এমনি সময়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। আর মিনিট তিনেকের মধ্যেই পাইন বনের মধ্যে থেকে আমাদের গাড়িখানাকে আসতে দেখা গেল।
শান্তনু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল–আরে বিক্রমজি, কাঁহা গিয়া থা?
বিক্রম তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিল।
জলদি স্যার!
কোনোরকমে আমরা ঢুকতে ও গাড়ি স্টার্ট দিল। সংক্ষেপে যা বলল তা এই–
গাড়ি থেকে আমরা নেমে গেলেও বিক্রম নামেনি। কারণ সে জানত শনিবার দিনটা এখানে বড় অশুভ দিন। অনেক অঘটন ঘটে। সে এও জানত এইরকম কোনো জায়গায় এইরকম সময়ে উত্তরের পাহাড় থেকে দলবদ্ধ হয়ে নেমে আসে এক ধরনের জীব। তাদের সামনে পড়লে কারোর রক্ষা নেই। সে জন্যে সে ভাবছিল কী করবে?
গাড়িটা রাস্তা জুড়ে রাখা ঠিক নয়। ওদের জন্যে পথ ছেড়ে রাখতে হবে। কিন্তু ঠিক কখন কোন পথে ওরা নামবে সেটাই বুঝতে পারছিল না। আর তখনই চোখে পড়ল দূরে উত্তরের একটা পাহাড়ের দিকে। দেখল ছাই রঙের কী একদল জন্তু পাহাড়ের গায়ে গা মিলিয়ে সার বেঁধে নেমে আসছে। তখনই বিক্রম বুঝতে পারল আর একমুহূর্ত দেরি করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে সে পথ থেকে পাশের গভীর ঝোপের দিকে চলে এসেছিল।
ওরা কি দক্ষিণের পাহাড়গুলোর দিকে গেল?
হ্যাঁ।
আবার ফিরবে কখন?
তার ঠিক নেই। ফিরলে এই পথ দিয়েই ফিরবে। কথা শেষ করতে না করতেই বিক্রম হঠাৎ স্পিড বাড়িয়ে দিল।
কী হল?
ঐ দেখুন। ওরা নেমে আসছে।
যাক কী ভাগ্যি, ওরা এদিকে এল না। চলে গেল উত্তরের পাহাড়ের দিকে। যে পথ দিয়ে এসেছিল।
.
০৩.
অতঃপর একঘণ্টার মধ্যেই অর্থাৎ বিকেল তিনটে বাজবার আগেই আমরা ‘হিলে’ এসে পৌঁছালাম। পাহাড় ঘেরা ৯০০০ ফুট উঁচুতে ছোট্ট জায়গা। না গ্রাম, না পাহাড়। এখানে পৌঁছানোর পরই বিক্রম একেবারে অন্য মানুষ। মনের মধ্যে যেন একটা চাপা ভয় ছিল সেটা চলে গেছে।
যেখানে গাড়ি থামল সেটা গাড়ির স্ট্যান্ড। নানা দিক থেকে বাস আসে। কোনোটা আসে জোরথাং থেকে, কোনোটা সোমবারিয়া থেকে। তবে হুড়মুড় করে আসে না। তিন চার ঘণ্টা অন্তর। তার কারণ পাহাড়ি রাস্তা। সন্ধের ঢের আগেই বাস চলাচল বন্ধ করে দিতে হয়। আরও যে সব জায়গা থেকে আসে তার নাম জানা নেই।
বিক্রম নেমেই চলে গেল কাছেই যে চায়ের দোকানে ড্রাইভাররা বসে সেখানে। অনেকক্ষণ গল্প করতে পারেনি। মন-প্রাণ আনচান করছিল।
আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়েছি। বিরূপাক্ষদা মাটিতে পা দিয়েই বলে উঠলেন, রাতে থাকব কোথায়? ভালো হটেল-টোটেল…
হেসে ছড়া কেটে বললাম, ‘মোটে মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা! ভালো হোটেল মাথায় থাকুক, একটা মাথা গোঁজার মতো সরাইখানা পেলেই ভাগ্যি বলে মানব।
বিরূপাক্ষদা কথাটা শুনেও যেন শুনলেন না। বললেন, ওহে শান্তনু, থাপা গেল কোথায়?
ভাববেন না, বলেই শান্তনু ডাকল, বিক্রমজি—
বিক্রম এসে দাঁড়াল।
তোমার ভাড়া কি মিটিয়ে দেব?
মিটিয়ে দেবেন? মানে ছেড়ে দেবেন? তারপর ফিরবেন কার গাড়িতে?
শান্তনু তাড়াতাড়ি বলল, না–না, ছেড়ে দেব কেন? আসলে আমরা বুঝতে পারছি আমরাই বা থাকব কোথায়? আর খাবই বা কোথায়?
বিক্রম বলল, আমার থাকবার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু আপনারা কী করবেন দেখুন।
আমরা কাল বার্সে যাব। চার কিলোমিটার পথ। দরকার হলে হেঁটেই যাব। (এ কথা শুনে বিরূপাক্ষদা মুখ কিছু না বললেও আঁৎকে উঠলেন) এসেছি তো বেড়াতে। এখন রাত্তিরে থাকার ব্যবস্থা কোথায় করব?
বিরূপাক্ষদা বললেন, কোথা ফাইভ স্টার মার্কা হোটেল-টোটেল–বেড়াতে এসেছি, টাকার মায়া করলে কি হয়?
খুব ঠান্ডা বলে এখন বিক্ৰম কাশ্মীরিদের মতো টুপি পরেছে। তার ফর্সা চ্যাপ্টা মুখে মানিয়েছে ভালো। টুপিটা ঠিক করে বসিয়ে নিয়ে চিন্তিত মুখে বলল, তেমন হোটেল তো এখানে নেই।
না না, ‘তেমন’ হোটেলের দরকার নেই। যেমন-তেমন পেলেই হল। বলল শান্তনু।
চলুন দেখি। বলে বিক্রম আমাদের নিয়ে চলল। দু-তিনটে হোটেল দেখাল। প্রথমটা খুব নোংরা। দ্বিতীয়টা ছোটো বলেই চার-পাঁচজন বোর্ডারের বেশি জায়গা দিতে পারে না। বলল, এঁরা আগেই ‘বুক’ করে এসেছেন।
এইটুকু শুনেই হতাশ হয়ে বিরূপাক্ষদা বলে উঠলেন, তাহলে কি পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে–
শান্তনু ধমক দিয়ে বলল, অল্পেতেই এত হতাশ হয়ে পড়েন কেন? চেষ্টা তো করা হচ্ছে। ছোট্ট জায়গা। কটাই বা হোটেল থাকতে পারে?
তারপর শান্তনু বিক্রমকে বলল, যা হোক কোনো ব্যবস্থা তো তোমাকেই করতে হবে।
বিক্রম নিরুপায় হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। বাসের একজন খালাসিকে দেখতে পেয়ে ডাকল। পরিচিত লোক। বিক্রম তাকে আড়ালে অবস্থা বুঝিয়ে বলল, একটা থাকার ব্যবস্থা কি করা যায় বলো তো!
লোকটা চিন্তা করে বলল, হোটেল আর নেই। তবে ‘সুইট হোমে’ একবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
শান্তনু উৎসাহিত হয়ে বলল, তাই চলুন।
বিক্রম একটু চিন্তা করে বলল, ওটা কোনো হোটেল নয়। প্রাইভেট বাড়ি। পেয়িং গেস্ট হিসেবে যতদিন খুশি থাকতে পারেন।
তা খারাপ কী? চার্জ কি খুব বেশি?
না, মডারেট। কিন্তু মালিক একজন চিনা মহিলা।
চিনেম্যান!–দাঁত খিঁচিয়ে উঠলেন বিরূপাক্ষদা।
বললাম, ‘চিনেম্যান’ নয় বিরূপদা, ‘চিনা ওম্যান’।
ও-ই হল। কিন্তু চিনে খানা–মানে–আরশোলা, টিকটিকি খেতে পারব না। একটা চৌকি আর লেপ কি মিলবে?
