্দ! আচ্ছা সে কি হেঁটে বেড়াচ্ছিল?
ঠিক যে বেড়াচ্ছিল তা নয়। তুমি যখন অফিস ঘরে মিস চিয়াং-এর সঙ্গে গল্প করছিলে তখন একটু বিশেষ দরকারে আমি আমাদের রুমে ফিরে এসেছিলাম। দরজা ঠেসানো ছিল। ঘরে আলো তো জ্বালাই ছিল। বিরূপাক্ষদা নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ মনে হল পাশের ঘরে কেউ যেন আছে। তারপরেই শুনলাম তার পায়ের শব্দ।
শব্দটা কীরকম?
ভারী থপথপে পা ফেলে কেউ যেন ঘর থেকে বেরোবার চেষ্টা করছে। মোটেই স্বাভাবিক মানুষের মতো স্টেপ ফেলা নয়। অনেকটা খোঁড়া মানুষের মতো পা ঘষটে হাঁটা।
সে কি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল?
সেইরকমই মনে হল। পায়ের শব্দটা ঘর থেকে বেরিয়ে ঐ পাঁচিলের দিকে গেল।
অর্থাৎ পাহাড়ের দিকে?
তাই হবে। তারপরেই মিলিয়ে গেল।
শান্তনু জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মুখে বলল, হুঁ। বুঝলাম।
এমনি সময়ে হাসিমুখে ঢুকলেন মিস চিয়াং।
গুড মর্নিং!
গুড মর্নিং–গুড মর্নিং! বলে আমরা দুজনেই সানন্দে অভ্যর্থনা জানালাম তাঁকে।
কেমন ঘুম হল নতুন জায়গায়?
বললাম, ফাইন। চমৎকার।
কিন্তু আপনাদের সিনিয়ার ফ্রেন্ড তো এখনও ঘুমোচ্ছে। শরীর ভালো তো?
না-না, মোটেই ভালো নয়। বলে বিরূপদা চোখ বুজিয়েই পাশ ফিরলেন।
কী হল আপনার? বলে মিস চিয়াং ঝুঁকে পড়লেন।
বিরূপাক্ষদা কোনোরকমে বললেন, জ্বর। পাহাড়ে জ্বর। এবার বোধহয় এই বিদেশ-বিভুঁয়ে প্রাণটাই রেখে যেতে হবে।
মিস চিয়াং নিঃসংকোচে বিরূপদার কপালে হাত রেখে জ্বর কতটা বুঝে নিলেন। মুখে বললেন, কোনো ভয় নেই। আমাদের জানা ডাক্তার আছে। ডাকলেই চলে আসবে। এখন একটু চা খাবেন?
না পরে। বলে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
মিস চিয়াং বললেন, ওঁকে ঘুমোতে দিন। চলুন, আমার অফিস ঘরে। ওখানেই ব্রেকফাস্ট সারা যাক।
আমরা জিনজনেই ব্রেড, বাটার, এগ পোচ আর গরম কফি নিয়ে বসলাম। কাল যে মহিলাটিকে দেখেছিলাম আজ মনে হচ্ছে ইনি যেন তিনি নন। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কাল রাত্তিরে তাঁর মুখের ভাবের যে পরিবর্তন ঘটেছিল, যে দুশ্চিন্তার ছাপ তার মুখে কাল ছায়া ফেলেছিল, আজ সকালে তার আর বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। একেবারেই স্বাভাবিক।
মিস চিয়াং কথা শুরু করলেন এইভাবে মিস্টার রায়, কাল রাত্তিরে বলছিলেন কার পায়ের শব্দ শুনেছিলেন, সারা রাতের মধ্যে আর কি কোনো শব্দ–
না না, তেমন কিছু নয়। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম।
তাহলে ভুল শুনেছিলেন স্বীকার করছেন তো?
হ্যাঁ, তা করছি।
যাক, নিশ্চিন্ত হলাম।
শান্তনু মিস চিয়াং-এর দৃষ্টি এড়িয়ে কটমট করে আমার দিকে তাকাল। আমি হেসে চোখ টিপে বুঝিয়ে দিলাম যা আমি শুনেছি তা ভুল কখনই নয়।
মিস চিয়াং আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, দরজায় জুতোর শব্দ শুনে তাকালেন।
কাকে চাই?
আগন্তুক ইশারায় আমাদের দেখিয়ে দিল। আমাদের উদ্দেশে বিক্রম সেলাম করল। বুঝলাম আজ আমরা শিলিগুড়ি ফিরব কিনা জানতে এসেছে।
শান্তনু বলল, বিক্রম, আজ আর ফেরা যাবে না। দাদাজির তবিয়ত খারাপ।
তবে কাল?
মিস চিয়াং আধা হিন্দি আধা চিনা ভাষায় বললেন, সন্ধেবেলা এসো। তখন জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিক্রম ফের সেলাম করে চলে গেল। মনে হল আজ যেতে হবে না বলে যেন খুশিই হয়েছে। এখানে অনেকে তার জানাশোনা আছে। তাছাড়া একদিন থেকে যাওয়া মানেই ভালো টাকা লাভ।
বিক্রম চলে গেলে আমিই প্রথম কথা বললাম।
আপনার হোটেলের পিছনে বিস্তর লাল ফুল দেখলাম। এগুলো কি রডোড্রেনড্রন?
খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল মিস চিয়াং-এর। বললেন–একেবারে আসল রডোড্রেনড্রন। রঙটা লক্ষ করলেন?
করেছি বৈকি!
শান্তনু বলল, এখানেই যখন আসল রডোড্রেনড্রনের দর্শন লাভ হয়েই গেল তখন আর বার্সে গিয়ে কী লাভ?
