খাবার কথাটা শুনে বিক্রম আর তার সঙ্গী দুজনেই হাসল।
শান্তনু বলল, আরশোলা, ব্যাঙ, সাপ খেতে হবে না। হাতরুটি আর তরকারি পাওয়া যাবে তো, বিক্রম?
অনেক। বুঝিয়ে দিল বিক্রম। সঙ্গে মাংস।
কীসের মাংস ভাই? আতংকিত বিরূপাক্ষদা ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করলেন।
যে মাংস খেতে চাইবেন। দরকার হলে রেস্তোরাঁ থেকে আনিয়ে দেবে।
তবে চলল। এখন কিছু খেতে হবে। তারপর লেপমুড়ির ব্যবস্থা। হাত দুটো জমে গেছে।
কিন্তু বিক্রম যেন কিছু চিন্তা করছে।
এনি প্রবলেম? আর কোনো সমস্যা?
জায়গাটা কিন্তু একটু দূরে। আর–
মুখ শুকিয়ে গেল আমাদের। যদি বা আশ্রয়ের একটা সন্ধান পাওয়া গেল তাও দূরে। আর এই অবেলায়!
তবু কতদূরে?
বিক্রম মনে মনে হিসেব করে বলল, তা দু কিলোমিটার তো বটেই। ঐ যে পাহাড়টা দেখছেন ওর ঢালের মুখে। জায়গাটা অবশ্য খুবই ভালো লাগবে আপনাদের। খুব কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট।
বুঝতে পেরেছি। অর্থাৎ নির্জন–জনমানবশূন্য–
ভয়ংকর। বলে উঠলেন বিরক্ত বিরূপাক্ষদা। ‘কিন্তু আর’–বলে কী বলতে যাচ্ছিলে, ভাই বিক্রম?
না, কিছু নয়। দাঁড়ান, গাড়িটা আনি–বলে চলে গেল।
সুইট হোমের সামনে গিয়ে যখন বিক্রম গাড়ি দাঁড় করাল তখন পশ্চিম দিকের আড়ালে সূর্য নেমে গেছে। পাহাড়গুলোর চুড়ো যেন অস্তসূর্যের রাঙা আলোয় ঝলমল করছে।
কোথায় তোমার সেই চিনে গেস্ট হাউস? জিগ্যেস করল শান্তনু!
বিক্রম হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ঐ যে সাইনবোর্ড।
তাকিয়ে দেখলাম সাইনবোর্ডে ইংরিজিতে লেখা ‘SWEET HOME’। তার নীচে অপেক্ষাকৃত ছোটো অক্ষরে ইংরিজিতে লেখা–পোর–জোঅ্যান্ড–চিয়াং।
বললাম, একজন চিনা মহিলার প্রাইভেট হোটেলের ইংরিজি নাম!
শান্তনু বলল, বুদ্ধিমতীর পরিচয়। এখানে চিনা ভাষা কে কত বুঝবে? তাই অতিথিশালার নাম দিয়েছে ইংরিজিতে। আর এ অতিথিশালা তো গতানুগতিক নয়, অন্যস্বাদের খাবার পাওয়া যাওয়া সম্ভব সেটা বোঝাবার জন্য প্রোপাইটার নিজের চিনা পরিচয়টুকুও প্রচার করে দিয়েছে।
বিরূপাক্ষদা তাড়া দিলেন, ঠান্ডায় মরে গেলাম। চলো চলো ভেতরে চলো।
বিক্রম জিগ্যেস করল, তাহলে কাল কখন আসব? কালই তো ফিরবেন?
শান্তনু বলল, একটু দাঁড়াও। আগে থাকার ব্যবস্থা করি।
চলে আসছিলাম–বিক্রম থামিয়ে দিয়ে চাপা গলায় বলল, অচেনা জায়গা তো। রাতে ঘর থেকে না বেরোনোই ভালো। বলেই গাড়িতে গিয়ে উঠল।
‘হোম’টি লম্বা একতলা। সামনে অনেকখানি জায়গা ঘিরে কম্পাউন্ড। কম্পাউন্ডের মাঝখানে পানপাতা আকারে সিমেন্টে বাঁধানো একটু বসার জায়গা। সামনেই অফিস ঘর। তার দু’পাশে টানা বারান্দা। বারান্দার ধারে ধারে কয়েকটি ঘর। বোঝাই যাচ্ছে এগুলিতে বোৰ্ডাররা থাকে।
অফিস ঘরের মেঝেটা কাঠের। কার্পেট বিছানো। ঘরটা মাঝারি সাইজের। আসবাবগুলো খুবই পুরোনো আমলের। কাজেই দামি। ঐরকম কাঠ এখন সচরাচর দেখা যায় না। টেবিলে রয়েছে পোর্টেবেল টাইপ মেশিন, একটা টেলিফোন। আর একটা পাথরের কালভৈরবের ভয়ংকর মূর্তি। মহিলাটির অল্প দূরে অপেক্ষাকৃত ছোটো একটা টেবিল যেন আগলে বসে আছে এক বৃদ্ধ চিনা। তার মাথায় টুপি, গায়ে কালো কোট, থুতনিতে পাকা দাড়ি। বাদামের মতো দুটো চোখে নির্জীব দৃষ্টি। টেবিলে একটুকরো কাচের ফলকে লেখা RECEPTION। পাশেই পর্দা ফেলা একটা ছোটো ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে টাইপরাইটারের টকটক শব্দ।
বিশাল অর্ধবৃত্তাকার একটা টেবিলের সামনে বসে আছেন একজন সুন্দরী চিনা মহিলা। হলদেটে রঙ, সাদা ব্লাউজ গায়ে, নীচে নীল রঙের চাপা স্কার্ট। চকচকে কালো চুলে একটা বিনুনি। মহিলাটি একমনে নখে রঙ মাখাচ্ছিলেন, হঠাৎ অনেকগুলো জুতোর শব্দ শুনে উঠে দাঁড়ালেন। আমাদের ক্লান্ত মুখ, ধকল-সওয়া জামা-প্যান্টের অবস্থা আর পিঠে ঝোলানো স্যাক দেখে অনুমান করে নিলেন আমরা কী জন্য এখানে এসেছি।
নমস্তে, ওয়েলকাম বলে হেসে হাত জোড় করে নমস্কার করে অভ্যর্থনা করলেন। টেবিলের সামনেই খানকতক গদি-মোড়া চেয়ার ছিল। তাতেই বসলাম।
From Kolkata?
Yes.
সঙ্গে সঙ্গে চিনা মহিলা হেসে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, বাংলাতেই বলুন, মহাশয়েরা। আমি কুছ কুছ বাংলা বুঝি।
বাংলা বোঝেন জেনে আমরা স্বস্তি পেলাম। বললাম, ধন্যবাদ। শান্তনু প্রথমেই বলল, রুম পাওয়া যাবে তো?
Oh! Yes!
বিরূপাক্ষদা তবু ইংরিজিতেই (সম্ভবত তিনি ইংরিজি বলতে পারেন জানাবার জন্যেই) Toyota, May we have each a cup of coffee? Hot coffee!
Oh sure! কিন্তু এখানেই খাবেন, না আপনাদের ঘরে গিয়ে আরামসে–হেসেই উত্তর দিলেন মহিলাটি। এবার হাসবার সময়ে তার একটি সোনা বাঁধানো দাঁত দেখা গেল।
ফাস্ট রাউন্ডটা এখানেই হয়ে যাক।-উৎসাহে বলে উঠলেন বিরূপাক্ষদা।
O.K.বলে মহিলাটি সেই বৃদ্ধকে ডেকে তিন কাপ কফি দেবার কথা বলে দিলেন।
কফি খাওয়া হয়ে গেলে চিনা মহিলা টেবিলে লাগানো অদৃশ্য কোনো বোতাম টিপলেন বোধ হয়। দু’মিনিটের মধ্যে একজন ভৃত্য গোছের লোক ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। পরনে চেক চেক লুঙ্গি। গায়ে ভেড়ার লোমের ময়লা সোয়েটার। কণ্ঠনালীটা বেজায় উঁচু। যেন গলার চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
মহিলাটি হিন্দিতে বললেন, ইস্কাইন, এঁরা তিনজন থাকবেন। স্পেশাল কোন ঘরটা দেবে?
