মহিলাটি একটু থামলেন।
শান্তনু জিগ্যেস করল, তারপর?
তারপর অনেক ঘুরে, অনেক বাধা কাটিয়ে আমরা হংকং-এ একটা উদ্বাস্তু কলোনিতে এসে পৌঁছালাম। ভেবেছিলাম এখন নিশ্চিন্ত। কিন্তু তা হল না। একজন বিদেশী পুলিশ অফিসার দাদুর কাছ থেকে মোটা ডলার ঘুষ খেয়েও পেছনে লেগেছিল–আরও টাকা দিতে হবে। যেখানেই পালাই সেখানেই দুশমন হাজির।
সেই বিদেশী পুলিশটা খুবই নিষ্ঠুর ছিল। দাদুর ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে যখন-তখন পিছু পিছু ধাওয়া করে আসত। তার সঙ্গে থাকত একটি ভয়ংকর কুকুর। কখনও থাকত পোষা ওরাং ওটাং জাতীয় বিদেশী হিংস্র পশু। আমাদের পিছনে লেলিয়ে দিত।
তখন বাধ্য হয়ে দাদুকে অন্য ব্যবস্থা করতে হল। সেদিন সন্ধে থেকে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছিল। দাদু পুলিশ অফিসারকে ডেকে আনলেন একটা নির্জন বারে কী কী শর্তে আরও ডলার দেবেন তাই নিয়ে আলোচনা করার জন্যে। তারপর গোপনে মদের গেলাসে বিষ মিশিয়ে মেরে দিয়ে পালিয়ে এলেন। সেদিনের তারিখ আর বার SATURDAY!
এই পর্যন্ত বলে মহিলাটি একটু থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন, অনেক খুঁজে শেষ পর্যন্ত এই হিলেতেই পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নেন দাদু। কিন্তু তবু
তবু কী?
এখানেও সেই পুলিশটি—
মানে? সে তো তখন মৃত!
পরে বলব।
শান্তনু বলল, ম্যাডাম, আপনি কি এখুনি উঠবেন?
হাসলেন মহিলাটি। বললেন, কেন? গল্প করবেন?
শান্তনু বলল, কিছু জানবার ছিল। যা আমাদের জ্ঞানের বাইরে।
বাবা! আপনাদের জ্ঞানের বাইরে! তা আমার মতো সামান্য একটা হোটেল-গার্লের পক্ষে—
যতটুকু পারেন।
বেশ। কী জানতে চান বলুন।
প্রথমেই জানতে চাই আপনার নাম। টাইটেল। নইলে কথা বলার অসুবিধে হবে।
আমার নাম! উনি একটু অবাক হয়ে তাকালেন। জানেন না? তারপর ড্রয়ার থেকে একটা কার্ড বের করে দিলেন। তাতে লেখা ‘SWEET HOME’। নীচে প্রোপাইটারের নাম ছাপা।
তাই তো! এই নামই তো বাইরের সাইনবোর্ডে জুলজুল করছে।
ধন্যবাদ মিস চিয়াং। আপনার নামটা আগেই আমাদের মনে করা উচিত ছিল।
উত্তরে চিয়াং হাসলেন একটু।
বলুন, এবার কী জানতে চান?
তার আগে কি আমরা শুনে নেব আপনার দাদুর বাকি কথা?
মিস চিয়াং বললেন, সেটা পরে বলব। আপনিই শুরু করুন মিস্টার রায়। আপনার কি ঘুম পাচ্ছে?
না না, আমি যখন চোখ বুজিয়ে থাকি তখন জানবেন আমি কিছু ভাবছি।
তাই নাকি? বাঃ! বেশ তো! তাহলে কী ভাবছেন বলুন। যদি দুর্ভাবনা হয় তাহলে ফয়সলা করবার চেষ্টা করব। বলে তাকালেন আমার দিকে।
বললাম, পৃথিবীর এমন কি কোথাও কোনো হোটেল, বোর্ডিং বা গেস্ট হাউস আছে যেখানে কোনো একজন বোর্ডারেরও সাড়া পাওয়া যায় না?
লক্ষ করলাম মিস চিয়াং-এর মুখটা যেন শুকিয়ে গেল।
আপনি কি আমার এই ‘হোমের’ কথা বলছেন?
ঠিক তাই।
মিস চিয়াং দুঃখমাখা গলায় বললেন, সে তো আমি আগেই বলেছি যতই যত্ন করি না কেন বাজার থেকে দূরে বলেই এখানে লোক আসে না। কিন্তু কী করব? ইচ্ছে করলেই তো নিজেদের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারি না। এই ‘হোম’ আমার দাদুর তৈরি। এর প্রতিটি পাথরে দাদুর স্মৃতি জড়িয়ে।
বললাম, সেটা বুঝি। কিন্তু বোর্ডার যেখানে নেই বললেই হয় সেখানে খরচ চালান কী করে? আপনার কর্মচারীদের মাইনেও দিতে হয়–তা যত কমই হোক।
মিস চিয়াং মাথা নিচু করে রইলেন। দেখে মায়া হল।
এখন ক’জন বোর্ডার আছে? আমাদের বাদ দিয়ে?
মিস চিয়াং নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। যার অর্থ একটিও না। তৎক্ষণাৎ বললাম, আমার মনে হচ্ছে আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
মিস চিয়াং অবাক হয়ে তাকালেন।
আমি নিশ্চিত যে, একটু আগে পর্যন্ত আরো কেউ ছিল।
কী বলছেন মিঃ রায়?
ঠিকই বলছি, আমি নিজে কানে কারো পায়ের শব্দ শুনেছি।
পায়ের শব্দ।
হ্যাঁ।
কোথায়?
আমাদের পাশের ঘরে।
তাহলে আরও বলি মিস চিয়াং, একটু আগে যখন আপনার অফিস ঘরে আসছিলাম তখন হঠাৎ দেখলাম কুকুরের চেয়ে ছোটো আকারের নেকড়ে জাতীয় কোনো জন্তু ছুটে ওদিকের পাঁচিলে উঠে পাহাড়ের দিকে মিলিয়ে গেল।
একথা শুনেই মিস চিয়াং চঞ্চল হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কিছু যেন বলতে চাইলেন। কিন্তু বলতে পারলেন না। উদ্ভ্রান্তের মতো একবার এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপর ক্ষমা চেয়ে বললেন, আমি আর বসতে পারব না। বলে উঠে দাঁড়ালেন।
ঠিক আছে। বলে আমরাও উঠে পড়লাম।
চলুন, আপনাদের রুমে পৌঁছে দিই।
তার দরকার হবে না।
কিন্তু কথাটা তার কানে গেল না। তিনি আমাদের উদ্দেশ করে বললেন–আসুন আমার সঙ্গে। বলে ড্রয়ার থেকে কতকগুলো চাবি নিয়ে এগিয়ে চললেন। চার নম্বর ঘরের সামনে এসে বললেন, এটাই তো আপনাদের রুম?
হ্যাঁ, ম্যাডাম।
ভেতরটা একবার দেখে আসবেন?
দেখবার কিছু ছিল না। বিরূপাক্ষদা নিশ্চিন্তে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছেন।
ম্যাডাম আমাকে বললেন, আপনি কোন ঘরে পায়ের শব্দ পেয়েছিলেন?
আমি হাত দিয়ে পাশের ঘরটা দেখিয়ে দিলাম। ঘরটা তালাবন্ধ ছিল। উনি নিজেই তালা খুললেন। নিজেই সবার আগে ঢুকে গেলেন অন্ধকার ঘরে। সুইচ টিপলেন। আলো জ্বলল। বললেন, দেখুন ভালো করে।
দুজনেই দেখলাম। কেউ কোথাও নেই।
তাহলে সত্যিই এদিকে আপনারা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই। তাই তো?
খুব জোরের সঙ্গে মিস চিয়াং নিজের কথাটা যে ঠিক তা বোঝাবার চেষ্টা করলেন বটে কিন্তু গলায় যেন তেমন জোর ছিল না।
