চার।
ঠিক আছে বলে মহিলা ড্রয়ার থেকে এক থোকা চাবি বের করে দিলেন।
ইস্কাইন খালি কাপ তিনটে ট্রেতে তুলে নিল। মহিলাটি ইশারায় আমাদের ওর সঙ্গে যেতে বললেন।
এক নজরেই ঘর পছন্দ হয়ে গেল আমাদের। নিতান্ত ছোটো ঘর নয়। পাশাপাশি তিনটে বেড। তাছাড়াও আর একটা উল্টো দিকে। ঘরটা বেশ গরম। পায়ের কাছে ফর্সা ওয়াড় পরানো পুরু লেপ। লাগাও বাথরুম। বেসিনে সব সময় জল, গরম জলের ব্যবস্থা আছে। বড়ো কথা–ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বিরূপাক্ষদা জানলার ধারটা বাদ দিয়ে অন্য দিকে শুলেন। শার্সি লাগানো সব জানলাই শীতের দাপটের জন্য বন্ধ।
থাকার ব্যবস্থা করে আমরা বিক্রমকে জানিয়ে দিলাম। কালই যাব কিনা সকালে জানিয়ে দেওয়া হবে।
রাতের খাওয়াও মন্দ হল না। লুচি আর মুরগির মাংস। তবে অনেক উৎসাহ নিয়ে খেতে বসলেও বিরূপাক্ষদা ভালো করে খেতে পারলেন না। বললেন, মাথাটা বেজায় ধরে আছে। বলে কপাল টিপে ধরলেন।
বললাম, এবার আপাদমস্তক লেপমুড়ি দিয়ে একটা টানা ঘুম লাগান।
কাল তো আবার কোথায় যেন যেতে হবে। চার মাইল পথ?
শান্তনু বলল, কালই যেতে হবে তার কোনো মানে নেই। একদিন এখানে রেস্ট নিয়ে—
ঠিক আছে। তোমরাও এখন শুয়ে পড়বে?
না, ম্যানেজার মহিলা যদি থাকেন তাহলে খাতা-পত্রে সই-সাবুদগুলো সেরে নেব।
বলে আলো নিভিয়ে বেরোতে যাচ্ছি, উনি হাঁ হাঁ করে উঠলেন–আলো জ্বালা থাক।
ঘরের আলো জ্বেলে রেখেই আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মনটা বেশ ফুরফুরে। সারাদিন শরীর আরে মনের ওপর দিয়ে ধকল গেছে। এখন নিশ্চিত একটা ডেরা পেয়ে। যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি। কিন্তু হঠাৎ পা দুটো যেন আটকে গেল।
ওটা কী? ঐ যে—
শান্তনু আমার হাতটা চেপে ধরে গতি রূদ্ধ করে দিল।
প্যাসেজের বাম্বটা বোধ করি ফিউজ হয়ে গেছে। তাই অন্ধকার। তবু অফিস ঘরে যে আলো জ্বলছিল ওরই কিছুটা এসে পড়েছিল বারান্দার একদিকে। একটা ছোট্ট বাঁক ফিরলেই অফিস ঘর। আমরা নিশ্চিন্তেই এগোচ্ছিলাম হঠাৎ কুকুরের চেয়ে আকারে কিছু ছোটো কোনো জন্তু চক্ষের নিমেষে ছুটে পাঁচিল টপকে পিছনের ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
কী ওটা?
শান্তনু বলল, বুঝতে পারলাম না। তবে কুকুর নয়, ভাম বা খটাসও নয়, বনবেড়ালও নয়–
আমরা অফিস ঘরে গিয়ে দেখলাম মহিলাটি একটা খাতায় যেন কী লিখছেন। সামনে বসে আছে সেই বৃদ্ধ চিনাটি। বোধহয় সেদিনের হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের দেখেই মহিলাটি হেসে অভ্যর্থনা করলেন, আসুন। খাওয়া হল?
বললাম, হ্যাঁ। ভালোই।
আপনাদের সিনিয়ার পার্টনারটি কি শুয়ে পড়েছেন? খাওয়ার কোনো অসুবিধা–
না, তবে বয়েস হয়েছে তো, ক্লান্তি—
আপনারা কি কালকেই বার্সে চলে যাচ্ছেন?
দেখি! ভাবছি একটা গোটা দিন যদি হিলেই কাটানো যায়—
সেটাই ভালো।
বৃদ্ধ চিনা কী একটা রেজিস্টার নিয়ে এসে দাঁড়াল।
মহিলাটি বললেন, এঁরা কাল থাকবেন। সকালে করলেই হবে।
বৃদ্ধটি চুপচাপ গিয়ে নিজের চেয়ারে বসল।
মহিলাটি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ওয়ন, আপনি যেতে পারেন।
ওয়ন তখনই খাতাপত্র তুলে রেখে মহিলাটিকে অভিবাদন করে বেরিয়ে গেল।
এবার মহিলাটি আমাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন জানতে চাইলেন আমরাও এখন শুতে যাব কিনা।
আন্দাজে প্রশ্নটা ধরে নিয়ে উল্টে আমরাই জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি সাধারণত কতক্ষণ অফিস ঘরে থাকেন?
উনি বললেন, যতক্ষণ না বোর্ডাররা সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়ছেন ততক্ষণ থাকি।
একটু থেমে নিজেই বললেন, ক’জনই বা বোর্ডার! এগারোটার মধ্যেই হোম নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আপনার এখানে বোর্ডার বেশি নেই বোধহয়।
ঠিকই বলেছেন। আসলে যতই যত্ন-আত্তি করি, ভালো খাওয়াই, হিলের বাজার থেকে অনেকটা দূরে বলে লোক আসতে চায় না। আবার কখনও কখনও বেশ ভিড় হয়।
আপনি এখানেই থাকেন তো?
হ্যাঁ, এটাই আমার ঘরবাড়ি। আমার মাতামহই সেই কবে নানা জায়গা ঘুরে বহু বিপদ মাথায় নিয়ে হংকং থেকে এখানে আসেন। এই জায়গাটাকেই খুব নিরাপদ মনে করেছিলেন।
শান্তনু বিনীতভাবে বলল, কিছু যদি মনে করেন তাহলে জিগ্যেস করি বিপদটা কী ধরনের!
উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, অনেক কিছুই আমার জানা নেই। কারণ, তখন আমি নিতান্তই শিশু। পরেও বাবা-মা আমাকে সব ঘটনা বলত না। তবু যতদূর মনে আছে সে সময়ে রেড চায়না থেকে অনেককেই পালিয়ে যেতে হচ্ছিল। আমরাও সে দলে ছিলাম। কখনও পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, কখনও বোটে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। আমার দাদু ছিলেন খুব স্ট্রং, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। বিপদে ঘাবড়ে যেতেন না। বাবা জোয়ান হয়েও যা পারত না, দাদু বুড়ো হয়েও তাই করে ফেলতেন।
একটু থেমে বললেন, একদিনের কথা আমার মনে আছে। বিদেশি পুলিশ আমাদের পুরো দলকে তাড়া করেছে। ঠিক কী কারণে রেড চায়না থেকে আমাদের পালাতে হয়েছিল জানি না, কেন পুলিশ তাড়া করেছিল তাও আজ পর্যন্ত জানি না। এইটুকু শুধু জানি অন্যদের মতো আমাদেরও কোনো সরকারি কাগজপত্র বা পরিচয়পত্র ছিল না। শেষে সেবার আমরা নৌকা নিয়ে ঐ অঞ্চলের জেলেদের নৌকোর মধ্যে ভিড়ে গিয়েছিলাম। মনে আছে আমাদের নৌকোর ছইটা ছিল ফুটো। বৃষ্টি পড়ছিল। টপটপ করে গায়ে জল পড়ছিল। শীতে খুব কাঁপছিলাম। মা একটা লাল রঙের টুপি মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল।
